বাংলাদেশ টেলিভিশনে প্রচারিত জনপ্রিয় অনুষ্ঠান ‘ইত্যাদি’ তথ্য-শিক্ষা ও বিনোদনের ক্যানভাসে আঁকা সমাজ সংস্কার, শিক্ষা ও দেশপ্রেমের এক অনবদ্য চিত্রকর্ম। চলছে প্রায় চার দশক ধরে। বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায় গিয়ে ‘ইত্যাদি’ ধারণ করা হচ্ছে দীর্ঘদিন ধরে, সেই ধারাবাহিকতায় এবারের জেলা মেঘনা পাড়ের লক্ষ্মীপুর। প্রতিবারের মতোই বিচিত্র বিষয়ের সমন্বয়ে নির্মাণ করা হয়েছে এবারের ‘ইত্যাদি’। ইত্যাদি’র প্রতিটি অনুষ্ঠানের শুরুতেই তুলে ধরা হয় সেই জেলার প্রয়োজনীয় তথ্য।
লক্ষ্মীপুরের স্লোগান- ‘সয়াবিন ও সুপারির লক্ষ্মীপুর’। তাই এবারের পর্বে কৃষিপণ্য হিসেবে এই দু’টি ফসলের ওপর জানা-অজানা বিভিন্ন তথ্য সম্বলিত একটি প্রতিবেদন করা হয়েছে। এ ছাড়াও জেলার দর্শনীয় ও উল্লেখযোগ্য স্থান হিসেবে জনপ্রিয় মেঘনা সৈকত আলেকজান্ডার, কুয়াশাময় খোয়াসাগর দিঘি, দালালবাজার রাজবাড়ী ও অনুষ্ঠানস্থল নবীন কিশোর উচ্চ বিদ্যালয় সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরা হয়। যা অনেকের কাছেই অজানা।
লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জে অবস্থিত চট্টগ্রাম বিভাগের সেরা স্কুল পশ্চিম আঙ্গারপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ওপর নির্মিত প্রতিবেদন দেখে মনে হয়েছে এ ধরনের শিক্ষা পদ্ধতি ও পড়ালেখার সুন্দর পরিবেশ ও শৃঙ্খলা অন্যান্য স্কুল-কলেজেও থাকা প্রয়োজন। অনেকেই স্কুলটিকে মডেল হিসেবে গ্রহণ করতে পারেন। প্রথম এভারেস্ট বিজয়ী নারী নিশাত মজুমদারের সাক্ষাৎকারটি ছিল অসাধারণ। ইত্যাদি’র এই পর্বে তার অন্তর্ভুক্তির কারণ হিসেবে জানা গেল তার বাড়িও এই লক্ষ্মীপুর জেলায়। নিশাত এবং এভারেস্ট বিজয়ী এমএ মুহিত ২০১২ সালে এভারেস্ট শৃঙ্গে পৌঁছালে তাদের হাতে ছিল ইত্যাদি’র লোগোটি। কারণ হিসেবে নিশাত বলেন, ইত্যাদি আমাদের সংস্কৃতি বিশ্বময় ছড়িয়ে দিচ্ছে এবং আমাদের যে স্বতন্ত্র সাংস্কৃতিক সত্তা আছে সেটাকে তুলে ধরার জন্য লোগোটি এভারেস্ট চূড়ায় নিয়ে গিয়েছিলাম। বিদেশি প্রতিবেদনে এবার দেখানো হয়েছে ‘গ্রেট ওশান রোড’। মেলবোর্ন থেকে ১৫০ কিলোমিটার দূরে দক্ষিণ মহাসাগরের কোলঘেঁষে ২৪৩ কিলোমিটার দীর্ঘ এই পথ পৃথিবীর একটি ঐতিহাসিক ও দর্শনীয় দীর্ঘ পথ। যাকে বলা হয় বিশ্বের বৃহত্তম যুদ্ধ স্মৃতিস্তম্ভ।
এবারের দর্শক পর্বে আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন-এই লক্ষ্মীপুরেরই সন্তান প্রখ্যাত নাট্যব্যক্তিত্ব দিলারা জামান। নির্বাচিত দর্শকদের সঙ্গে তার তাৎক্ষণিক অভিনয় ছিল অত্যন্ত প্রাণোচ্ছল। লক্ষ্মীপুরের তানজিনা রুমা এবং ফেনীর সাজিয়া সুলতানা পুতুল ছিলেন লক্ষ্মীপুর পর্বের সংগীতশিল্পী। ইত্যাদি’তে এভাবে এই প্রজন্মের এবং স্থানীয় শিল্পীদের সুযোগ করে দিলে আমাদের পরিচিত শিল্পীর সংখ্যা যেমন বৃদ্ধি পাবে, শিল্পীরাও তেমনি উৎসাহিত হবেন। সমসাময়িক বিষয়ের ওপর নির্মিত ছোট ছোট নাটিকা, যেমনÑ প্রাইভেট পাবলিসিটি টিভি যাকে তৈলটিভি নামে আখ্যায়িত করা হয়েছে। পর্বটি দেখলেই মনের পর্দায় আমাদের দেশের ২/১টি টেলিভিশন চ্যানেলের চিত্র ভেসে ওঠে। আবার দুর্নীতিবাজ একজন কর্মকর্তার নীতি-নৈতিকতার ওপর টকশোতে বক্তব্য প্রদানের নাটিকাটিও অত্যন্ত কটাক্ষপূর্ণ। স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান বা এনজিও’র নামে কিছু ভুঁইফোঁড় প্রতিষ্ঠানের অপকর্ম তুলে ধরা হয়েছে ইত্যাদি’র গরু নাটিকাটিতে। এই গরু সেই গরু নয়, এটি প্রতিষ্ঠানের নাম। আজকাল অনেকেই সুস্থ মানুষকে নানা রকম স্বাস্থ্য সমস্যা নিয়ে প্রশ্নবাণে জর্জরিত করে অসুস্থ বানিয়ে ফেলা, ইউটিউব ভিডিও’র জন্য পারিবারিক অভিনয় শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হওয়া, বিয়ে-শাদি ইভেন্টে পরিণত হওয়া এবং ইউটিউবনির্ভর চিকিৎসার কারণে রোগীর মরণদশা নিয়েও ছিল ক’টি পর্ব। যা আমাদের বাস্তব সামাজিক অবস্থারই প্রতিফলন। এসব কিছুর সঙ্গে অনুষ্ঠানের অন্যতম আকর্ষণ হানিফ সংকেতের ছন্দময় উপস্থাপনাও ছিল উপভোগ্য। এবারের ইত্যাদি’তেও ছিল একটি চোখ ভেজানো প্রতিবেদন। মজনু মাঝি, যিনি সাতবার মেঘনার ভাঙনে হারিয়েছেন সর্বস্ব। হারিয়েছেন নিজের মাথাগোঁজার ঠাঁই। শুধু ভিটেমাটিই নয়, নিয়তির নিষ্ঠুর নিয়মে স্বল্প সময়ের ব্যবধানে হারিয়েছেন উপার্জনক্ষম চার সন্তান। দুঃখ-শোকে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ হয়ে মজনু মাঝি এখন নিথর নিস্তব্ধ। হুইলচেয়ারেই কাটে তার সময়। তার স্ত্রী খাদিজা স্বামীকে হুইলচেয়ারে বসিয়ে পথে পথে ঘুরে বেড়াচ্ছেন দু’মুঠো খাবারের জন্য। প্রতিবেদনটি দেখে অনেকেই আবেগ আপ্লুত হয়েছেন, অশ্রুসজল হয়েছেন। ভাগ্যবিড়ম্বিত মজনু মাঝির চিকিৎসার জন্য ইত্যাদি’র মাধ্যমে দুই লাখ টাকার একটি চেক দেয়া হয়। পুরো ইত্যাদি দেখে বোঝা যায় শ্রম, মেধা আর গবেষণার ফসল এক একটি ‘ইত্যাদি’। এজন্যই ইত্যাদি’র তুলনা ইত্যাদি-ই।
