সন্তান-ভাই হারিয়ে দিশেহারা কাশ্মীরিরা

অবরুদ্ধ কাশ্মীর

সন্তান-ভাই হারিয়ে দিশেহারা কাশ্মীরিরা

ফন্ট সাইজ:

পাকিস্তান-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের (পিএকে) রাওয়ালাকোট শহরের প্রধান বিক্ষোভস্থল থেকে খুব বেশি দূরে নয় ডা. আনোয়ারের অস্থায়ী চিকিৎসাকেন্দ্র। একটি বাড়ির অতিরিক্ত শোবার ঘরকে ওষুধ ও চিকিৎসাসামগ্রী রাখার কক্ষ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। বাইরে টানানো লাল ত্রিপলের নিচে রাখা একটি খাটই এখন অঞ্চলটিতে গুরুতর আহতদের চিকিৎসার প্রধান স্থান। সেই খাটে শুয়ে আছেন শফকত হুসেইন। তার বুকে গুলি লেগেছে। তিনি যে চাদরের ওপর শুয়ে আছেন, সেটি আগেই অন্য আহতদের রক্তে রঞ্জিত হয়ে গেছে। তিনি মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন।

গত দুই মাসে অঞ্চলটিতে পাকিস্তানি নিরাপত্তা বাহিনী ও জয়েন্ট আওয়ামি অ্যাকশন কমিটির (জেএএসি) বিক্ষোভকারীদের মধ্যে সংঘর্ষে কয়েক ডজনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। প্রায় ৪৫ লাখ মানুষের আবাসস্থল এই অঞ্চলে বর্তমানে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। বিবিসি জানিয়েছে, রাওয়ালাকোটে প্রবেশ করে বিক্ষোভের কেন্দ্রস্থলে থাকা মানুষের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ পাওয়া তারাই প্রথম কোনো আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম।

নিরাপত্তার স্বার্থে এই প্রতিবেদনে ব্যবহৃত অধিকাংশ নামের মতো ডা. আনোয়ারের নামও পরিবর্তন করা হয়েছে।
ডা. আনোয়ার বিবিসিকে বলেন, আমাদের কাছে প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়ার মতো পর্যাপ্ত সরঞ্জাম রয়েছে। আমরা রক্তক্ষরণ বন্ধ করতে পারি, ক্ষত পরিষ্কার করে ব্যান্ডেজ করতে পারি এবং শরীরে আটকে থাকা ওপরের দিকের গুলি বের করতে পারি। কিন্তু যাদের বুক, পেট, মাথা বা অন্য গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গে গুরুতর আঘাত লেগেছে, তাদের উন্নতমানের হাসপাতালে নেয়া জরুরি।
তিনি আরও বলেন, একই সময়ে এ ধরনের অনেক রোগী এলে বড় হাসপাতালগুলোর পক্ষেও পরিস্থিতি সামাল দেয়া কঠিন হবে।

ডা. আনোয়ারের ভাষ্য, ২৭ জুলাই থেকে তার এই অস্থায়ী ক্লিনিকে প্রায় ৫০ থেকে ৬০ জন গুরুতর আহত রোগীর চিকিৎসা করা হয়েছে। তাদের মধ্যে ১৫ থেকে ২০ জনকে তিনি নিজেই গুলিবিদ্ধ অবস্থায় চিকিৎসা দিয়েছেন।
‘হাসপাতালে গেলে গ্রেপ্তার বা গুলি করার ভয়’
বিক্ষোভকারীদের দাবি, তারা প্রধান হাসপাতালে যেতে ভয় পাচ্ছেন, কারণ সেখানে গেলে গ্রেপ্তার কিংবা গুলি করার আশঙ্কা রয়েছে। তবে কর্তৃপক্ষ এই অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছে, এমন দাবি সঠিক নয়।

ডা. আনোয়ার বলেন, যারা নিহত বা গুরুতর আহত হয়েছে, তাদের বেশিরভাগের বয়স আনুমানিক ১৫-১৬ বছর থেকে ৩২-৩৫ বছরের মধ্যে। ৪০ বছরের বেশি বয়সী রোগী আমি খুব কমই দেখেছি।
বিবিসি এই প্রতিবেদনে করার সময় শফকত হুসেইনের শয্যার পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন তার বন্ধু আলী। চোখের পানি শাল দিয়ে মুছতে মুছতে তিনি বলেন, আমরা শুধু সাশ্রয়ী মূল্যের আটা, বিদ্যুৎ আর আমাদের মৌলিক অধিকার চেয়েছিলাম। অথচ আমাদের ভাইদের হত্যা করা হচ্ছে। আমাদের অপরাধ কী ছিল? কেন আমাদের ওপর জীবন্ত গুলি চালানো হচ্ছে?

জেএএসি বিক্ষোভকারীদের ভাষ্য, তাদের আন্দোলন জনগণের অধিকার আদায়ের জন্য। বিদ্যুতের মূল্য, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবাসহ বিভিন্ন বিষয় তাদের দাবির মধ্যে রয়েছে। তাদের দাবি, গত বছরের অক্টোবর মাসে পাকিস্তান সরকার ও পাকিস্তান-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীর সরকারের সঙ্গে একটি চুক্তি হয়েছিল, যা এসব সমস্যা সমাধানের কথা ছিল। কিন্তু সেই চুক্তি বাস্তবায়ন করা হয়নি।

তবে স্থানীয় সরকার এই দাবি মানতে রাজি নয়। সরকারের অভিযোগ, জেএএসি একটি সশস্ত্র সংগঠন এবং চলমান নির্বাচন ব্যাহত করাই তাদের উদ্দেশ্য। তাই বিক্ষোভকারীদের আঞ্চলিক রাজধানী মুজাফফরাবাদে মিছিল করার অনুমতি দেয়া হবে না।

বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত জুন মাসে পাক সরকার জেএএসিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। সংগঠনটিকে বিদেশি অর্থায়নে পরিচালিত ‘সন্ত্রাসী’ সংগঠন হিসেবে আখ্যা দেয়া হয়েছে।
জেএএসি এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। তাদের দাবি, তারা শান্তিপূর্ণ আন্দোলন করছে। বিদেশে বসবাসরত পাকিস্তান-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের প্রবাসীদের কাছ থেকে অর্থ পেলেও ভারতের পৃষ্ঠপোষকতায় তারা পরিচালিত হয় না।
সংগঠনটির নেতারা বলেন, তারা সহিংসতা শুরু করেনি; বরং পাকিস্তানের নিরাপত্তা বাহিনী তাদের ওপর গুলি চালাচ্ছে এবং তারাই সহিংসতার শিকার।

যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন
অঞ্চলটিতে ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ এবং বিভিন্ন সড়ক অবরুদ্ধ বা কড়া নিরাপত্তার মধ্যে থাকায় পরিস্থিতি সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে।
রাওয়ালাকোটে পৌঁছে বিবিসি এমন একাধিক পরিবারের সঙ্গে কথা বলেছে, যারা দাবি করেছেন, তাদের স্বজনরা বিক্ষোভে গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হয়েছেন।
আসমা নামে এক নারী বলেন, তিনি নিজেও বিক্ষোভে ছিলেন। সেই সময় তিনি জানতে পারেন, তার একমাত্র ছেলে গুলিবিদ্ধ হয়েছে। তিনি বলেন, আমরা শুধু আমাদের অধিকার চেয়েছিলাম। আমরা সন্ত্রাসী নই। সন্তানের কথা বলতে গিয়ে আসমা বলেন, সে জানত এতে ঝুঁকি আছে। কিন্তু সে বিশ্বাস করত, ন্যায়বিচারের জন্য দাঁড়ানো জরুরি। সে বলত, ন্যায়সঙ্গত উদ্দেশ্যে জীবন দেয়া সম্মানের বিষয়।
এ ছাড়া সালমান নামে আরেক ব্যক্তি জানান, পাক বাহিনীর গুলিতে তিনি তার ছোট ভাইকে হারিয়েছেন।

তিনি বলেন, সে আমাদের পরিবারের সবচেয়ে ছোট সদস্য ছিল। সবাই তাকে খুব ভালোবাসত। তাকে হারানো আমাদের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি।
“তবু আমি গর্ব অনুভব করি যে, সে মানুষের অধিকার রক্ষার জন্য দাঁড়িয়ে জীবন দিয়েছে। সে কারও সঙ্গে লড়াই করছিল না বা কাউকে আক্রমণও করেনি।”
আয়ুব, যিনি আগে সশস্ত্র বাহিনীতে কর্মরত ছিলেন, তিনিও বিক্ষোভে নিজের ছেলেকে হারিয়েছেন।

তিনি বলেন,
আমি একজন অবসরপ্রাপ্ত সৈনিক। জেনারেল জিয়া-উল-হক এবং জেনারেল পারভেজ মোশাররফের সামরিক শাসনের সময়ও আমি বেঁচে ছিলাম। কিন্তু এখন যা ঘটছে, তার মতো কিছু আমি কখনও দেখিনি। আমার মতে, এটি চরম অন্যায়।
তিনি আরও বলেন, আমার ছেলে কোনো ভুল করেনি। বিক্ষোভকারীদের কেউই কোনো ভুল করেনি।

সরকারের জবাব
তবে পাকিস্তান-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীর সরকার এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে বলেছে, নিরাপত্তা বাহিনী শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের ওপর নির্বিচারে গুলি চালায়নি।
সরকারের বক্তব্য অনুযায়ী, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কেবল তাদের বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা নিয়েছে, যারা নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের ওপর হামলা করেছে, জননিরাপত্তা বিঘ্নিত করেছে অথবা বৈধ সরকারি কর্তৃত্বে বাধা সৃষ্টি করেছে।

খাদ্যসংকটের চিত্র
বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শহরে খাদ্যসংকটের চিত্রও দেখা গেছে। অনেক বিক্ষোভকারী নিজেদের কাছে যা খাবার ছিল, তা অন্যদের সঙ্গে ভাগাভাগি করে খাচ্ছিলেন। অধিকাংশ দোকানপাট বন্ধ ছিল।
কেউ কেউ বিবিসিকে জানান, মোটরসাইকেলের পেছনে করে চালের বস্তা গোপনে শহরে আনার চেষ্টা চলছে।

শহরে প্রবেশের কিছু সড়কে গাছ ফেলে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করা হয়েছে। কর্তৃপক্ষের দাবি, এসব করেছে জেএএসি। অন্যদিকে প্রধান সড়কের বিভিন্ন প্রবেশপথে নিরাপত্তা চৌকি বসানো হয়েছে।
তবে পাকিস্তান-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীর সরকার বলেছে, তারা রাওয়ালাকোটে খাদ্য বা চিকিৎসাসামগ্রী প্রবেশে বাধা দিচ্ছে- এমন অভিযোগ মিথ্যা। বরং এসব সরবরাহ শহরে পৌঁছাতে তারা সহযোগিতা করছে।

এদিকে অঞ্চলটির সরকার বারবার দাবি করেছে, জেএএসি একটি সহিংস সংগঠন। তারা ড্রোনে ধারণ করা কিছু ভিডিও প্রকাশ করেছে, যেখানে তাদের দাবি অনুযায়ী, জেএএসির সদস্যদের ছাদের ওপর অস্ত্র হাতে দেখা গেছে।
সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ কর্মকর্তারা এমন কিছু আগ্নেয়াস্ত্রও প্রদর্শন করেছেন, যা তাদের দাবি অনুযায়ী জেএএসির কাছ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে।

তারা স্থানীয় সংবাদমাধ্যমকে আরও জানান, জিজ্ঞাসাবাদে এক ব্যক্তি স্বীকার করেছেন যে, প্রতিটি আধাসামরিক বাহিনীর সদস্যকে হত্যা করলে তাকে এক কোটি পাকিস্তানি রুপি (প্রায় ২৬ হাজার ৭০০ পাউন্ড সমমূল্য) পুরস্কার দেয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিল।

জেএএসির পাল্টা দাবি
জেএএসির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য এবং বর্তমানে রাওয়ালাকোটে অবস্থানরত উমর নাজির এই অভিযোগ অস্বীকার করেন। তবে তিনি স্বীকার করেন যে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের মৃত্যু ঘটেছে।

তিনি বলেন, দেখুন, এমন মৃত্যু ঘটে থাকতে পারে- এ বিষয়ে আমি মন্তব্য করতে চাই না।

“তবে আমার বিশ্বাস, তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন কিছু ব্যক্তি আমাদের মধ্যে অনুপ্রবেশ করেছিল। এমন লোকজন আমাদের মধ্যে অবশ্যই ছিল।”
তিনি আরও বলেন, আমার ধারণা, নিজেদের অবস্থানকে বৈধ প্রমাণ করার জন্য তারাই এমন ঘটনা ঘটিয়ে থাকতে পারে। আমি নিশ্চিতভাবে বলছি না, তবে আমাদের পক্ষ থেকে এ ধরনের সহিংসতার কোনো প্রমাণ নেই।

বিবিসির পর্যবেক্ষণ
বিবিসি জানিয়েছে, তারা যেসব জেএএসির বিক্ষোভে উপস্থিত ছিল, সেখানে কোনো অস্ত্র বা গুলি চালানোর ঘটনা তাদের চোখে পড়েনি। তবে রাতের বেলায় বারবার গুলির শব্দ শোনা গেছে। কে গুলি চালাচ্ছিল বা কাকে লক্ষ্য করে গুলি করা হচ্ছিল, তা স্পষ্ট ছিল না।

পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত উত্তেজনাপূর্ণ ও অনিশ্চিত। কখন পরিস্থিতি আরও সহিংস হয়ে উঠতে পারে, তা কেউই বলতে পারছে না।
উমর নাজির বলেছেন, জেএএসি আলোচনায় বসতে প্রস্তুত। তবে আপাতত তাদের পক্ষ থেকে আরও বিক্ষোভ কর্মসূচির পরিকল্পনা রয়েছে।


কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন