আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ

একের পর এক হত্যা

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ

ফন্ট সাইজ:

রাজধানীতে ঘটছে একের পর এক হত্যাকাণ্ড। কখনো প্রকাশ্য দিবালোকে, কখনো শত শত মানুষের সামনে গুলি করে কেড়ে নেয়া হচ্ছে মানুষের তাজা প্রাণ। ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা হচ্ছে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ। এতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে তৈরি হয়েছে উদ্বেগ।

বাংলাদেশ পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য বলছে, গত তিন মাসে সারা দেশে ৯২৪টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মামলা হয়েছে। এর মধ্যে জুন মাসে মোট ৩২৬টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। ঢাকা মেট্রোপলিটন এলাকাতেই এক মাসে ২৩টি হত্যা মামলা হয়েছে। এ ছাড়া, মে মাসে মোট হত্যাকাণ্ড হয়েছে ৩১০টি। এর মধ্যে ঢাকা মেট্রোপলিটনে ১৬টি হত্যার ঘটনায় থানায় মামলা হয়েছে। আর এপ্রিল মাসে হত্যার ঘটনায় মোট মামলা হয়েছে ২৮৮টি। এর মধ্যে ডিএমপির বিভিন্ন থানায় মামলা হয়েছে ১৭টি।

সম্প্রতি রাজধানীর মিরপুর-১৩ নম্বরের ই ব্লকের ওপেক্স গার্মেন্টের সামনে কাফরুল থানা যুবদলের সদস্য সচিব হাফিজুল ইসলাম বাবুকে লক্ষ্য করে একের পর এক এলোপাতাড়ি গুলি ছোড়ে দুর্বৃত্তরা। ওই সময় বাবু বেঁচে গেলেও গুলিতে নিহত হন যুবদলকর্মী ইউসুফ আলী। এ ছাড়াও মনির ও নালাম সরদার নামে আরও দুইজন গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। চঞ্চল, জিয়ারুল হক মোল্লা, নাহিদ হাসান ওরফে মেহেদী হাসান, সাফিন ছৈয়াল ওরফে সাফিন আহম্মেদ ও আলী হোসেনসহ একাধিক আসামি গ্রেপ্তারের পর জানা যায়, যুবদল নেতা হাফিজুল ইসলাম বাবুকে হত্যার জন্য ঝিনাইদহ ও মাগুরা থেকে কিলার ভাড়া করে আনা হয়। ঢাকা মেট্রোপলিটন গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) মিরপুর জোনের উপ-কমিশনার (ডিসি) মো. রাকিব খান বলেন, কয়েক দিন আগে শুটারদের ভাড়া করে ঢাকায় আনা হয়। এরপর তাদের সঙ্গে নিয়ে হত্যাকাণ্ডের স্থান রেকি করে কাকে গুলি করতে হবে সেটি বুঝিয়ে দেয়া হয়। মূলত স্থানীয় ডিশ ও ইন্টারনেট ব্যবসা, সরকারি ও ব্যক্তিমালিকানাধীন জমি দখল, নির্মাণাধীন ভবনে চাঁদাবাজি, গার্মেন্টের ঝুট ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ নিয়েই এই গুলির ঘটনা ঘটেছে।

গত ২১শে জুলাই রাত সাড়ে ৮টার দিকে রাজধানীর সবুজবাগের রাজারবাগ বাজার পানির পাম্প সংলগ্ন এলাকায় ইব্রাহিম পলাশ (৩৬) নামে ওয়ার্ড বিএনপি’র এক কর্মীকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। ধারালো অস্ত্রের আঘাতে তার দুই হাতের কব্জি বিচ্ছিন্ন করে ফেলা হয়। নিহত পলাশ লক্ষ্মীপুরের রায়পুর উপজেলার সোনাপুর এলাকার আবুল বাশারের ছেলে। তিনি সবুজবাগের ৭১ নম্বর মাদারটেক এলাকায় থাকতেন। সেদিন পলাশকে ঢাকা মেডিকেলে নিয়ে যাওয়া পলাশের প্রতিবেশী মো. হীরা বলেন, পলাশ পেশায় প্রাইভেটকারের চালক ও স্থানীয় বিএনপি’র কর্মী ছিলেন। ওই দিন রাতে পলাশ চায়ের দোকানে বসে ছিলেন। পূর্ব শত্রুতার জেরে একই এলাকার রয়েল, সবুজ, নাঈমসহ ১০ থেকে ১২ জন মিলে ধারালো অস্ত্র দিয়ে তাকে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে হত্যা করে।

১৯শে জুলাই প্রকাশ্য দুপুর ৩টার দিকে বিএফডিসি’র পুরনো গেটের পাশে মো. সেলিম নামে এক ব্যবসায়ীকে ধারালো চাকু দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। তাকে ঢাকা মেডিকেলে নিয়ে যাওয়া পথচারী আব্দুর রহমান বলেন, আমি পৌনে ৩টার দিকে এয়ারপোর্ট যাওয়ার জন্য তেজগাঁও রেলগেট এলাকা দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় দেখি, এক ব্যক্তি রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে আছেন। পরে ওই ব্যক্তি আমাকে ডাক দিয়ে বলেন, ‘ভাই আমাকে বাঁচান, আমি মরে যাচ্ছি। আমাকে হাসপাতালে নিয়ে যান।’ পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। ওই ঘটনায় নিহত সেলিমের স্ত্রী রেখা বেগম তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানায় পাঁচজনের নাম উল্লেখ করে হত্যা মামলা করলে মুকুল সোহাগ ও মিজানুর রহমান নামে দু’জনকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব-২ এর সদস্যরা। র‌্যাব-২ এর কোম্পানি কমান্ডার লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সাঈদ মাহমুদ বলেন, মূলত ভাঙাড়ি ব্যবসার টাকা নিয়ে বিরোধের জেরে এ হত্যাকাণ্ড ঘটেছে।

গত ১৩ই জুলাই বাসা ভাড়ার মাত্র এক হাজার টাকা বকেয়া নিয়ে স্বপন (৬০) নামে এক বৃদ্ধকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে আজিমপুর মেডিকেল স্টাফ কোয়ার্টারে। ওই দিন ভোর ৪টার দিকে স্টাফ কোয়ার্টারের ৪ নম্বর ভবনের ৮১ নম্বর ফ্ল্যাটের সামনে ও সংলগ্ন মাঠে এই নির্মম ঘটনা ঘটে। নিহত স্বপন মাদারীপুরের শিবচর থানার তাহের ফকিরকান্দি গ্রামের বাসিন্দা। তিনি পেশায় একজন কসমেটিকস ব্যবসায়ী ছিলেন।

গত ১২ই জুলাই রাজধানীর যাত্রাবাড়ীতে শাহিদা বেগম নামে এক বৃদ্ধাকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করে তার বাসা থেকে দুই জোড়া কানের দুল, একটি গলার চেইনসহ স্বর্ণালঙ্কার ও নগদ টাকা লুটের ঘটনা ঘটে। পরে পুলিশ তার লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গে পাঠায়। যাত্রাবাড়ী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ রাজু বলেন, নিহত ওই নারীর বাড়ি কুমিল্লা জেলার ব্রাহ্মণপাড়া থানার সীতলাই গ্রামে। তিনি মৃত শফিকুল ইসলাম সরকারের স্ত্রী ছিলেন। বিষয়টি নিয়ে তদন্ত চলছে।

গত ১লা জুলাই রাত সাড়ে ৯টার দিকে আদাবর থানার নবোদয় কাঁচাবাজার এলাকায় সালিশ বৈঠক শেষে আবুল বাসার বাদশা (৩০) নামে এক বিএনপি নেতাকে কুপিয়ে হত্যা করে প্রতিপক্ষ। ওই ঘটনায় ইউনিট বিএনপি’র সভাপতি সাদ্দামও গুরুতর আহত হন। তিনি নবোদয় ইউনিট বিএনপি’র সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। এসব ঘটনা ছাড়াও একের পর এক হত্যাকাণ্ড ঘটেই চলেছে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায়।

এ বিষয়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ-ডিএমপি’র মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স বিভাগের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার নিয়াজ মেহেদী বলেন, প্রত্যেকটা ঘটনার পরই কিন্তু আমাদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা পদক্ষেপ নিচ্ছেন। দোষীদের আইনের আওতায় আনা হচ্ছে। রহস্য উদ্‌ঘাটন করা হচ্ছে। তাই প্রথমেই সাধারণ মানুষের উদ্দেশ্যে বলবো- উদ্বেগের বা আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ সব সময় আপনাদের পাশে আছে।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন