প্রধানমন্ত্রীকে যে বার্তা দিলেন সার্জিও গর

প্রধানমন্ত্রীকে যে বার্তা দিলেন সার্জিও গর

ফন্ট সাইজ:

নির্বাচিত সরকারের নেতৃত্বে দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরেছে বলে আস্থা প্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এর পাশাপাশি বিভিন্ন খাতে সরাসরি বিনিয়োগের বার্তাও দিয়েছে দেশটি। বিশেষ করে তথ্যপ্রযুক্তি ও ফার্মাসিউটিক্যাল খাতকে সামনে রেখে ঢাকার সঙ্গে নতুন অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব গড়ে তোলার আগ্রহ প্রকাশ করেছে ওয়াশিংটন। এরই ধারাবাহিকতায় আগামী সপ্তাহের শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ২৫টি শীর্ষ শিল্প ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের ৪৫ জনের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল ঢাকা সফরে আসছে। দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে এবার নিরাপত্তা বা রাজনৈতিক ইস্যুর পাশাপাশি বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও প্রযুক্তি সহযোগিতার মতো বিষয়গুলো বেশি গুরুত্ব পেয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

গতকাল সকালে তেজগাঁওয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক বিশেষ দূত সার্জিও গরের বৈঠকে ঢাকা-ওয়াশিংটনের অর্থনৈতিক সম্পর্ককে নতুন দিগন্তে নেয়ার রূপরেখা উঠে আসে। বৈঠকের পর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, সার্জিও গরের বক্তব্য এবং তার এক্স পোস্ট থেকে পাওয়া তথ্য বিশ্লেষণে স্পষ্ট হয়েছে, ওয়াশিংটনের বর্তমান অগ্রাধিকার হচ্ছে বাংলাদেশে মার্কিন বিনিয়োগের পরিবেশকে আরও সক্রিয় করা।

বৈঠকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান, প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ ও মাহদি আমিন, ওয়াশিংটনে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত তারেক মো. আরিফুল ইসলাম, বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি. ক্রিস্টেনসেনসহ দুই দেশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

এ বৈঠকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হিসেবে দেখা হচ্ছে প্রযুক্তি খাতে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহকে। প্রধানমন্ত্রী বৈঠকে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে আরও বেশি মার্কিন বিনিয়োগের আহ্বান জানালে সার্জিও গর বাংলাদেশের সম্ভাবনার কথা তুলে ধরে বলেন, ভবিষ্যতে ঢাকার প্যাক্স সিলিকা উদ্যোগের অংশীদার হওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে। প্যাক্স সিলিকা হলো ২০২৫ সালের শেষ দিকে নেয়া যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ একটি উদ্যোগ। যার লক্ষ্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), সেমিকন্ডাক্টর এবং গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সরবরাহ চেইন সুরক্ষিত করা।

প্রযুক্তির পাশাপাশি ফার্মাসিউটিক্যাল শিল্পকেও সম্ভাবনাময় খাত হিসেবে চিহ্নিত করেছে ওয়াশিংটন। সার্জিও গর বলেন, এই দুই খাতেই দুই দেশ যৌথভাবে কাজ করার বাস্তব সুযোগ রয়েছে। আগামী সপ্তাহে মার্কিন ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদলের ঢাকা সফরকে সেই প্রক্রিয়ার প্রথম বাস্তব পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন তিনি।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন জানান, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, নীতিনির্ধারক সংস্থা এবং ব্যবসায়ী মহলের সঙ্গে ধারাবাহিক বৈঠক করবে মার্কিন প্রতিনিধিদল। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গেও তাদের বৈঠকের পরিকল্পনা রয়েছে। সেখানে বিনিয়োগের সম্ভাব্য খাত, নীতিগত সহায়তা, বাণিজ্য সমপ্রসারণ এবং নতুন শিল্প স্থাপনের সুযোগ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে।

গতকালের বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী কৃষিপণ্যের সংরক্ষণ অবকাঠামোতেও মার্কিন বিনিয়োগের আহ্বান জানান। সয়াবিন, তুলা ও গমসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্যের ওয়্যারহাউজ (রক্ষণাগার) নির্মাণে যুক্তরাষ্ট্রের অংশগ্রহণে আগ্রহ প্রকাশ করে তিনি বলেন, এতে বাংলাদেশের সরবরাহ ব্যবস্থার সক্ষমতা বাড়বে এবং আরও প্রতিযোগিতামূলক সাপ্লাই চেইন গড়ে উঠবে।
বাংলাদেশকে বিনিয়োগের জন্য প্রস্তুত দেশ হিসেবে তুলে ধরতেও সক্রিয় অবস্থান নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। সার্জিও গর জানান, বাংলাদেশ সম্পর্কিত যুক্তরাষ্ট্রের ভ্রমণ সতর্কতা শিথিল করার সিদ্ধান্ত শুধু পর্যটকদের জন্য নয়, বিনিয়োগকারীদের কাছেও ইতিবাচক বার্তা পৌঁছে দেবে। প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে দেশে স্থিতিশীলতা ফিরেছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

দক্ষিণ এশিয়াতে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ রক্ষায় নিয়োজিত বিশেষ দূতের ঢাকা সফরের পর দুই দেশের সম্পর্ক ইতিবাচক ধারায় পরিবর্তিত হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। নির্বাচন, মানবাধিকার বা নিরাপত্তা ইস্যুর পাশাপাশি অর্থনৈতিক সম্পর্ককে গুরুত্ব দিচ্ছে ঢাকা-ওয়াশিংটন। বিশেষ করে বাণিজ্য, প্রযুক্তি, বিনিয়োগ এবং কর্মসংস্থান- এই চারটি বিষয়কে কেন্দ্র করেই নতুন সহযোগিতার ভিত্তি তৈরি করার চেষ্টা করছে উভয় পক্ষ।

বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (এফডিএ) সহযোগিতায় বাংলাদেশে পরীক্ষামূলক কার্যক্রম পুনরায় চালুর বিষয়েও একসঙ্গে কাজ করার বিষয়ে নীতিগত ঐকমত্য হয়। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এটি বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের ওষুধ শিল্প আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের ক্ষেত্রে নতুন সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।
অন্যদিকে রোহিঙ্গা সংকটও আলোচনায় স্থান পায়। কক্সবাজারের শিবির পরিদর্শনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে সার্জিও গর বাংলাদেশের মানবিক ভূমিকার প্রশংসা করেন। প্রধানমন্ত্রীও রোহিঙ্গাদের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের অব্যাহত সহায়তার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। উভয় পক্ষ সংকটের একটি টেকসই রাজনৈতিক সমাধানের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব আরোপ করে।

বৈঠকের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেয়া এক বার্তায় সার্জিও গর জানান, প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সহযোগিতা সমপ্রসারণ এবং দ্বিপক্ষীয় অংশীদারিত্ব আরও শক্তিশালী করার বড় সুযোগ নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তিনি এটিকে যুক্তরাষ্ট্রের অগ্রাধিকার হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, দুই দেশ একসঙ্গে কাজ করলে বাস্তব ও ইতিবাচক ফল অর্জন সম্ভব।

এর আগে তিনদিনের সফরে গত বৃহস্পতিবার দুপুরে ঢাকায় পৌঁছান সার্জিও গর। সফরের অংশ হিসেবে বৃহস্পতিবারই তিনি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। দ্বিতীয় দিন সকালে ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর সঙ্গে বৈঠক করেন মার্কিন দূত। এরপর বিকালে কক্সবাজারে রোহিঙ্গা শিবির পরিদর্শনে যান। সার্জিও গর গতকাল প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক শেষে দুপুর আনুমানিক ৩টায় ঢাকা ছাড়েন।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন