চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রকাশ্যে আসার খবরে ঢাকায় অস্বস্তি তৈরি হয়েছে। এ নিয়ে ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীকে আনুষ্ঠানিকভাবে আপত্তির কথা জানিয়েছে সরকার। ঢাকার স্পষ্ট বার্তা- শেখ হাসিনাসহ কার্যক্রম নিষিদ্ধ কোনো সংগঠনের কেউ যেন ভারতের ভূখণ্ড ব্যবহার করে বাংলাদেশে অস্থিতিশীলতা তৈরি করতে না পারেন।
গতকাল বিকালে তেজগাঁওয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা
হুমায়ুন কবিরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, বৈঠকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া শেখ হাসিনার সম্ভাব্য বক্তব্যের বিষয়টি আলোচনায় আসে।
বৈঠকে হুমায়ুন কবির ভারতের হাইকমিশনারকে বলেন, শেখ হাসিনাসহ কার্যক্রম নিষিদ্ধ কোনো সংগঠনের ব্যক্তি যেন ভারতের ভূখণ্ড ব্যবহার করে রাজনৈতিক বক্তব্য প্রদান বা বাংলাদেশের অভ্যন্তরে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে কোনো কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে না পারেন, সে বিষয়ে ভারতের সহযোগিতা প্রত্যাশা করে ঢাকা। তিনি আরও বলেন, এ ধরনের কর্মকাণ্ড দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ইতিবাচক অগ্রগতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। জবাবে ভারতের হাইকমিশনার বিষয়টি যথাযথভাবে বিবেচনা করে প্রয়োজনীয় খোঁজখবর নেয়া এবং এ বিষয়ে সচেষ্ট থাকার আশ্বাস দেন।
বৈঠকে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের সার্বিক বিষয়ও আলোচিত হয়। পারস্পরিক শ্রদ্ধা, আস্থা ও অভিন্ন স্বার্থের ভিত্তিতে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও জোরদার করার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন উভয় পক্ষ। নিয়মিত সংলাপ ও গঠনমূলক সম্পৃক্ততা অব্যাহত রাখার ওপরও গুরুত্ব আরোপ করা হয়।
এদিকে আমাদের কলকাতার প্রতিনিধি জানান, আগামী ডিসেম্বরে শেখ হাসিনা ঢাকায় ফিরতে চাইছেন। দিন পনেরো আগেই ভারতে অবস্থানরত দলের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের সঙ্গে দিল্লিতে মুখোমুখি বৈঠক করেছেন। সেখানে তিনি দলের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে বাংলাদেশে গিয়ে আদালতে আত্মসমপর্ণের প্রস্তাব দিয়েছেন। কোন কোন নেতা ঢাকায় গিয়ে আত্মসমর্পণে রাজি তারও তালিকা করা হয়েছে। প্রসঙ্গত, গণহত্যার দায়ে শেখ হাসিনাসহ একাধিক নেতার বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে ঢাকার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।
আওয়ামী লীগ সূত্রে আরও জানা গেছে, হাসিনা বিভিন্ন ইউনিয়ন স্তরের কয়েকজন নেতার সঙ্গেও তার ফেরা নিয়ে আলোচনা করেছেন। জেলা পর্যায়ের একাধিক নেতাদের সঙ্গে কথা বলেও তিনি পরিস্থিতির খোঁজখবর নিচ্ছেন। জানা গেছে, হাসিনা বর্তমান সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টির লক্ষ্যে পশ্চিমা গণমাধ্যমগুলোকে একের পর এক সাক্ষাৎকার দিচ্ছেন। এদিকে ৫ই আগস্ট দিল্লিতে প্রকাশ্যে এসে নিজের পরিকল্পনার কথা বিস্তারিত জানাবেন বলেই মনে করা হচ্ছে।
হাসিনার প্রকাশ্যে আসা নিয়ে যা জানা যাচ্ছে: চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের মুখে ২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট ক্ষমতা ছেড়ে ভারত চলে যান শেখ হাসিনা। এরপর থেকে তিনি ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে অবস্থান করছেন। গত দুই বছরে তার কয়েকটি অডিও বার্তা প্রকাশ পেলেও তিনি প্রকাশ্যে কোনো রাজনৈতিক অনুষ্ঠানে অংশ নেননি বা সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হননি।
তবে ভারতীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ৫ই আগস্ট নয়াদিল্লির ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাব অব সাউথ এশিয়া (এফসিসি সাউথ এশিয়া) একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে। সংগঠনটির প্রচারিত সূচি অনুযায়ী, ওই অনুষ্ঠানে শেখ হাসিনা তার ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক পরিকল্পনা এবং বাংলাদেশে ফেরার বিষয় নিয়ে বক্তব্য দিতে পারেন। অনুষ্ঠানটি স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৬টা থেকে সাড়ে ৭টা পর্যন্ত মথুরা রোডের স্যার মার্ক টালি অডিটোরিয়ামে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। এটি অনলাইনেও সরাসরি সম্প্রচার করার পরিকল্পনা রয়েছে। অনুষ্ঠানে শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়, আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতা, সাবেক মন্ত্রী, সাবেক কূটনীতিক ও অন্য আমন্ত্রিত অতিথিদের উপস্থিত থাকার কথা বলা হয়েছে।
ফলে বিষয়টি ঢাকার নজরে এসেছে। এর আগে এমন একটি কর্মসূচি হাতে নিয়েছিলেন আওয়ামী লীগ নেতারা। দিল্লিতে ওই অনুষ্ঠানের আয়োজন করেও তা আর করতে পারেননি।
হাসিনার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ইস্যুতে ভারতের সংসদীয় কমিটির বক্তব্য: কয়েকদিন আগে ভারতের পার্লামেন্টের পররাষ্ট্র বিষয়ক স্থায়ী কমিটি বাংলাদেশ পরিস্থিতি নিয়ে তাদের প্রতিবেদনে মন্তব্য করে, ভারতের মাটিতে অবস্থানরত শেখ হাসিনার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার সুযোগ থাকা উচিত নয়।
প্রতিবেদনটিতে বলা হয়, ভারতের ভূখণ্ড কোনো প্রতিবেশী দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে সক্রিয়ভাবে ব্যবহৃত হওয়া উচিত নয়। যদিও এটি সরকারের আনুষ্ঠানিক নীতিগত ঘোষণা নয়, তবুও বিষয়টি ভারতীয় নীতিনির্ধারণী মহলে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এই প্রেক্ষাপটেই শেখ হাসিনার সম্ভাব্য প্রকাশ্য উপস্থিতির বিষয়টি বাংলাদেশের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতের নজরে আনা হলো। ঢাকা মনে করছে, বিষয়টি সংবেদনশীলভাবে মোকাবিলা করা হলে দুই দেশের বিদ্যমান ইতিবাচক সম্পর্ক অক্ষুণ্ন রাখা সহজ হবে।
