‘জঙ্গি নাটক’ সাজিয়ে ৭ জনকে হত্যা

শেখ হাসিনাসহ ১০ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের আবেদন

ফন্ট সাইজ:

গাজীপুরের পাতারটেকে ‘জঙ্গি নাটক’ সাজিয়ে সাতজনকে হত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ১০ আসামির বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে বিচার শুরুর আবেদন জানিয়েছে প্রসিকিউশন। রোববার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এর সদস্য বিচারক মো. মহিতুল হক এনাম চৌধুরীর একক বেঞ্চে এ বিষয়ে শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। রাষ্ট্রপক্ষের পক্ষে শুনানি করেন প্রসিকিউটর গাজী এম এইচ তামিম।

মামলার আসামিরা হলোÑ তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, তৎকালীন পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) এ কে এম শহীদুল হক, তৎকালীন এসবি প্রধান ড. মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারী, তৎকালীন ঢাকা মহানগর পুলিশের কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া, তৎকালীন সিটিটিসি প্রধান মনিরুল ইসলাম, বগুড়ার তৎকালীন পুলিশ সুপার আসাদুজ্জামান, গাজীপুরের তৎকালীন পুলিশ সুপার ও ডিবি প্রধান মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ, বগুড়ার তৎকালীন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আরিফুর রহমান মণ্ডল এবং তৎকালীন সিটিটিসি’র সহকারী পুলিশ কমিশনার (সোয়াট টিম লিডার) এস এম জাহাঙ্গীর হাছান। বর্তমানে এ মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে রয়েছেন এ কে এম শহীদুল হক ও আছাদুজ্জামান মিয়া। তাদের গতকাল ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়।

শুনানিতে প্রসিকিউটর তামিম বলেন, শেখ হাসিনার সরকারের আমলে দেশ জুড়ে একই ধরনের পদ্ধতিতে অপরাধ সংঘটিত হতো। ভিন্নমতাবলম্বী ব্যক্তি ও ইসলামী মতাদর্শের অনুসারীদের দমন করতে গুম, খুন এবং বিচারবহির্ভূত হত্যার সংস্কৃতি গড়ে তোলা হয়েছিল বলে তিনি অভিযোগ করেন। তিনি বলেন, সে সময় সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে কথা বললেই অনেককে বিভিন্ন বাহিনীর গোপন বন্দিশালায় গুম করে রাখা হতো। গুম হওয়া ব্যক্তিদের স্বজনদের অনেকেই সন্তানদের বাঁচানোর আশায় ‘ক্রসফায়ার না দেয়ার’ আকুতি জানাতেন। এরপরও অনেককে ‘বন্দুকযুদ্ধের’ নাটক সাজিয়ে হত্যা করে মরদেহ নদী-নালা কিংবা সড়কের পাশে ফেলে রাখা হতো। প্রসিকিউটর আরও বলেন, সে সময় সরকারের মন্ত্রী-এমপিরা দেশকে ‘জঙ্গিবাদে আক্রান্ত’ হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করতেন। অথচ বিচারবহির্ভূত এসব হত্যাকাণ্ডকে বিভিন্ন সময়ে জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো মানবাধিকার লঙ্ঘন হিসেবে উল্লেখ করেছে।

পাতারটেকের ঘটনার বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেন, দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে সাতজনকে তুলে নিয়ে বগুড়ায় পুলিশের একটি গোপন বন্দিশালায় আটকে রাখা হয়। পরে ২০১৬ সালের ৮ই অক্টোবর গাজীপুরের নোয়াগাঁওয়ের পাতারটেক এলাকায় সোলায়মান সরকারের বাড়িতে তাদের নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের নেতৃত্বে ‘অপারেশন শরতের তুফান’ নামে একটি অভিযানের নাটক সাজিয়ে সোয়াট সদস্যরা সাতজনকে গুলি করে হত্যা করে বলে অভিযোগ করেন তিনি। প্রসিকিউশনের দাবি, হত্যাকাণ্ডের পর নিহতদের পরিবারের সদস্যদেরও ভয়ভীতি দেখানো হয়। তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল নিহতদের পরিবারের বিরুদ্ধেও তদন্তের হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন বলে আদালতে উল্লেখ করা হয়। এ কারণে দীর্ঘদিন কেউ আইনি পদক্ষেপ নেয়ার সাহস পাননি। নিহত সাতজনের মধ্যে এখনো চারজনের পরিচয় শনাক্ত হয়নি। পরিচয় শনাক্ত হওয়া তিনজন হলেন মো. ইবরাহীম, ফরিদুল ইসলাম আকাশ ও সাইফুর রহমান। ২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর ইবরাহীমের বাবা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে এ ঘটনায় অভিযোগ দায়ের করেন। প্রসিকিউটর তামিম বলেন, ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় থাকাকালে বলপূর্বক গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যার ধারাবাহিক নীতির অংশ হিসেবেই এ হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে। তাই আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে বিচার কার্যক্রম শুরু করার আবেদন জানান তিনি।

অন্যদিকে, আসামিপক্ষের আইনজীবীরা অভিযোগ গঠন (ডিসচার্জ) বিষয়ে শুনানির জন্য সময়ের আবেদন করেন। আসামিপক্ষের আইনজীবী সিফাত মাহমুদ শুভ জানান, তারা সম্প্রতি প্রসিকিউশনের প্রয়োজনীয় নথিপত্র পেয়েছেন। সেগুলো পর্যালোচনার জন্য সময় প্রয়োজন। রাষ্ট্রপক্ষ এ আবেদনে আপত্তি না জানানোয় ট্রাইব্যুনাল আগামী ১০শে আগস্ট আসামিপক্ষের শুনানির দিন ধার্য করেন।

এদিকে, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ যুবলীগ-ছাত্রলীগের শীর্ষ ৭ নেতার বিরুদ্ধে সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয়েছে। যুক্তিতর্কের জন্য আগামী ৪ঠা আগস্ট দিন ধার্য করেছেন ট্রাইব্যুনাল। গতকাল ট্রাইব্যুনাল-২ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল এদিন ধার্য করেন।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন