ইরান যুদ্ধে আটকে আছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। যুক্তরাষ্ট্র গত কয়েক দশকে অনেকগুলো যুদ্ধে জড়িয়েছে। এ সকল যুদ্ধ নিয়ে নানান বিতর্ক রয়েছে। সাবেক প্রেসিডেন্টদের যুদ্ধকালীন নেয়া সিদ্ধান্ত দীর্ঘদিন ভুগিয়েছে দেশটিকে। অতীত থেকে ট্রাম্প কতটুকু শিক্ষা নিয়েছেন তা সঠিকভাবে বলা যায় না। ট্রাম্প ইরান সংকটের ভালো কোনো সমাধান খুঁজে না পেলে ইতিহাস এটাকে একটা বড় ভুল হিসেবে দেখবে। তার এই যুদ্ধ বেছে নেওয়ার সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে দাগ ফেলে দিতে পারে।
তবে ট্রাম্প এখনও পর্যন্ত একটি চরম ভুল করা থেকে নিজেকে বিরত রেখেছেন। তিনি সংঘাতকে নিজের নিয়ন্ত্রণের বাইরে যেতে দেননি। একই সঙ্গে তিনি ইরানে স্থল অভিযান থেকে বিরত রয়েছেন। এটিকেই বলা যায় সেই ভুল যেটি তিনি করেননি। গত ষাট বছরের মার্কিন যুদ্ধ ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, যেসকল মার্কিন রাষ্ট্রপ্রধান কোনো সংঘাত থেকে সম্মানজনকভাবে বেরিয়ে আসার পথ খুঁজতে কিংবা নিজেদের ব্যক্তিগত রাজনৈতিক ভাবমূর্তি ও বিশ্ব দরবারে যুক্তরাষ্ট্রের একচ্ছত্র প্রাধান্য রক্ষা করতে গিয়ে যুদ্ধ আরও জোরদার করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তারা পরবর্তীতে এক চরম বিপজ্জনক পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন। অতীতে ভিয়েতনাম, ইরাক ও আফগানিস্তান যুদ্ধ শুরু হওয়ার প্রেক্ষাপট, ভূ-রাজনৈতিক হিসাবনিকাশ এবং সামরিক সমীকরণ সম্পূর্ণ ভিন্ন হলেও, প্রতিটি যুদ্ধেরই শেষ পরিণতি মার্কিন প্রেসিডেন্টদের সামনে তিনটি চরম অনাকাঙ্ক্ষিত বিকল্প হাজির করেছিল। চলমান খারাপ পরিস্থিতিকেই সাধারণ নিয়তি হিসেবে মেনে নেওয়া, সামরিক শক্তি বৃদ্ধি করে সংঘাতের মাত্রা চরম পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া অথবা সব ক্ষতি স্বীকার করে খালি হাতে যুদ্ধক্ষেত্র ছেড়ে ফিরে আসা। ১৯৬৫ সালে ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় তৎকালীন প্রেসিডেন্ট লিন্ডন বি. জনসন তার ওপর বর্তানো এই যুদ্ধের মাত্রা বাড়িয়েছিলেন।
নিজের প্রতিরক্ষামন্ত্রী রবার্ট ম্যাকনামারাকে জনসন বলেছিলেন, কোনো কিছুতেই পরাজিত হওয়ার মতো খারাপ পরিণতি হতে পারে না এবং তিনি জয়ের কোনো পথও দেখতে পাচ্ছেন না। তা সত্ত্বেও তিনি উত্তর ভিয়েতনামে বোমাবর্ষণ জোরদার করেন এবং লাখ লাখ তরুণ মার্কিন সেনাকে যুদ্ধের ভয়াবহতার মুখে ঠেলে দেন। তৎকালীন পররাষ্ট্র দপ্তরের উপ-মন্ত্রী জর্জ বলের সতর্কতা তিনি কানে তোলেননি। তিনি বলেছিলেন, একবার মার্কিন সেনার প্রাণহানি শুরু হলে দেশটি এমন এক চক্রে আটকে যাবে যা থেকে ফেরা অসম্ভব।
এছাড়া কোনো সুনির্দিষ্ট অর্জন ছাড়াই সেখান থেকে পিছু হটলে তা জাতীয় লজ্জায় রূপ নেবে। শেষ পর্যন্ত এই যুদ্ধ জনসনের দ্বিতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট হওয়ার স্বপ্ন চুরমার করে দেয়। পরবর্তীতে ১৯৬৮ সালের নির্বাচনে জিতে ক্ষমতায় আসা রিচার্ড নিক্সন ও তার জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হেনরি কিসিঞ্জারও বুঝতে পেরেছিলেন যে ভিয়েতনামে জয়লাভ করা অসম্ভব। তা সত্ত্বেও মার্কিন সেনাদের সম্মানজনক প্রত্যাহারের পরিবেশ তৈরি এবং নিজেদের পরাজিতদের কাতারে না দেখানোর শেষ চেষ্টা হিসেবে তারা যুদ্ধ কম্বোডিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত করেন। এতে আরও ২০ হাজারের বেশি মার্কিন সেনার মর্মান্তিক মৃত্যু ঘটে। শেষ পর্যন্ত ১৯৭৫ সালে সায়গনের পতন এবং চূড়ান্ত উচ্ছেদ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই সেই অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটে। ভিয়েতনামের তিন দশক পর প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশও ২০০৭ সালে ইরাক যুদ্ধে একই ভুলের পুনরাবৃত্তি ঘটান। ইরাকে পরাজয় আমেরিকার জন্য চরম বিপর্যয় ডেকে আনবে এমন হুঁশিয়ারি দিয়ে তিনি নতুন করে আরও হাজার হাজার সৈন্য পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেন।
এতে সাময়িকভাবে পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসলেও দীর্ঘমেয়াদে মার্কিন সেনাদের আত্মত্যাগকে যৌক্তিক প্রমাণ করতে পারেনি। পরবর্তীতে বারাক ওবামা ‘অনন্ত যুদ্ধ’ শেষ করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় এলেও তালেবানদের ঠেকাতে এবং আল-কায়েদাকে ধ্বংস করতে ২০০৯ সালে আফগানিস্তানে সেনা সংখ্যা এক ধাক্কায় বহু গুণ বাড়িয়ে দেন। তবে যুদ্ধের সময়সীমা বেঁধে দেওয়ার কারণে শত্রুপক্ষ কেবল তাদের ফিরে যাওয়ার প্রহর গুনছিল। মার্কিন রাজনীতির এই সুদীর্ঘ ও কলঙ্কজনক ইতিহাস থেকেই ২০১৬ সালের নির্বাচনে ডনাল্ড ট্রাম্প তার প্রথম নির্বাচনী প্রচারণায় ঘোষণা দেন, তিনি এমন কোনো ‘কখনও শেষ না হওয়া’ অনর্থক ও অন্তহীন যুদ্ধে জড়াবেন না। যে সব যুদ্ধ আমেরিকা কখনো জিততে পারবে না।
কিন্তু আজ ট্রাম্প নিজেই মধ্যপ্রাচ্যের এক কঠিন ত্রিমুখী মোড়ে এসে দাঁড়িয়েছেন। যেখানে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হচ্ছে ইরানের সরাসরি আত্মসমর্পণ না করা কিংবা জোরালো আলোচনায় বসতে অনীহা প্রকাশের কারণে। এই মুহূর্তে ট্রাম্পের সামনে তিনটি পথ খোলা রয়েছে, যার প্রতিটিই রাজনৈতিক ও কৌশলগতভাবে অত্যন্ত তিক্ত ও ঝুঁকিপূর্ণ। প্রথম পথটি হলো, কোনো সুস্পষ্ট বিজয়ের দেখা না পেয়েও অনিশ্চিতকালের জন্য বিমান হামলা অব্যাহত রাখা। পাশাপাশি ভঙ্গুর ও সাময়িক যুদ্ধবিরতি পালন করা এবং হরমুজ প্রণালিতে মার্কিন ও ইরানি নৌ-অবরোধের ধারাবাহিক খেলা চালিয়ে যাওয়া। এই পথ সংঘাতকে বাঁচিয়ে রাখবে সত্য, কিন্তু ট্রাম্পের কাক্সিক্ষত কোনো ফলাফল বা মূল লক্ষ্য অর্জন এনে দেবে না। দ্বিতীয় পথটি হলো মার্কিন সামরিক অভিযানের ওপর ট্রাম্প নিজে যে সীমাবদ্ধতা বজায় রেখেছেন তা তুলে দেওয়া এবং সামরিক লক্ষ্যবস্তুর বাইরে গিয়ে ইরানের সাধারণ অবকাঠামো, বিদ্যুৎ ব্যবস্থা, সেতু ও তেলের কারখানাগুলো ধ্বংস করে দেওয়া। এমনকি সীমিত পরিসরে হলেও খারাগ দ্বীপ বা উপকূলীয় এলাকায় মার্কিন স্থল সেনা পাঠিয়ে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা।
তবে আকাশযুদ্ধকে স্থলযুদ্ধে রূপান্তর করলে তা অভূতপূর্ব রক্তক্ষয়ী সংঘাতের রূপ নেবে। যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাস বলে, যুদ্ধের ময়দানের মার্কিন সেনাদের মরদেহ যখন কফিনে বন্দি হয়ে দেশে ফিরতে শুরু করে, তখন ঘরের ভেতরের রাজনৈতিক সমীকরণ মুহূর্তে বদলে যায়। আসন্ন কংগ্রেসীয় মধ্যবর্তী নির্বাচনের ঠিক কয়েক সপ্তাহ আগে মার্কিন সেনাদের রক্তপাত ট্রাম্পের অভ্যন্তরীণ জনপ্রিয়তায় চূড়ান্ত ধস নামাবে।
তাছাড়া, একবার সেনা আত্মত্যাগ শুরু হলে সেই যুদ্ধ থেকে বের হওয়া আরও কঠিন হয়ে পড়ে, কারণ সেনাদের এই আত্মত্যাগ ব্যর্থ হতে দেওয়া যাবে না এমন নৈতিক চাপ তৈরি হয়। আর ট্রাম্পের জন্য সবচেয়ে বেদনাদায়ক, অপমানজনক এবং রাজনৈতিকভাবে চরম ঝুঁকিপূর্ণ হবে তৃতীয় বিকল্পটি। নিজের প্রধান লক্ষ্যগুলো অপূর্ণ রেখেই এবং কোনো চূড়ান্ত জয় ছাড়াই এই সংঘাত থেকে সব ক্ষয়ক্ষতি মেনে নিয়ে সেনা গুটিয়ে বেরিয়ে আসা। একজন ট্রাম্পের ব্যক্তিত্বের কাছে এমন সিদ্ধান্ত মেনে নেওয়া কতটা কঠিন, তা স্পষ্ট। পরিস্থিতি এতটাই জটিল রূপ নিয়েছে যে পেন্টাগন ইতোমধ্যে নিরপেক্ষ সামরিক বিশ্লেষকদের কাছে জানতে চেয়েছে কীভাবে স্থলযুদ্ধ না বাড়িয়ে বা বড় ঝুঁকি না নিয়ে ইরানকে কঠোর শাস্তি দেওয়া সম্ভব। অন্যদিকে ইরানকে দেওয়া নিজের একের পর এক আল্টিমেটাম কাজ না করায় ট্রাম্পের ব্যক্তিগত হতাশা ও ক্ষোভ উপচে পড়ছে তার সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্টে।
সম্প্রতি তিনি সপ্তাহান্তে নির্ধারিত একটি বিশাল হামলা শেষ মুহূর্তে স্থগিত করেন। তখন তিনি বলেন কূটনৈতিক চুক্তি হয়তো হাত বাড়ালেই সম্ভব। কিন্তু ইরান সরকার পরবর্তীতে কোনো নতুন প্রত্যক্ষ আলোচনার বিষয়টি প্রকাশ্যে অস্বীকার করলে ট্রাম্প চরম ক্ষিপ্ত হন। তিনি ট্রুথ সোশ্যালে অভিযোগ করেন, ইরানের নেতৃত্ব অবিশ্বাস্য রকমের প্রতারক! তারা বৈঠকে বসার জন্য প্রায় ভিক্ষা চায়, আবার পর মুহূর্তেই জনসমক্ষে গর্ব করে বলে যে কোনো আলোচনাই হচ্ছে না। ওভাল অফিস থেকেও ট্রাম্প কঠোর বার্তা পাঠিয়ে ইরানকে তাদের মূল নেতৃত্ব সম্পূর্ণ ধ্বংসের বা ‘নেতৃত্ব সমূলে উচ্ছেদের’ হুমকি দিয়েছেন। কিন্তু তেহরান যদি ট্রাম্পের এই চরম হুঁশিয়ারিও উপেক্ষা করে, তবে ট্রাম্পের সামনে নতুন কী করার থাকবে সেই প্রশ্ন রয়েই যায়। কোনো বড় ধরনের বোমাবর্ষণ যে ইরানকে নতি স্বীকার করিয়ে আলোচনা টেবিলে বসাতে পারবে না, সামরিক বিশ্লেষকরা তা বেশ ভালো করেই জানেন।
তাছাড়া ট্রাম্প যদি ইরানের বিদ্যুৎ কেন্দ্র ও ব্রিজে আঘাত হানেন, তবে পাল্টা জবাবে ইরানও মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগী রাষ্ট্রগুলোর তেল শোধনাগার ও অবকাঠামো ছাই করে দেবে। ইতোমধ্যে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং কাতারের মতো বন্ধু রাষ্ট্রগুলো ট্রাম্পকে ফোন করে বড় ধরনের আক্রমণ না করার জন্য সরাসরি অনুরোধ জানিয়েছে। যাতে পুরো মধ্যপ্রাচ্য দাবানলে পুড়ে না যায়। ট্রাম্প নিজেও বিষয়টি স্বীকার করে বলেছেন, আমরা আক্রমণের জন্য প্রস্তুত ছিলাম, কিন্তু তারা এবং আমাদের মিত্র দেশগুলো ফোন করে আমাদের থামতে অনুরোধ করেছে। হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল জোরপূর্বক মুক্ত করতে গেলে মার্কিন যুদ্ধজাহাজগুলো ইরানি ড্রোন ও মিসাইলের সহজ লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হবে। ফলে সব দিক থেকেই ট্রাম্প এখন এক কঠিন জালে আটকে গেছেন।
বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়া অর্থনৈতিক অস্থিরতা, জ্বালানি তেলের বিশ্ববাজারের অনিয়ন্ত্রণ এবং দেশের ভেতরের সাম্প্রতিক জনমত জরিপে ট্রাম্পের জনসমর্থন নেমে এসেছে মাত্র ৩৩ ভাগে। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি), সিএনএন এবং কিউনিপিয়াকের জরিপ বলছে এটি যুক্তরাষ্ট্রের আধুনিক ইতিহাসে ক্যাপিটল হিল দাঙ্গার পরবর্তী সময় এবং পদত্যাগ করা রিচার্ড নিক্সন ছাড়া আর কোনো নির্বাচিত ট্রাম্প বা অন্য দ্বিতীয় মেয়াদের মার্কিন প্রেসিডেন্টের ক্ষেত্রে দেখা যায়নি। যদিও ট্রাম্প বরাবরই এই সব পরিসংখ্যানকে ভুয়া গণমাধ্যমের বানোয়াট তথ্য বলে উড়িয়ে দিয়ে দাবি করছেন, তার আসল জনপ্রিয়তার নম্বর ইতিহাসে সর্বোচ্চ। তবে ৩ মাস পরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে এই ক্ষোভের ভোট ট্রাম্পের দল রিপাবলিকানদের জন্য বড় বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। ইতিহাস প্রমাণ করে যে কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্টই যুদ্ধে পরাজিত বা ব্যর্থ হয়ে ইতিহাসে নাম লেখাতে চান না। ট্রাম্প এখন পর্যন্ত সংঘাতের পরিধি নিজের সাধ্য ও ক্ষমতার বাইরে যেতে দেননি তা সত্য। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাকে বড় কোনো ধ্বংসযজ্ঞ ছাড়াই নিজের মর্যাদা রক্ষা করে এই মধ্যপ্রাচ্যের জটিল যুদ্ধজাল থেকে নিজেকে ও যুক্তরাষ্ট্রকে বের করে আনবেন, তার ওপরই নির্ভর করছে মার্কিন রাজনীতিতে তার চূড়ান্ত রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ।
