৪৪টি শিল্প প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রুগ্ণ আটটি। অচল ড্রেনেজে সামান্য বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতা, ভাঙা সীমানা প্রাচীরে বাড়ছে নিরাপত্তা ঝুঁকি। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কৌশলগত অবস্থান, প্রবাসী বিনিয়োগের সম্ভাবনা নিয়ে যাত্রা শুরু হয়েছিল ফেনী বিসিক শিল্প নগরীর। কিন্তু ছয় দশক পর সেই শিল্পনগরী এখন জলাবদ্ধতা, অকার্যকর ড্রেনেজ, নিরাপত্তাহীনতা, অবকাঠামোগত দুর্বলতা ও সেবার সংকটে জর্জরিত। নিয়মিত কর পরিশোধ করেও কাঙ্ক্ষিত সেবা না পাওয়ার অভিযোগ উদ্যোক্তাদের। এর মধ্যে ২০২৪ সালের ভয়াবহ বন্যার ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে সরকারি সহায়তার অপেক্ষায় রয়েছেন অনেক শিল্পমালিক। ফলে সম্ভাবনাময় এ শিল্প নগরীর ভবিষ্যৎ নিয়েই দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা।
বিসিক ফেনী কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ফেনী সদর উপজেলার চাড়িপুর মৌজায় ১৯৬২ সালে ২৫ দশমিক ৪ একর জমির উপর প্রতিষ্ঠিত হয় বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক) শিল্প নগরী। এখানে মোট ১৫২টি প্লট রয়েছে। এর মধ্যে ১০টি প্রশাসনিক কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে, আর বাকিগুলো শিল্প ইউনিট স্থাপনের জন্য বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। বর্তমানে শিল্প নগরীতে রপ্তানিমুখী ওষুধ, টাওয়েল, হ্যান্ডমেইড পেপার, জুট, রাবার, রড, বেকারিসহ প্রায় অর্ধশত শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। তবে নানা সমস্যার কারণে অনেক প্রতিষ্ঠান তাদের পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন চালাতে পারছে না।
অবকাঠামোগত সংকটে শিল্প নগরী: সরজমিন শিল্প নগরী ঘুরে দেখা যায়, সড়কের দুই পাশের ড্রেন ময়লা-আবর্জনায় ভরে গেছে। কোথাও কোথাও ড্রেনের অস্তিত্বই প্রায় বিলীন। শিল্প প্রতিষ্ঠানের বর্জ্য ও আবর্জনার স্তূপ পড়ে আছে রাস্তার ধারে। দীর্ঘদিন ধরে পানি সরবরাহের কেন্দ্রীয় ট্যাংক অচল হয়ে থাকায় উদ্যোক্তারা নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় পানি সংগ্রহ করছেন। শিল্প নগরীর একমাত্র পুকুরটিও এখন ময়লা-আবর্জনা ও ঝোপঝাড়ে ভরাট। ফলে অগ্নিকাণ্ডের মতো জরুরি পরিস্থিতিতে পানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে উদ্যোক্তাদের মধ্যে। এ ছাড়া, বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। সামান্য বৃষ্টিতেই শিল্পাঞ্চলের বিভিন্ন অংশ পানিতে তলিয়ে যায়। গোলাম রহমান নামে স্থানীয় বাসিন্দা জানান, ময়লা-আবর্জনার দুর্গন্ধে সড়কে চলাচল করা যায় না।
ড্রেনেজ ব্যবস্থা অকার্যকর হয়ে গেছে। মশা-মাছির উৎপাত বেড়েছে। এসব কারণে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোও দিন দিন অকার্যকর হয়ে পড়ছে। ফেনী বিসিক শিল্প নগরী ব্যবসায়ী সমিতির সহ-সভাপতি মাঈন উদ্দিন আহমেদ কামরান বলেন, বলা যায় বিসিক এলাকার কোনো মা-বাপ নেই। সড়কে স্ট্রিটলাইট নেই, ড্রেনেজ ব্যবস্থা অকার্যকর হয়ে গেছে, সামান্য বৃষ্টি হলে পুরো বিসিক এলাকা পানিতে প্লাবিত হয়। ১৯৬২ সালে বিসিক প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সময় চারপাশে বাউন্ডারি ওয়াল দেয়া হলেও অধিকাংশ ভেঙে গেছে। প্রবেশপথের গেটগুলো রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে নষ্ট হয়ে গেছে।
কর দিয়েও মিলছে না সেবা: শিল্প উদ্যোক্তাদের অভিযোগ, নিয়মিত কর ও বিভিন্ন ফি পরিশোধ করলেও তারা কাঙ্ক্ষিত সেবা পাচ্ছেন না। শিল্প নগরীর রক্ষণাবেক্ষণ, নিরাপত্তা, ড্রেনেজ ব্যবস্থা কিংবা আলো সংক্রান্ত সমস্যাগুলো বছরের পর বছর ধরে রয়ে গেছে। এ ছাড়া, ২০২৪ সালের আগস্টে জেলায় ভয়াবহ বন্যার কবলে পড়ে বিনিয়োগকারীদের যে আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়েছে তা পূরণ করতে সরকার কোনো উদ্যোগ নেয়নি।
আবদুল মোতালেব নামের এক কারখানার মালিক বলেন, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাশে হওয়ায় ফেনী বিসিকের ভৌগোলিক গুরুত্ব অনেক। কিন্তু বিসিকের বাউন্ডারি ওয়ালগুলো ভেঙে যাওয়ায় বহিরাগত ও চোর-ছ্যাঁচড়াদের উপদ্রব বেড়েছে। আরেক কারখানার পরিচালক আতাউর রহমান বলেন, ২০২৪ সালের বন্যায় অনেক কারখানার সব মেশিন পানিতে ডুবে নষ্ট হয়েছিল। প্রায় দুই বছর ধরে শুধু তালিকায় নাম উঠেছে, কিন্তু কোনো ক্ষতিপূরণ বা সহজ শর্তে ঋণ পাইনি। ফেনী বিসিক শিল্প নগরীর সভাপতি বেলাল উদ্দিন আহমেদ জানান, বিসিক সার্বিকভাবে সহযোগিতা করার কথা থাকলেও নানা ধরনের প্রতিবন্ধকতায় জর্জরিত প্রতিষ্ঠান মালিকরা।
বিসিক ফেনী কার্যালয়ের সহকারী মহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ হানিফ শিল্পনগরীর বিভিন্ন সমস্যার কথা স্বীকার করে বলেন, ৪৪টি শিল্প প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রুগ্ণ আটটির বিষয়ে আলোচনা চলছে। শিল্পপ্রতিষ্ঠান মালিকরা নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় ড্রেনগুলো পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখলে নানা সমস্যা থেকে তারা রক্ষা পাবে। ২০২৪ সালের ভয়াবহ বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানের তালিকা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। মন্ত্রণালয় থেকে বরাদ্দ পেলে সেগুলো শিল্প মালিকদের মাঝে বিতরণ করা হবে বলেও জানান বিসিক ফেনী কার্যালয়ের সহকারী মহাব্যবস্থাপক।
