অনিয়ম-দুর্ভোগের নাম রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল

অনিয়ম-দুর্ভোগের নাম রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল

ফন্ট সাইজ:

অনিয়ম আর দুর্ভোগের আরেক নাম রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। রোগী সুস্থ হওয়া তো দূরের কথা হাসপাতালটি নিজেই অসুস্থ। সরজমিন দেখা গেছে, নোংরা-দুর্গন্ধ ও হাসপাতালে ছারপোকা-তেলাপোকাসহ বিভিন্ন পোকার উপদ্রবে রোগীরা দিশাহারা হয়ে পড়েছেন। ডাক্তার-নার্সরা এসব দেখেও চোখ বন্ধ করে না দেখার ভান করে চলে যাচ্ছেন। প্রশ্ন উঠেছে রোগীর সুস্থতা ও সেবা দেবে কে। হাসপাতালে একদিকে চিকিৎসক সংকট, অপরদিকে আধুনিক যন্ত্রপাতি বিকল। এ ছাড়াও সেবা নিতে আসা রোগীদের পদে পদে গুনতে হয় টাকা। টাকা আছে তো সেবা আছে, টাকা নেই সেবাও নেই এমন অভিযোগ হাসপাতালে আসা রোগী ও স্বজনদের। হাসপাতালে রোগীদের ভর্তি করাকে কেন্দ্র করে দালালদের টাকা দেয়া যেমন শুরু হয় তেমনিভাবে রোগী মারা গেলে লাশ বের করে নিয়ে যেতেও গুনতে হয় টাকা। তা না হলে রোগী ও স্বজনদের হেনস্তার মুখে পড়তে হয়। অবস্থা দেখে মনে হয় যেন এসব অনিয়ম দেখার কেউ নেই। বৃহত্তর রংপুর বিভাগ।

জনসংখ্যা পৌনে ২ কোটিরও বেশি। উন্নত চিকিৎসাসেবার জন্য রয়েছে ১ হাজার শয্যাবিশিষ্ট রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। তবে জনবল রয়েছে প্রয়োজনের তুলনায় প্রায় অর্ধেক। প্রতিদিন এ হাসপাতালে ২ হাজারেরও বেশি রোগী ভর্তি থেকে চিকিৎসা গ্রহণ করেন। ৫শ’ রোগীকে সেবা দিতে সক্ষম জনবল দিয়ে ২ হাজার রোগী সেবা প্রদানে যেমন হিমশিম খাচ্ছেন চিকিৎসক-নার্সরা, ঠিক তেমনি হাসপাতালটিতে রয়েছে নানা অনিয়ম, দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা ও দালালের উপদ্রব। এমনকি লাশ নামাতে লাগে টাকা।

রংপুর মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে পর্যাপ্ত আইসিইউ শয্যা না থাকার কারণে অনেক রোগীই মৃত্যুবরণ করছেন। অ্যানেস্থেসিয়ার অভাবে অপারেশনে সমস্যা হচ্ছে। এ কারণে রোগীর মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়ছে, আবার কোনো ক্ষেত্রে রোগী মারাও যাচ্ছে। হাসপাতালে রোগীর সঙ্গে একজন অ্যাটেনডেন্টের থাকার সুবিধা পর্যন্ত নেই। এ ছাড়াও টাকা না দিলে রোগীকে ওপরে উঠানো হয় না এবং টাকা ছাড়া লাশকে নিচে ও নামানো হয় না। ওষুধ সাপ্লাই থাকা রোগীদের বাইরে থেকে ওষুধ কিনতে বাধ্য করার অভিযোগও রয়েছে। হাসপাতালের ভেতরে ময়লা ফেলা, টয়লেটের ময়লা নিষ্কাশনের ব্যবস্থা নষ্ট হয়ে যাওয়া, রোগীর স্বজনদের বেখেয়ালিপনার কারণে রংপুর মেডিকেল হাসপাতাল এখন নিজেই রয়েছে আইসোলেশনে। এ ছাড়াও হাসপাতালের ভেতরে কুকুর বসে আছে এমন চিত্র দেখা মেলে প্রায়ই।

হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগী ও স্বজনদের আক্ষেপ- সরকার যায়, সরকার আসে। কিন্তু এ হাসপাতাল যেন আলোর মুখ দেখে না। হাসপাতাল থেকে বড় চাচির লাশ বাড়ি নিয়ে যাওয়ার সময় ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, ভাই কি বলবো, লাশ নামাতে স্টাফদের টাকা দেয়া লাগে। তাদের কি বিবেক নাই। কখন মানুষের কাছে বখশিশ চাইতে হয় আর কখন হয় না। লাশ নিয়ে যাচ্ছি আর আমাকে বলে বখশিশ দেন। হাসপাতালে মা’কে নিয়ে আসা গাইবান্ধার মামুন মিয়া বলেন, বেড নেই ফ্লোরে শুইয়ে মায়ের চিকিৎসা চলছে। মায়ের অবস্থা সংকটাপন্ন। ডাক্তার বলেছেন যেকোনো সময় আইসিইউ’তে নেয়া লাগতে পারে। এদিকে শুনছি আইসিইউ’তে বেড ফাঁকা নেই। কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী থেকে আসা রোগীর স্বজন শহিদুল ইসলাম বলেন, হাসপাতালের স্টোরে গিয়ে জানতে পারলাম আমার প্রয়োজনীয় ওষুধগুলোর প্রায় অর্ধেকই সাপ্লাই রয়েছে কিন্তু নার্সরা বলছেন শুধু ওমিপ্রাজল সাপ্লাই রয়েছে।

তাহলে বাকি ওষুধ গেল কই। গত বৃহস্পতিবার রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল পরিদর্শনে আসেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী এবং রংপুর মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি আসাদুল হাবীব দুলু। পরিদর্শন করে নানা অনিয়মের অভিযোগ পান এবং সেগুলো সমাধানে ব্যবস্থা নেয়া কথা জানান। তিনি বলেন, রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নতুন করে ১০টি আইসিইউ শয্যা যুক্ত করে ২০টি শয্যায় ইউনিটকে উন্নীত করা হবে। অ্যানেস্থেসিয়ার অভাবে অপারেশনে সমস্যা হচ্ছে। অপারেশন চালু করতে প্রয়োজনীয় ওষুধ সরবরাহ করা হবে। তিনি আরও বলেন, বর্তমানে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আউটসোর্সিং হিসেবে ১২৪ জন জনবল রয়েছে। এদের মাধ্যমে হাসপাতালে সঠিক সেবা দেয়া সম্ভব হচ্ছে না।

তাই রংপুর চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির পক্ষ থেকে ১০ জন, রংপুর-৩ আসনের এমপি’র পক্ষ থেকে ৫ জনসহ জেলার গণ্যমান্য ব্যক্তিদের আর্থিক সহযোগিতায় ৫০ জন আউটসোর্সিং জনবল নিয়োগ করা হবে। এতে করে হাসপাতালে দালাল চক্র, ট্রলির মাধ্যমে পয়সা নেয়া বন্ধ হবে। প্রতিটি কর্মচারীকে বাধ্যতামূলকভাবে নির্ধারিত পোশাক পরানো ও পরিচয়পত্র নিশ্চিত করা হবে। নিরাপত্তার ক্ষেত্রে রংপুর মেডিকেল কলেজ ক্যাম্পাসে অস্থায়ী পুলিশ ক্যাম্প চালু করা হয়েছে। বাকি কাজগুলো আগামী দুই মাসের মধ্যে বাস্তবায়ন করা হবে।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন