প্রতি বছর ৯ আগস্ট বিশ্বব্যাপী পালিত হয় বিশ্ব আদিবাসী দিবস। জাতিসংঘের উদ্যোগে আয়োজিত এই দিবসটির মূল উদ্দেশ্য হলো বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ‘Indigenous Peoples’ বা আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মানবাধিকার, অনন্য সংস্কৃতি, ভাষা ও ঐতিহ্য সম্পর্কে বিশ্ববাসীকে সচেতন করা এবং তাদের মর্যাদা রক্ষা করা। কিন্তু এই দিবসটি এলে বাংলাদেশের রাজনৈতিক, সামাজিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক অঙ্গনে একটি দীর্ঘদিনের বিতর্ক পুনরায় চাঙ্গা হয়ে ওঠে। বিতর্কের মূলবিন্দু হলো: পার্বত্য চট্টগ্রাম ও সমতলে বসবাসকারী অনগ্রসর জাতিসত্তাগুলোকে কি ‘আদিবাসী’ বলা হবে, নাকি সংবিধানে উল্লেখিত ‘উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, নৃ-গোষ্ঠী ও সম্প্রদায়’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হবে?
আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ব্যবহৃত "Indigenous Peoples" পরিভাষা এবং বাংলাদেশের সংবিধান ও প্রচলিত আইনের ভাষাগত অবস্থানের এই পার্থক্য শুধুই শব্দচয়ন বা ভাষাগত কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা, ভূ-রাজনীতি, জাতীয় পরিচয় এবং ঐতিহাসিক বাস্তবতার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। আন্তর্জাতিক পরিভাষাকে অন্ধভাবে গ্রহণ করা এবং দেশীয় সাংবিধানিক বাস্তবতাকে অস্বীকার করার মধ্য দিয়েই মূলত জন্ম নেয় রাজনৈতিক বিতর্ক, আইনি প্রশ্ন এবং সামাজিক অসন্তোষ। একটি আধুনিক, স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রে বিভাজনের রাজনীতি বা শব্দসংকটে আটকে না থেকে আইনি ও কাঠামোগত সমাধানের পথ খোঁজা এখন সময়ের দাবি।
বাংলাদেশ একটি স্বাধীন, সার্বভৌম ও একক রাষ্ট্র। এই রাষ্ট্রের শাসনকাঠামো ও নাগরিক জীবনের সর্বোচ্চ ভিত্তি হলো গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান। যেকোনো সুসংগঠিত রাষ্ট্রে নাগরিক, গণমাধ্যম, রাজনৈতিক দল কিংবা সুশীল সমাজ—সকলেরই উচিত সংবিধানের ভাষা ও আইনের সীমারেখাকে সম্মান জানানো। গণতন্ত্রের অন্যতম মৌলিক উপাদান হলো মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, তবে সেই স্বাধীনতা যেন রাষ্ট্রের অখণ্ডতা বা সাংবিধানিক কাঠামোর সঙ্গে সংঘাতপূর্ণ বা বিভ্রান্তিকর পরিস্থিতির জন্ম না দেয়, সে বিষয়ে সতর্ক থাকা জরুরি।
বাংলাদেশের সংবিধানে "আদিবাসী" শব্দটির কোনো সাংবিধানিক স্বীকৃতি বা উল্লেখ নেই। ২০১১ সালের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানের ২৩ক (Article 23A) অনুচ্ছেদে স্পষ্ট সংস্থান করা হয়েছে:
"রাষ্ট্র উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, নৃ-গোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের অনন্য স্থানীয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ, উন্নয়ন ও বিকাশের ব্যবস্থা গ্রহণ করিবেন।"
সংবিধানের এই ধারা পর্যালোচনায় দেখা যায়, রাষ্ট্রে বিদ্যমান বৈচিত্র্যময় জনগোষ্ঠীকে ‘উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, নৃ-গোষ্ঠী ও সম্প্রদায়’ হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়েছে। এখানে "আদিবাসী" শব্দটি সচেতনভাবেই এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। এর পেছনে রয়েছে ঐতিহাসিক ও নৃ-তাত্ত্বিক কারণ। নৃ-বিজ্ঞান ও ইতিহাসের তথ্য অনুযায়ী, পার্বত্য চট্টগ্রাম বা বাংলাদেশের অন্যান্য অঞ্চলে বসবাসকারী উপজাতীয় জনগোষ্ঠীগুলো এই ভূখণ্ডের আদি বাসিন্দা বা ‘আদিবাসী’ নয়; বরং তারা বিভিন্ন সময় পার্শ্ববর্তী দেশ (যেমন মায়ানমার, তিব্বত, আসাম) থেকে অভিবাসিত হয়ে এ দেশে বসতি স্থাপন করেছে। অন্যদিকে, এই অঞ্চলের বাঙালি জনগোষ্ঠী হাজার বছর ধরে এই পলি মাটিতে বসবাস করে আসছে।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কোনো পরিভাষা প্রচলিত থাকলেই তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে কোনো সার্বভৌম রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ সাংবিধানিক পরিচয় নির্ধারণ করতে পারে না। প্রতিটি রাষ্ট্র তার নিজস্ব ইতিহাস, ভৌগোলিক সীমানা, জাতীয় নিরাপত্তা ও সংবিধান অনুযায়ী নাগরিকদের পরিচয় নির্ধারণের একক অধিকার রাখে। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। ফলে সরকারি নথি, আইনীয় প্রক্রিয়া ও জনপরিসরে সংবিধানসম্মত পরিভাষা ব্যবহার করাই আইনি ও নৈতিক দিক থেকে সঠিক।
বাংলাদেশের সংবিধানের মৌলিক দর্শনের প্রধান স্তম্ভ হলো নাগরিকের সমঅধিকার ও আইনের শাসন। সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদে স্পষ্ট বলা হয়েছে: "সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী।"
একইভাবে ২৮ অনুচ্ছেদে ধর্ম, বর্ণ, জাত, লিঙ্গ বা জন্মস্থানের ভিত্তিতে যেকোনো ধরনের বৈষম্যকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এছাড়া ৩১ অনুচ্ছেদ আইনের আশ্রয় লাভের অধিকার এবং ৪২ অনুচ্ছেদ সকল নাগরিকের সম্পত্তি অর্জন, ধারণ ও হস্তান্তরের অধিকার নিশ্চিত করেছে। এই বিধানগুলো দেশের প্রতিটি নাগরিক—তিনি পাহাড়ের হন কিংবা সমতলের—সবার জন্যই সমভাবে প্রযোজ্য।
তবে পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষেত্রে ভূমি ব্যবস্থাপনার রূপটি দেশের অন্যান্য সমতল এলাকার চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা। সেখানে ঐতিহাসিক, কৌশলগত ও প্রশাসনিক কারণে বিশেষ আইন প্রচলিত রয়েছে। যেমন—‘পার্বত্য চট্টগ্রাম রেশন, ১৯০০’ এবং ১৯৯৭ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তির আলোকেও গঠিত বিভিন্ন বিধিমালার মাধ্যমে ভূমি স্থানান্তর ও কেনাবেচা নিয়ন্ত্রিত হয়।
পার্বত্য অঞ্চলে ভূমি ক্রয় বা হস্তান্তরের ক্ষেত্রে বিশেষ আইনি শর্ত ও আঞ্চলিক পরিষদের অনুমতি বা বিধিনিষেধ বিদ্যমান। এই ব্যবস্থার কারণে দীর্ঘদিন ধরে পাহাড়ি ও বাঙালি জনগোষ্ঠীর মধ্যে এক ধরনের মতভেদের সৃষ্টি হয়েছে:
পার্বত্য অঞ্চলের স্থানীয় উপজাতীয় জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্যগত ভূমি ও তাদের নিজস্ব অস্তিত্ব রক্ষার জন্য এই বিশেষ আইনি সুরক্ষা অত্যন্ত জরুরি।
অন্যদিকে একই দেশের ভূখণ্ডে একদল নাগরিক ভূমি কিনতে পারবে না বা তাদের সাংবিধানিক মৌলিক অধিকার সীমিত থাকবে—তা সংবিধানে ঘোষিত সমঅধিকার ও ভূমির অধিকারের (অনুচ্ছেদ ৪২) পরিপন্থী।
এই জটিল সামাজিক ও আইনি বিরোধের সমাধান কোনো সহিংসতা বা পারস্পরিক কাদা ছোঁড়াছুঁড়িতে নেই; বরং সংবিধান, সময়োপযোগী আইন ও নিরপেক্ষ বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এ সমস্যার দীর্ঘমেয়াদী নিষ্পত্তি হওয়া প্রয়োজন।
বাংলাদেশের সংবিধানের অন্যতম মূল ভিত্তি হলো একক ও অভিন্ন জাতীয় পরিচয়। সংবিধানের ৬(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী: "বাংলাদেশের জনগণ জাতি হিসাবে বাঙালি এবং নাগরিক হিসাবে বাংলাদেশি বলিয়া পরিচিত হইবেন।"
অর্থাৎ, রাষ্ট্রীয় ও সাংবিধানিক কাঠামোতে নাগরিক পরিচয় এক ও অভিন্ন—আমরা সকলেই বাংলাদেশি।
জাতীয় পরিচয়ের এই একক কাঠামোর সঙ্গে ক্ষুদ্র জাতিসত্তা বা উপজাতীয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সুরক্ষাকে সংঘাতপূর্ণ হিসেবে দেখার কোনো অবকাশ নেই।
একটি প্রগতিশীল ও আধুনিক রাষ্ট্রে জাতীয় সংহতি এবং সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য পাশাপাশি অবস্থান করতে পারে। ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীগুলোর ভাষা, পোশাক, উৎসব ও জীবনধারা বাংলাদেশের জাতীয় সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করেছে। সাংবিধানিক স্বীকৃতির মাধ্যমে এই বৈচিত্র্যকে লালন করার পথ উন্মুক্ত রাখা হয়েছে, তবে তা কখনোই রাষ্ট্রীয় অখণ্ডতা বা অভিন্ন নাগরিক সত্তাকে ক্ষুণ্ন করে নয়।
বিশ্ব আদিবাসী দিবসকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের গণমাধ্যম ও সুশীল সমাজের ভূমিকা অত্যন্ত স্পর্শকাতর। গণমাধ্যমের দায়িত্ব কেবল সংবাদ পরিবেশন করা নয়; বরং সমাজের গঠনমূলক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা। সাংবিধানিক পরিভাষা ব্যবহার না করে উস্কানিমূলক বা অস্পষ্ট আন্তর্জাতিক শব্দচয়ন ব্যবহারের ফলে সামাজিক বিভাজন সৃষ্টি হতে পারে। বস্তুনিষ্ঠ, ভারসাম্যপূর্ণ ও তথ্যভিত্তিক সাংবাদিকতা এ ক্ষেত্রে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে।
একই সাথে, রাষ্ট্রেরও দায়িত্ব রয়েছে পার্বত্য অঞ্চল ও সমতলের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীগুলোর সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করার। সংবিধানের ২৩ক অনুচ্ছেদের উদ্দেশ্য কেবল ভাষার সংজ্ঞায় সীমাবদ্ধ নয়; এর মূল চেতনা হলো:পার্বত্য চট্টগ্রাম ও দুর্গম এলাকায় বিশ্বমানের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়া। যোগাযোগ ব্যবস্থার মানোন্নয়ন ঘটিয়ে মূল অর্থনীতির সঙ্গে তাদের যুক্ত করা। প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক সুযোগ সৃষ্টি করে অনগ্রসর জনগোষ্ঠীকে এগিয়ে নেওয়া। ক্ষুদ্র জাতিসত্তাগুলোর ভাষা ও নিজস্ব ঐতিহ্য রক্ষায় গবেষণা ও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা বৃদ্ধি করা।
পাহাড়ে শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং বিভাজনের রাজনীতি বন্ধ করতে হলে পাহাড়ে বসবাসকারী উপজাতি ও বাঙালি—উভয় পক্ষকেই রাষ্ট্রের সমান নাগরিক হিসেবে অধিকার ভোগ করার পরিবেশ তৈরি করে দিতে হবে।
বিশ্বের বহু দেশ তাদের নিজস্ব ইতিহাস, জনসংখ্যা এবং জাতীয় নিরাপত্তার দিক বিবেচনা করে ‘Indigenous Peoples’ বা আদিবাসী সংক্রান্ত জাতিসংঘের ঘোষণাপত্র বা পরিভাষাকে নিজস্ব সংবিধানে রূপান্তর করেছে অথবা বিশেষ শর্ত যুক্ত করেছে। ভারত, চীন কিংবা এশিয়ার বহু রাষ্ট্র তাদের অভ্যন্তরীণ জনগোষ্ঠীর পরিচয় নির্ধারণে নিজস্ব আইনকেই প্রাধান্য দিয়ে থাকে।
বাংলাদেশেও যেকোনো বিতর্ক বা আলোচনার মূল কেন্দ্রবিন্দু হওয়া উচিত দেশের সর্বোচ্চ আইন—সংবিধান। রাজনৈতিক আবেগ, আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর স্লোগান কিংবা ঐতিহাসিক সত্যকে বিকৃত করে কোনো সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। বিভাজনের রাজনীতি পাহাড় কিংবা সমতল—কারো জন্যই কল্যাণ বয়ে আনে না।
পরিশেষে বলতে চাই, বিশ্ব আদিবাসী দিবস ঘিরে বাংলাদেশে কোনো রাজনৈতিক কাদা ছোঁড়াছুঁড়ি, ঐতিহাসিক বিকৃতি বা বিভাজনের উপলক্ষ হওয়া উচিত নয়। বরং এটি হওয়া উচিত সংবিধানের প্রতি আস্থা, আইনের শাসন, পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং জাতীয় ঐক্যের গুরুত্ব নতুন করে উপলব্ধি করার একটি অনুঘটক।
পাহাড়ি-বাঙালি বিরোধের সুদীর্ঘ অধ্যায়ের অবসান ঘটিয়ে আমাদের একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও প্রগতিশীল সমাজ গড়ে তুলতে হবে। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হবে সংবিধানের স্পষ্ট ভাষার ওপর; আবেগে নয়—আইনের শাসনের সুদৃঢ় ভিত্তির ওপর; এবং কোনো বিভাজনে নয়- জাতীয় ঐক্যের অটুট বন্ধনে।
আমরা পাহাড়ের বাসিন্দা হই কিংবা সমতলের, আমাদের সর্বপ্রধান পরিচয়—আমরা স্বাধীন বাংলাদেশের নাগরিক, আমরা সবাই বাংলাদেশি।
সুতরাং এই চেতনাকে ধারণ করেই সকল জনগোষ্ঠীর মানবাধিকার, মর্যাদা এবং জাতীয় সংহতি সুনিশ্চিত করা সম্ভব। আর তাহলেই বিশ্ব দরবারে আমাদের মর্যাদা আরো সমৃদ্ধ ও সুপপ্রতিষ্ঠিত হবে।
লেখক:সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক
ই-মেইল: [email protected]
