ঢাকার কামরাঙ্গীরচরের বাসিন্দা মোহাম্মদ সেলিম। পেশায় প্লাম্বার মিস্ত্রি। বছরখানেক আগে মলদ্বারে ক্যান্সার ধরা পড়লে কর্মহীন হয়ে পড়েন তিনি। এখন মলদ্বার থেকে আলাদা নল বের করে শরীরের সঙ্গে যুক্ত করে রেখেছেন মল ত্যাগের জন্য। যত দিন বাঁচবেন স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় আর মল ত্যাগ করতে পারবেন না। সেলিম মানবজমিনকে বলেন, গত বছরের নভেম্বরে ক্যান্সার হাসপাতালে কেমোথেরাপি শেষ করেছি? নভেম্বরেই আবেদন করি রেডিওথেরাপির জন্য। সেই আবেদনের ফলাফল পেয়েছি গত ২রা আগস্ট।
সেলিম আরও বলেন, গত দেড় মাস আগে ধানমণ্ডির একটি বেসরকারি হাসপাতাল থেকে অপারেশন করাই। এরপর রেডিওথেরাপি দেয়ার জন্য ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালে ঘুরি? মিরপুরে একটি বেসরকারি হাসপাতালে দেড় লাখ টাকা লাগবে বললো শুধু থেরাপি দিতে। ওষুধ-পথ্যের খরচ আছে। বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে গেলে তারা জানায়, বাইরের রোগী তারা চিকিৎসা দেন না। ঢামেকে গেলে জানায়, তাদের মেশিন দিয়ে আমার এই রোগের চিকিৎসা সম্ভব না। বাধ্য হয়েই ২১ হাজার টাকা খরচ করে ক্যান্সার হাসপাতালের জন্য প্রস্তুতি নিয়েছি।
ক্যান্সার চিকিৎসার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধাপ রেডিওথেরাপি। সাধারণত সার্জারি, কেমোথেরাপি দেয়ার পর রেডিওথেরাপি দেয়া হয়। অথচ দেশের ক্যান্সার চিকিৎসার একমাত্র বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে দীর্ঘদিন ধরে রেডিওথেরাপি যন্ত্রের তীব্র সংকট চলছে। বর্তমানে মাত্র দু’টি লিনিয়ার অ্যাক্সিলারেটরে (লিনাক) চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। অপেক্ষমাণ তালিকায় রয়েছেন ৬ হাজারের বেশি রোগী। নতুন রোগীদের অনেককেই সিরিয়াল দেয়া যাচ্ছে না। আর যারা চিকিৎসার সুযোগ পাচ্ছেন, তাদের কেউ কেউ রেডিওথেরাপির জন্য প্রায় এক বছর অপেক্ষা করার পর সিরিয়াল পাচ্ছেন।
গতকাল সরজমিন ক্যান্সার হাসপাতালের রেডিয়েশন অনকোলজি বিভাগে ঘুরে রোগীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তাদের বেশির ভাগই এসেছেন ঢাকার বাইরের বিভিন্ন জেলা থেকে। বেশির ভাগই থেরাপি দেয়ার জন্য সিরিয়াল পেয়েছেন প্রথম দিন হাসপাতালে আসার দুই থেকে আড়াই মাস পর। তাদের মধ্যে কেউ কেউ পেয়েছেন ৯ থেকে ১০ মাস অপেক্ষার পর। রোগীদের মধ্যে কারও অবস্থা ছিল গুরুতর। তবে, কিছু কিছু রোগীর অল্প সময়ের মধ্যেই রেডিওথেরাপি দেয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে হাসপাতালে। দূর-দূরান্ত থেকে ক্যান্সার হাসপাতালে এসে ফেরত যাওয়া কিংবা নিয়মিত থেরাপি দেয়ায় ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে রোগী-স্বজনদের। থেরাপি দেয়ার কক্ষের সামনে ভিড় করছিলেন রোগী ও স্বজনরা।
রেডিওয়েশন অনকোলজি বিভাগের পুরাতন লিনাক যন্ত্র দু’টোর ফটক বন্ধ করে রাখা হয়েছে। লিনাক-১ এর ফটকে লেখা: লিনাক-১ দিয়ে প্রথম চিকিৎসা দেয়া হয় ২০/২/২০১১ সালে, সর্বশেষ চিকিৎসা দেয়া হয়েছে ২১/১২/২৪ তারিখে। ইঊজ ফবপষধৎধঃরড়হ রং ড়হ ঢ়ৎড়পবংং । লিনাক-৪ এর ফটকে লেখা: ১১/৮/১৪ তারিখে প্রথম চিকিৎসা দেয়া শুরু হয়। ২১/১২/২৪ তারিখে সর্বশেষ চিকিৎসা দেয়া হয়েছে এবং যন্ত্রটির অবস্থা সম্পর্কে লিখা ছিলো: ঈগঝ ৎবষধঃবফ হবমড়ঃরধঃরড়হ ঢ়ৎড়পবংং ড়হ ঢ়ৎড়মৎবংং। তাছাড়াও লিনাক-২ ও লিনাক-৫ যন্ত্র দুটো পুরোদমে কাজ করছে। যা দিয়ে হাসপাতালে রাত পর্যন্ত থেরাপি দেয়া হচ্ছে।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, লিনাক মেশিনে সপ্তাহে পাঁচ দিন; শনি থেকে বুধবার অনর্গল চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। প্রতিদিনে ২৫০ জন রোগীকে চিকিৎসা দেয়া হয়। অর্থাৎ, ২৫০টি শয্যা রয়েছে থেরাপি দেয়ার জন্য। এই ২৫০ জনের থেরাপি দেয়ার জন্য অন্তত ৭ সপ্তাহ লাগবে। আবার, আরও সাড়ে ৬ হাজার রোগী রয়েছে, যাদেরকে ইতিমধ্যেই সিরিয়াল দিয়ে রাখা হয়েছে। যাদের সিরিয়াল দেয়া হয়েছে, তারা ন্যূনতম সাত সপ্তাহ অপেক্ষা করতে হবে।
জামালপুর থেকে এসেছেন ৭৩ বয়সী দুলাল। গলায় ক্যান্সার ধরা পড়েছে তার। সপ্তাহে ৫ বার দিতে হয় থেরাপি। তিনি বলেন, শুরুতে আসার ৬ মাস পর রেডিওথেরাপির সিরিয়াল পেয়েছি। কারও পরিচিত কেও হাসপাতালে থাকলে হয়তো আগেই সিরিয়াল পেয়ে যাচ্ছেন। ফুসফুসে ক্যান্সার নিয়ে ঝিনাইদহ থেকে এসেছেন আবু বকর। তিনি দুই মাস পর পেয়েছেন সিরিয়াল। আবু বকর বলেন, প্রথমে আসার পর কাগজপত্র রেডি করার দুই মাস পর সিরিয়াল দেয়। এক মাস আগে একটা দিয়েছি। মাঝে ২ বার দেয়ার কথা ছিল, অসুস্থ হয়ে পঙ্গু হাসপাতালে ভর্তি ছিলাম বেশ কিছুদিন। ক্যান্সার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ক্যান্সার চিকিৎসায় রেডিওথেরাপির গুরুত্ব অপরিসীম। ক্যান্সার চিকিৎসা করা হয় প্রধানত তিনটি প্রক্রিয়ায়। সার্জারি করা, কেমোথেরাপির মাধ্যমে ওষুধ দেয়া ও রেডিওথেরাপির মাধ্যমে চিকিৎসা দেয়া। জনসংখ্যা অনুযায়ী দেশে অন্তত আড়াইশ’ মেশিন প্রয়োজন। কিন্তু যে পরিমাণ মেশিন আছে দশ ভাগের একভাগও সেবা দেয়া যাচ্ছে না।
ক্যান্সার রোগতত্ত্ববিদ ও গণস্বাস্থ্য সমাজভিত্তিক ক্যান্সার হাসপাতালের প্রকল্প সমন্বয়কারী ডা. মো. হাবিবুল্লাহ তালুকদার রাসকিন মানবজমিনকে বলেন, রেডিওথেরাপি দিয়েই যে সমস্ত রোগীর চিকিৎসা শুরু করতে হয়, তাদের জন্য থেরাপি দিতে হবে সঙ্গে সঙ্গেই। কোনোক্রমেই দেরি করা যাবে না। কিন্তু যে সমস্ত রোগীর সার্জারি ও কেমোথেরাপি দিয়ে রেডিওথেরাপি দেয়ার জন্য চিকিৎসকরা পরামর্শ দেন, তাদের সঙ্গে সঙ্গে না দিলেও বড় সমস্যা হয় না। কিন্তু দেরি করে থেরাপি দেয়ার ফলে রোগ নাও সারতে পারে। অথবা সেরে গেলে পুনরায় আবার ক্যান্সার সৃষ্টি হতে পারে।
সার্বিক বিষয়ে জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক মোস্তফা আজিজ সুমন মানবজমিনকে বলেন, হাসপাতালে সাড়ে ৬ হাজার রোগী পেন্ডিং আছে। প্রতিদিন রাত ১২টা পর্যন্ত আড়াইশ রোগীকে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। আর ৬ সপ্তাহ পর আড়াইশ’ শয্যা খালি হয়। তখন আমরা কিছু রোগী নিয়ে থাকি। তাই এরমধ্যে কেউ আসলেই আমরা ফেরত পাঠাচ্ছি। দেয়া সম্ভব হচ্ছে না। আমাদেরও কিছু করার নেই, কারণ আমাদের সক্ষমতা নেই।
