নতুন পররাষ্ট্রনীতিতে দিল্লির পুরোনো কৌশল প্রশ্নের মুখে

হাসিনা পরবর্তী বাংলাদেশকে বুঝতে হিমশিম ভারত

নতুন পররাষ্ট্রনীতিতে দিল্লির পুরোনো কৌশল প্রশ্নের মুখে

ফন্ট সাইজ:

বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক নতুনভাবে গড়ে তোলার চেষ্টা করলেও, দিল্লির সামনে পুরোনো একটি সমস্যাই আবার সামনে এসেছে। তাহলো বাংলাদেশের বদলে যাওয়া পররাষ্ট্রনীতি। কয়েক মাস ধরে ভারত বাংলাদেশকে বোঝানোর চেষ্টা করছে যে, অতীতের উত্তেজনা পেছনে ফেলে দুই দেশ নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করতে পারে। তবে সবচেয়ে বড় অমীমাংসিত ইস্যু রয়ে গেছে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ঘিরে। ২০২৪ সালের আগস্টে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকে তিনি ভারতে অবস্থান করছেন। ভারতের সুপরিচিত টেলিগ্রাম পত্রিকায় ফয়সাল মাহমুদের লেখা প্রতিবেদনে এসব কথা বলা হয়েছে।

এতে আরও বলা হয়, বাংলাদেশের উদ্বেগ প্রশমিত করতে ভারতের সরকার দেশটির সংসদীয় পররাষ্ট্রবিষয়ক স্থায়ী কমিটিকে জানিয়েছে, শেখ হাসিনাকে কেবল মানবিক কারণে আশ্রয় দেয়া হয়েছে এবং তাকে ভারতীয় ভূখণ্ড থেকে সংগঠিত রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে দেয়া হবে না। একই সঙ্গে বাংলাদেশ সরকারের প্রত্যর্পণ অনুরোধও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিবেচনা করছে বলে জানানো হয়েছে। কিন্তু ঢাকার দৃষ্টিতে এসব আশ্বাস খুব একটা বিশ্বাসযোগ্য হয়ে ওঠেনি। কারণ, এই বক্তব্য প্রকাশের কয়েক সপ্তাহ আগেই শেখ হাসিনা ভারতের অবস্থান থেকেই রয়টার্সকে দীর্ঘ সাক্ষাৎকার দেন। সেখানে তিনি আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে কথা বলেন এবং বিচারের মুখোমুখি হতে বাংলাদেশে ফিরে যাওয়ার ইচ্ছার কথাও জানান।

ভারত সেই সাক্ষাৎকারের আয়োজন না করলেও, বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে। ঢাকার কাছে শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান এখনও দুই দেশের সম্পর্কের সবচেয়ে স্পর্শকাতর বিষয়গুলোর একটি।
বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘটনা ভারতের দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক নীতির একটি মৌলিক দুর্বলতাও প্রকাশ করেছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার ছয় মাস পর, দুই দেশের মধ্যে প্রাথমিক উষ্ণতা অনেকটাই কমে এসেছে। দিল্লি এখনও এমন একটি নীতিতে অটল রয়েছে, যেখানে ছোট প্রতিবেশীকে সীমিত কিছু ছাড় ও কৌশলগত চাপের মাধ্যমে পরিচালনা করার চেষ্টা করা হচ্ছে। কিন্তু শেখ হাসিনা আমলে যে রাজনৈতিক বাস্তবতা ভারতের জন্য অনুকূল ছিল, তা এখন আর নেই।

বর্তমান বাংলাদেশ বহুমাত্রিক বা মাল্টি-অ্যালাইনমেন্ট ভিত্তিক পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করছে। অর্থাৎ, একটি দেশের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের জন্য অন্য দেশের সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট করার প্রয়োজন নেই। পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানও সম্প্রতি বলেছেন, একটি দেশের সঙ্গে সম্পর্ক ভালো করা মানে অন্য দেশের সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ করা নয়।
এই পরিবর্তনের প্রতীক হিসেবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার প্রথম বিদেশ সফরে প্রচলিত রীতি ভেঙে ভারত নয়, প্রথমে মালয়েশিয়া এবং পরে চীন সফর করেন। বেইজিংয়ে তিনি বাণিজ্য, অবকাঠামো, বিনিয়োগ ও কৌশলগত সহযোগিতাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি করেন।

বিশ্লেষকদের মতে, এটি চীনের দিকে ঝুঁকে পড়ার কৌশল নয়; বরং ভারতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা কমিয়ে বিকল্প অংশীদার তৈরির প্রচেষ্টা। এদিকে, ব্রিকস সম্মেলনে তারেক রহমানের সম্ভাব্য অংশগ্রহণ নিয়েও দুই দেশে ভিন্ন ব্যাখ্যা দেখা যায়। ভারতের কিছু সংবাদমাধ্যম এটিকে ব্যক্তিগত আমন্ত্রণ হিসেবে উপস্থাপন করলেও, বাংলাদেশের একটি সংবাদ মাধ্যম জানায়, তিনি মূলত বিমসটেক-এর বর্তমান চেয়ারম্যান হিসেবে আমন্ত্রণ পেয়েছেন।

বাংলাদেশে এ ধরনের কূটনৈতিক প্রটোকলকে রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হয়। কারণ, ২০২৩ সালে জি-২০ সম্মেলনে শেখ হাসিনাকে ভারত বিশেষ অতিথি হিসেবে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল, যদিও বাংলাদেশ ওই জোটের সদস্য নয়। বিপরীতে, তারেক রহমানকে একটি আঞ্চলিক সংস্থার প্রতিনিধির পরিচয়ে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। এতে অনেকের ধারণা আরও জোরালো হয়েছে যে, ভারত বাংলাদেশের রাষ্ট্রের চেয়ে শেখ হাসিনার সঙ্গেই বেশি ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলেছিল। এই ব্যক্তিনির্ভর নীতিই ভারতের জন্য এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

শেখ হাসিনার শাসনামলে সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার, উত্তর-পূর্ব ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের নিরাপদ আশ্রয় বন্ধ, ট্রানজিট সুবিধা সম্প্রসারণ এবং দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য বৃদ্ধির মতো উল্লেখযোগ্য সুবিধা পেয়েছিল ভারত। তবে একই সময়ে বাংলাদেশের জনগণের একটি বড় অংশের মধ্যে ধারণা তৈরি হয় যে ভারত একটি কর্তৃত্ববাদী সরকারকে সমর্থন করছে। ফলে সেই সরকার পতনের পর জনঅসন্তোষের একটি অংশ ভারতের দিকেও ছড়িয়ে পড়ে। নির্বাচনের পর দুই দেশের মধ্যে ভিসা সেবা পুনরায় চালু করা এবং উচ্চপর্যায়ের সংলাপ পুনরুজ্জীবিত করার আলোচনা হলেও বাস্তবে অগ্রগতি সীমিত রয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের অন্যতম বড় ভুল হলো ভৌগোলিক নৈকট্যকে অতিরিক্ত গুরুত্ব দেয়া। বাংলাদেশ তার ভৌগোলিক অবস্থান পরিবর্তন করতে না পারলেও, আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সংখ্যা বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। চীন বিনিয়োগ ও অবকাঠামো দিচ্ছে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া নতুন বাজার খুলে দিচ্ছে, উপসাগরীয় দেশগুলো জ্বালানি ও রেমিট্যান্সের উৎস, জাপান দীর্ঘদিনের উন্নয়ন সহযোগী এবং যুক্তরাষ্ট্র বঙ্গোপসাগর অঞ্চলে কৌশলগত আগ্রহ ধরে রেখেছে। ফলে ভারতের ওপর নির্ভরশীলতা আগের তুলনায় অনেক কমেছে।

তবে ভারতের নীতিনির্ধারণী মহলে ইতিবাচক কিছু ইঙ্গিতও দেখা যাচ্ছে। দেশটির সংসদীয় কমিটি বাংলাদেশকে ভারতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে উল্লেখ করে দ্রুত ভিসা সেবা স্বাভাবিক করা এবং ১৯৯৬ সালের গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তি নবায়নের আলোচনা শুরু করার সুপারিশ করেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, ভারত এখনও ভৌগোলিক নৈকট্য, ঐতিহাসিক সম্পর্ক, বিস্তৃত যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং শক্তিশালী অর্থনৈতিক সংযোগের মতো বড় সুবিধা ধরে রেখেছে। কিন্তু ভবিষ্যতে সেই সম্পর্ক টেকসই করতে হলে ব্যক্তিনির্ভর কূটনীতি থেকে সরে এসে সার্বভৌম সমতা, পারস্পরিক স্বার্থ এবং প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতার ভিত্তিতে সম্পর্ক পুনর্গঠন করতে হবে।

অন্যথায়, যদি দিল্লি বাংলাদেশকে সমমর্যাদার অংশীদারের পরিবর্তে পরিচালিত হওয়ার মতো একটি ছোট প্রতিবেশী হিসেবে দেখতেই থাকে, তাহলে ঢাকা বিকল্প অংশীদারদের দিকেই আরও বেশি ঝুঁকবে- আর এবার সেই বিকল্পের অভাব নেই।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন