এক বুলেটেই পিতাহারা তিন বোনের স্বপ্ন প্রদীপ নিভে যায়

এক বুলেটেই পিতাহারা তিন বোনের স্বপ্ন প্রদীপ নিভে যায়

ফন্ট সাইজ:

সংসারের নুন আনতে পান্তা ফুরাতো ঠিকই, কিন্তু স্বপ্নের কোনো কমতি ছিল না। অভাবের সংসারে জন্ম নেয়া ইয়াসিন ছোটবেলা থেকেই একটা স্বপ্ন বুকে লালন করতেন বড় হয়ে নিজের উপার্জনে বিধবা মা ও তিন বোনকে নিয়ে একটি সুন্দরপরিবার সাজাবে। বাবার মৃত্যুর পর ৫০ বছর বয়সী মা মনজিলার জীর্ণ কাঁধের বোঝাটা নিজের কাঁধে তুলে নিতেই গ্রাম ছেড়ে পাড়ি জমিয়েছিল রাজধানীতে। কিন্তু একটা বুলেট নিমিষেই পিষে দিলো বিধবা মা ও পিতা হারা তিন বোনের সেই স্বপ্ন। চব্বিশের জুলাইয়ের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের উত্তাল দিনগুলোতে ঢাকার যাত্রাবাড়ীতে গুলিতে নির্মমভাবে নিহত হন খুলনা জেলার রূপসা উপজেলার নৈহাটি ইউনিয়নের রহিমনগর গ্রামের বাসিন্দা ১৭ বছর বয়সী কিশোর মোহাম্মদ ইয়াসিন আলী শেখ।

অভাবের তাড়নায় যাত্রাবাড়ীর একটি এলপি গ্যাস সিলিন্ডারের দোকানে ডেলিভারি ম্যানের কাজ নেয়া এই কিশোর কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত ছিল না। পেটের তাগিদে কাজ করতে গিয়েই রাজনীতির নির্মম শিকার হতে হলো তাকে। অভাবের সংসারে প্রদীপ খুলনা জেলার রূপসা উপজেলার নৈহাটি ইউনিয়নের রহিমনগর গ্রামে জন্ম ইয়াসিনের। জন্মের পরই বাবাকে হারায় সে। মা মনজিলা বেগম মানুষের বাড়ি কাজ করে কোনো রকমে টেনেটুনে সংসার চালাতেন। তিন বোনের পর জন্ম নেয়া একমাত্র ভাইকে নিয়ে মায়ের আশার অন্ত ছিল না। অভাবের কারণে বেশি দূর পড়াশোনা করতে না পারলেও ইয়াসিন ছিল অমায়িক ব্যবহারের অধিকারী। প্রতিবেশীদের সুখ-দুঃখে সবসময় পাশে দাঁড়াত সে। বোনেরা জানান, নিজেরা না খেয়ে থাকলেও ইয়াসিন সবসময় বোনদের খাওয়া-দাওয়ার ব্যাপারে সচেতন থাকত। মায়ের কষ্ট দূর করতে এবং পরিবারের হাল ধরতে একদিন সে সিদ্ধান্ত নেয় ঢাকায় যাওয়ার। যাত্রাবাড়ী এলাকায় একটি গ্যাস সিলিন্ডারের দোকানে কাজ শুরু করে সে। তার আয়েই ঢাকার মাতুয়াইলে একটি ছোট ঘর ভাড়া নিয়ে থাকতে শুরু করেন বিধবা মা’কে নিয়ে। ২০২৪ সালের ১৯শে জুলাই, শুক্রবার। কোটা সংস্কার আন্দোলন তখন রূপ নিয়েছে ছাত্র-জনতার গণবিক্ষোভে। সকাল থেকেই যাত্রাবাড়ী এলাকার পরিস্থিতি ছিল থমথমে। জুমার নামাজের পর পরই এলাকায় ছাত্র-জনতার সঙ্গে পুলিশ ও আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের ব্যাপক ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষ শুরু হয়। ঠিক ওই সময়টাতে ইয়াসিন এক গ্রাহকের বাসায় গ্যাসের সিলিন্ডার পৌঁছে দিয়ে দোকানে ফিরছিল। পথচারী এই কিশোর হঠাৎ করেই রণক্ষেত্রে পরিণত হওয়া যাত্রাবাড়ী মোড়ে সংঘর্ষের মাঝে পড়ে যায়। সংঘর্ষের একপর্যায়ে পুলিশের ছোড়া বুলেট এসে সরাসরি আঘাত করে ইয়াসিনের শরীরে। রক্তাক্ত অবস্থায় লুটিয়ে পড়ে সে। স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যায়। হাসপাতালে টানা ৫ দিন চিকিৎসা শেষে ২৫ জুলাই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে এই পিতাহারা হতদরিদ্র ইয়াসিন।

রহিমনগর গ্রামে ইয়াসিনদের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য। জীর্ণশীর্ণ কুঁড়েঘরে বসে আছেন মা মনজিলা বেগম। ছেলের ছবি বুকে জড়িয়ে ধরে অশ্রুসজল চোখে তিনি বলেন, আমার ছেলে গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর কয়েকজন ছেলে মাতুয়াইলের ভাড়া বাসায় এসে খবর দেয়। তখন আমার কাছে একটা টাকাও ছিল না। অনেক অনুরোধের পর এক রিকশাচালক বিনা ভাড়ায় আমাকে হাসপাতালে নিয়ে যায়। টাকা না থাকায় গ্রামের মানুষের চাঁদা তোলা টাকায় এ্যামলেন্স ভাড়া করে ইয়াসিনের লাশ খুলনায় এনেছি। আসার পথেও পদে পদে পুলিশ হয়রানি হতে হয়েছে। কান্নায় ভেঙে পড়ে মা আরও বলেন, আমার ছেলের তো কোনো দোষ ছিল না। সে তো মিছিলে যায় নাই, কোনো দল করতো না। কাজ করতো, ভাত খাইতো। আমার ইয়াসিনের আয় দিয়েই বাসা ভাড়াসহ সংসার চলতো। আমি এখন কী করে চলবো, আমাকে কে খাওয়াবে? আমার তো সব শেষ হয়ে গেল। বর্তমানে মনজিলা বেগম ও বড় বোন স্বামী পরিত্যক্তা নূরজাহান একসঙ্গে থাকেন। অন্যের বাড়িতে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করেন। আর মেঝো মেয়ে নাসরিনকে নড়াইলে এবং ছোট মেয়ে শারমিনকে বরিশালে বিয়ে দিয়েছেন। তাদের দিন আনে দিন খায় অবস্থা। আমার আর দেখার কেউ নাই।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন