প্রায় তিন বছর ধরে মায়ের মরদেহ বাড়ির ফ্রিজারে লুকিয়ে রেখেছেন এক ছেলে। বৃটেনের ওয়েলসে ঘটেছে এই ঘটনা। ইতিমধ্যে অভিযুক্ত ছেলেকে গ্রেপ্তার করেছে দেশটির পুলিশ। খবর দ্য গার্ডিয়ানের।
ঘটনার বিস্তারিত সম্পর্কে জানা যায়, মৃত মায়ের মরদেহ বছরের পর বছর ফ্রিজারে লুকিয়ে রেখে তার নামে ৭০ হাজার পাউন্ডেরও বেশি সরকারি ভাতা ও অন্যান্য অর্থ আত্মসাৎ করেছেন ক্রিস্টোফার ফিলিপস (৬০) নামে এক ব্যক্তি। এই ঘটনায় ফিলিপসকে দেশটির আদালত দুই বছর চার মাসের কারাদণ্ড দিয়েছে।
গার্ডিয়ান বলছে, ফিলিপস দক্ষিণ ওয়েলসের উপকূলীয় শহর পোর্থকলে নিজেদের বাড়ির বসার ঘরে থাকা একটি চেস্ট ফ্রিজারে তার মা সিলভিয়া ফিলিপসের মরদেহ সংরক্ষণ করে রেখেছিলেন।
আদালতে বলা হয়, অবসরপ্রাপ্ত কোম্পানি সেক্রেটারি সিলভিয়া ফিলিপস ৮৯ বছর বয়সে মারা যান। তার মৃত্যুর দুই দিন পর ক্রিস্টোফার একটি বড় ফ্রিজার কিনে মরদেহ সেখানে রাখেন।
তদন্তে জানা যায়, তিনি নিয়মিত ফ্রিজারের ওপর ফুল রাখতেন এবং মায়ের সঙ্গে যেন তিনি এখনও জীবিত আছেন- এভাবে টেলিভিশনের জনপ্রিয় ধারাবাহিক ও ঘোড়দৌড় নিয়ে কথা বলতেন।
মায়ের খোঁজ নিতে পুলিশ বাড়িতে গেলে ক্রিস্টোফার দাবি করেন, তার মা আত্মীয়দের সঙ্গে লন্ডনে রয়েছেন। কিন্তু ফ্রিজারের ওপর ফুল দেখে সন্দেহ হওয়ায় পুলিশ তল্লাশি চালিয়ে সেখান থেকে মরদেহ উদ্ধার করে।
মার্থার টিডভিল ক্রাউন কোর্টে শুনানিতে বলা হয়, সাবেক কোম্পানি পরিচালক ক্রিস্টোফার ফিলিপস তার মায়ের ব্যাংক হিসাব ব্যবহার করে সঞ্চয়ের অর্থ উত্তোলন করেন এবং তার নামে আসা সরকারি ভাতা ও পেনশনের অর্থও গ্রহণ করতে থাকেন।
বিচারক ট্রেসি লয়েড-ক্লার্ক বলেন, অভিযুক্ত তার মায়ের মৃত্যুর পরও প্রেসক্রিপশনের ওষুধ সংগ্রহ করতেন এবং চিকিৎসকদের কাছে মিথ্যা বলতেন যে তার মা চিকিৎসার জন্য যেতে চান না।
বিচারক বলেন, আপনার মায়ের পেনশন ও বিভিন্ন সরকারি ভাতা তার ব্যাংক হিসাবে জমা হতে থাকে এবং আপনি সেই অর্থ ব্যবহার করেছেন।
এদিকে আসামিপক্ষের আইনজীবী রুথ স্মিথ আদালতকে জানান, ক্রিস্টোফার তার মায়ের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ছিলেন। জীবনের প্রায় ৫০ বছর তারা একসঙ্গে বসবাস করেছেন এবং ২০০৮ সাল থেকে তিনি মায়ের প্রধান পরিচর্যাকারী ছিলেন।
তিনি বলেন, পুলিশের কাছে ক্রিস্টোফার স্বীকার করেছিলেন, আমি আসলে তাকে ছেড়ে দিতে চাইনি। আইনজীবীর ভাষ্য, তিনি প্রায়ই মায়ের পাশে বসে আগের মতোই টেলিভিশন অনুষ্ঠান, বিশেষ করে ‘করোনেশন স্ট্রিট’ এবং ঘোড়দৌড় নিয়ে কথা বলতেন।
তিনি আরও বলেন, মায়ের মৃত্যুর সময় ক্রিস্টোফার মানসিকভাবে ভীষণ দুর্বল অবস্থায় ছিলেন। আদালতে জানানো হয়, ২০২৩ সালের মার্চে সিলভিয়া ফিলিপসের মৃত্যুর কয়েক মাস আগে ক্রিস্টোফার চাকরি ছেড়ে পূর্ণকালীন পরিচর্যাকারী হয়েছিলেন।
চিকিৎসকেরা দীর্ঘদিন সিলভিয়ার কোনো খোঁজ না পেয়ে সন্দেহ প্রকাশ করলে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে পুলিশ তার খোঁজ নিতে বাড়িতে যায়।
প্রথমে ক্রিস্টোফার জানান, তার মা লন্ডনে কাজিনদের সঙ্গে আছেন। কিন্তু কোন কাজিনের কাছে বা কোথায় রয়েছেন- এ বিষয়ে তিনি কোনো তথ্য দিতে পারেননি।
পরে ফ্রিজারের ভেতরে চিতাবাঘের ছাপযুক্ত একটি কাপড়ে ঢাকা সিলভিয়ার মরদেহ পাওয়া যায়। পাশে ছিল গোলাপ ফুল এবং একটি জন্মদিনের কার্ড, যাতে লেখা ছিল- “টু মাম, ফ্রম ক্রিস্টোফার অ্যান্ড টিনা”। টিনা ছিল পরিবারের পোষা কুকুরের নাম।
৭৮ হাজার পাউন্ডের বেশি আত্মসাৎ
ক্রিস্টোফার ফিলিপস যথাযথভাবে দাফন বা সমাহিত করতে বাধা দেয়া এবং প্রতারণার দুটি অভিযোগে আদালতে দোষ স্বীকার করেছেন। দেশটির আদালত জানিয়েছে, মায়ের মৃত্যুর খবর গোপন রেখে তিনি মোট ৭৮ হাজার ১৯০ পাউন্ড ৯২ পেন্স আত্মসাৎ করেছেন। এর মধ্যে ছিল রাষ্ট্রীয় পেনশন, পেনশন ক্রেডিট, পরিচর্যা ভাতা, শীতকালীন জ্বালানি ভাতা, জীবনযাত্রার ব্যয় সহায়তা এবং আবাসন ভাতা। মায়ের মৃত্যুর খবর জানানো হলে এসব অর্থ প্রদান বন্ধ হয়ে যেত।
তদন্তের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তা ডিটেকটিভ চিফ ইন্সপেক্টর ক্লেয়ার ল্যামার্টন বলেন, এটি অত্যন্ত দুঃখজনক একটি ঘটনা। অভিযুক্ত নিজের মায়ের মৃত্যুর বিষয়টি গোপন করে দীর্ঘ সময় ধরে আর্থিক সুবিধা নিয়েছেন।
তিনি আরও বলেন, সিলভিয়ার স্বজনদের প্রতি আমাদের সমবেদনা। আশা করি, অবশেষে তাকে যথাযথভাবে সমাহিত করার মাধ্যমে তারা কিছুটা হলেও শান্তি পেয়েছেন।
