জীবনযুদ্ধে অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ

কুড়িগ্রামের ৯ শহীদ পরিবার

জীবনযুদ্ধে অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ

ফন্ট সাইজ:

কুড়িগ্রাম জেলার শহীদ পরিবারগুলোর কাছে সময় যেন দুই বছরেও থেমে আছে সেই শোকের দিনেই। প্রিয়জন হারানোর বেদনা, ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা আর বাস্তব জীবনের কঠিন সংগ্রাম- তাদের প্রতিদিন মনে করিয়ে দেয় আত্মত্যাগের ইতিহাস লেখা হলেও জীবনের লড়াই এখনো শেষ হয়নি। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তিতে শহীদদের আত্মত্যাগ কেবল ইতিহাসের পাতায় স্মরণে সীমাবদ্ধ না রেখে তাদের রেখে যাওয়া পরিবারগুলোর মুখে হাসি ফিরিয়ে আনতে রাষ্ট্র ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কার্যকর, টেকসই ও দৃশ্যমান উদ্যোগ নেয়ার প্রত্যাশা পরিবারের সদস্য ও স্থানীয়দের।

শহীদ গোলাম রব্বানী: বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনে গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীদ হন কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী উপজেলার কচাকাটা এলাকার শোভারকুটি গ্রামের শিক্ষার্থী মো. গোলাম রব্বানী (১৬)। ২০শে জুলাই ঢাকার শ্যামলী জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, দরিদ্র পরিবারের সন্তান হওয়ায় পড়াশোনার পাশাপাশি রাজমিস্ত্রির সহকারী হিসেবে কাজ করে পরিবারকে সহযোগিতা করতেন। উপার্জনের টাকা বাবার হাতে তুলে দিতেন এবং ছোট ভাইয়ের লেখাপড়া চালিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখতেন। জুলাই আন্দোলনের সময় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় তিনি ঢাকায় নির্মাণ শ্রমিকের কাজ করছিলেন। ১৯শে জুলাই বিকালে রামপুরা এলাকায় কাজ শেষে বাসায় ফেরার পথে সংঘর্ষের মধ্যে গুলিবিদ্ধ হন। প্রথমে বনশ্রী নাগরিক হাসপাতালে পরে কুর্মিটোলা হাসপাতালে নেয়া হয়। অবস্থার অবনতি হলে শ্যামলীর জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের কারণে পরদিন তিনি মারা যান। গোলাম রব্বানীর বাবা মো. সাইদুল ইসলাম বলেন, ছেলেটাই ছিল আমাদের পরিবারের সবচেয়ে বড় ভরসা। সংসারের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছিল। তাকে হারানোর কষ্ট কখনো ভুলতে পারবো না। সরকারি ও বেসরকারিভাবে কিছু সহায়তা পেলেও সংসারে অভাব লেগেই আছে।

শহীদ রাশেদুল ইসলাম: ৫ই আগস্ট শেখ হাসিনার পতনের দিন যাত্রাবাড়ী থানার সামনে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন রাশেদুল ইসলাম। স্বৈরাচারী আওয়ামী সরকার হটানোর শপথ নিয়ে গণ-অভ্যুত্থানে অংশ নেন তিনি। আন্দোলনকারীদের ওপর পুলিশের নির্বিচার গুলিবর্ষণে রাশেদুলের মাথা, গলা ও পিঠে গুলি লাগে এবং তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। পরে মেডিকেলে নেয়ার পথে তার মৃত্যু হয়। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ রাশেদুলের মা আলেয়া বেগমের আকুতি, ‘ওমরা মোর বুকের ধন কাড়ি নিছে। মোর কলিজা তো আর নেই। মোর বেটার খুনির বিচার চাং।’

শহীদ রায়হানুল ইসলাম: জেলার উলিপুর পৌরসভার মুন্সিপাড়া গ্রামের আবু রায়হানুল ইসলাম রায়হান ১৯শে জুলাই ঢাকায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনে গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন। বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান ছিলেন তিনি। তার মৃত্যুতে নিভে যায় একটি পরিবারের বহু স্বপ্ন ও ভবিষ্যতের অবলম্বন। স্বামীকে হারিয়ে ছোট্ট মেয়ে রাওজাকে নিয়ে সংগ্রাম করছেন স্ত্রী রিফাত জাহান রিতু। বিভিন্ন সময় সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে কিছু আর্থিক সহায়তা পেলেও তা দীর্ঘমেয়াদে জীবনযুদ্ধের নিশ্চয়তা দিতে পারেনি। তিনি বলেন, আমি কোনো অনুগ্রহ চাই না, চাই সম্মানজনকভাবে বেঁচে থাকার সুযোগ। একটি স্থায়ী সরকারি চাকরি পেলে মেয়ের পড়াশোনা ও সংসারের দায়িত্ব ভালোভাবে পালন করতে পারবো।

শহীদ নুর আলম: বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে ২০শে জুলাই ডান চোখে গুলিবিদ্ধ হন নুর আলম। গুরুতর আহতাবস্থায় গাজীপুর হাসপাতালে নিলে সেখানে তার মৃত্যু হয়। নুর আলম কুড়িগ্রাম সদরের ভোগডাঙ্গা ইউনিয়নের মোল্লাপাড়া গ্রামের মো. আমীর হোসেন ও নুর বানু বেগম দম্পতির বড় ছেলে। নুর আলম পেশায় একজন রাজমিস্ত্রি। বাবা ছিলেন ভ্যানচালক, মা পোশাক শ্রমিক। ঢাকা গাজীপুরের তেলিপাড়া গ্রামে অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীকে নিয়ে ভাড়া থাকতেন নুর আলম। বর্তমানে তাকে হারিয়ে শোকাতুর পুরো পরিবার। একদিকে ছেলে হারানোর কষ্ট, অন্যদিকে স্বামী হারানোর যন্ত্রণা। অভাবের সংসারে বর্তমানে পরিবারটি ভালো নেই। নুর আলমের নিহত হওয়ার খবরে সরকারি-বেসরকারি ও রাজনৈতিকভাবে সহযোগিতার হাত বাড়ালেও খাদিজার স্বপ্ন আর সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছেন স্বজনরা।

আব্দুল্লাহ আল তাহির: রংপুরে গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীদ হন আব্দুল্লাহ আল তাহির (২৮)। তিনি ঢাকা সিরামিক ইনস্টিটিউটের সিভিল বিভাগের অষ্টম সেমিস্টারের শিক্ষার্থী ছিলেন। আব্দুল্লাহ আল তাহিরের গ্রামের বাড়ি কুড়িগ্রাম জেলার রৌমারী উপজেলার যাদুরচর ইউনিয়নের বকবান্ধা নামাপাড়া গ্রামে। পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, ১৯শে জুলাই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কর্মসূচিতে অংশ নিতে রংপুর নগরের রামমোহন রায় মার্কেট এলাকায় যান তাহির। দুপুরের পর আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশ নেয়ার সময় সংঘর্ষের একপর্যায়ে তিনি গুলিবিদ্ধ হন। পরে সহপাঠীরা তাকে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রাতে তিনি মারা যান। শহীদের বাবা ডাক্তার আব্দুর রহমান বলেন, দেশ ও মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে আমার ছেলে প্রাণ দিয়েছে। সন্তান হারানোর কষ্ট কখনো শেষ হবে না, তবে দেশের জন্য তার আত্মত্যাগে আমরা গর্বিত।

রাজিব উল করিম সরকার রাব্বী: কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার ছিনাই ইউনিয়নের মেধাবী সন্তান রাজিব লালমনিরহাটে বাবা-মায়ের চাকরির সুবাদে সেখানে বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুলে ভর্তি হয়। সেখানে অবস্থানকালীন ৪ঠা আগস্ট সে ছাত্র বিক্ষোভে অংশ নেয়। ৫ই আগস্ট আন্দোলনে অংশ নিতে লালমনিরহাট জেলার মিশন মোড়ে অবস্থান নেয়। এরপর থেকে তার কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না। রাত দেড়টার দিকে
তাকে লালমনিরহাট জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সুমন খানের বাসায় আগুনে পোড়া মৃত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। তিন ভাইয়ের মধ্যে মেধাবী রাজীবকে নিয়ে অনেক স্বপ্ন ছিল বাবা-মায়ের। কিন্তু অকালেই পৃথিবী ছেড়ে চলে যায় সে। তার এই মৃত্যু এখনো কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছে না তার বাবা-মা। ছেলের হত্যার বিচার চেয়ে রাজীবের বাবা বলেন, ওর বন্ধুদের সুমন খানের বাসায় আটকিয়ে রাখা হয়েছে, তখন মিছিল থেকে সে ওখানে চলে যায়। সেখানে অনেক লোকজন বাসা ভাঙচুর করছে। ওই অবস্থায় ওরা বন্ধুদের উদ্ধারে ওঠে। কিন্তু দুর্ভাগ্য সবাই নেমে আসতে পারলেও; কে বা কারা সেখানে আগুন লাগিয়ে দিলো। তারা ওখানে আটকিয়ে যায় এবং তারা ওখানে শহীদ হন।

রাদীফ হোসেন রুশো: ৫ই আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের দিন লালমনিরহাট জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক সুমন খানের বাসভবনে ভাঙচুর ও লুটপাট করে আগুন ধরিয়ে দেয়ার পর ওই বাড়ি থেকে অগ্নিদগ্ধ যে ছয়টি লাশ উদ্ধার করা হয় তার একটি রাদীফ হোসেন রুশোর। সে কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার বড়লই গ্রামের অবসরপ্রাপ্ত বিজিবি হাবিলদার জিয়াউর রহমান ও রশিদা বেগম দম্পতির একমাত্র ছেলে। রুশো সে সময় লালমনিরহাট ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের একাদশ শ্রেণির ছাত্র ছিল। রুশোর মা রশিদা বেগম কান্না জড়িত কণ্ঠে জানান, আমাদের আর কোনো অবশিষ্ট নেই। রাদীফ হোসেন রুশোই একমাত্র ছেলে সন্তান। তাকে নিয়ে আমাদের অনেক আশা ছিল। সেটি কেড়ে নেয়া হলো। অনেক স্বপ্ন ছিল তার। সে ব্যারিস্টার হবে। সেটা আর হলো না। এখনো মনে হয়, রুশো আমাকে মা মা বলে ডাকছে। আমি বর্তমান সরকারের কাছে সন্তান হত্যার বিচার চাই।
শহীদ রফিকুল ইসলাম: সাভারে বিজয় মিছিল দেখতে গিয়ে গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীদ হন কুড়িগ্রামের সদর উপজেলার ডাকবাংলাপাড়ার মো. রফিকুল ইসলাম (৩১)। ২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে সাভারের এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, রফিকুল ইসলাম পেশায় একজন রিকশাচালক ছিলেন। শৈশবেই বাবাকে হারানোর পর অভাব-অনটনের মধ্যেই বড় হন। জীবিকার তাগিদে সাভারের গেন্ডা এলাকায় বসবাস শুরু করে রিকশা চালিয়ে মা, স্ত্রী ও পরিবারের ভরণপোষণের দায়িত্ব পালন করতেন। ৫ই আগস্ট বিকালে সাভারে বিজয় মিছিল দেখতে বের হলে সংঘর্ষের মধ্যে পুলিশের ছোড়া গুলিতে তিনি গুরুতর আহত হন। স্থানীয়রা তাকে দ্রুত এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। শহীদের মা রওশন আরা বলেন, ছেলেই ছিল আমার সংসারের সবচেয়ে বড় অবলম্বন। অনেক কষ্ট করে সংসার চালাতো। তাকে হারিয়ে আমরা নিঃস্ব হয়ে গেছি। ছোট ভাই মো. রমজান আলী বলেন, ভাই পরিবারের জন্য সারাজীবন সংগ্রাম করেছে। তার মৃত্যুর পর পরিবার চরম আর্থিক সংকটে পড়েছে। আমরা চাই, তার আত্মত্যাগের যথাযথ মূল্যায়ন হোক।

শহীদ আশিকুর রহমান আশিক: ৪ঠা আগস্ট কুড়িগ্রাম শহরের শাপলা চত্বরে আওয়ামী লীগ-যুবলীগ-ছাত্রলীগের সঙ্গে শিক্ষার্থী-জনতার সংঘর্ষে মাথায় ঢিল লেগে আশিক বাবু আহত হন। অবস্থার অবনতি হলে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হয়। ১৮ই আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তিনি। শহীদ আশিক উলিপুর উপজেলার বুড়াবুড়ি ইউনিয়নের সাতভিটা গ্রামের কৃষক চাঁদ মিয়ার ছেলে। বাবা চাঁদ মিয়াসহ পরিবারের সদস্যরা জানান, সময়ের সঙ্গে ক্ষত শুকায়নি। আশিকের স্মৃতি, সংসারের দায়িত্ব ও ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা তাদের প্রতিদিন নতুন করে কষ্ট দেয়। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন কুড়িগ্রামের সাবেক আহ্বায়ক মো. আব্দুল আজিজ নাহিদ বলেন, কুড়িগ্রামে ৯ জন শহীদ জুলাইযোদ্ধা রয়েছে। পরিবারগুলো সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে কিছু আর্থিক সহায়তা পেলেও জীবনযুদ্ধে দীর্ঘমেয়াদি নিশ্চয়তা দেয়া প্রয়োজন। বিশেষ করে শহীদ পরিবারের সদস্যদের কর্মসংস্থান ব্যবস্থা করা দরকার।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন