জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার সম্ভাবনা থাকলেও নানা কাঠামোগত দুর্বলতা, সুশাসনের ঘাটতি এবং প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার কারণে দেশের বীমা খাত এখনো প্রত্যাশিত অবস্থানে পৌঁছাতে পারেনি। দাবি নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রতা, গ্রাহকের আস্থার সংকট, সীমিত ডিজিটাল অবকাঠামো, দুর্বল ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং আন্তর্জাতিক মানের পণ্য ও সেবার অভাবের কারণে দেশের মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) বীমা খাতের অবদান এখনো খুবই সীমিত। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অর্থনীতির আকার যত বাড়ছে, শিল্পায়ন, অবকাঠামো উন্নয়ন, স্বাস্থ্যসেবা ও জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলায় বীমার প্রয়োজনীয়তাও তত বাড়ছে। কিন্তু সেই তুলনায় দেশের বীমা খাত আধুনিকায়নের গতি এখনো ধীর।
বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) চেয়ারম্যান মীর নাদিয়া নিভিন বলেছেন, দেশের বীমা খাতকে আরও শক্তিশালী, স্বচ্ছ ও টেকসই করতে প্রচলিত পরিপালন-ভিত্তিক তদারকি ব্যবস্থা থেকে ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি ব্যবস্থায় উত্তরণ এখন অত্যন্ত প্রয়োজন। তিনি বলেন, বীমা খাতের সার্বিক উন্নয়নে দাবি নিষ্পত্তির সক্ষমতা বৃদ্ধি, নীতিগত সুশাসন প্রতিষ্ঠা, আর্থিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা এবং কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ও তদারকি ব্যবস্থা গড়ে তোলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এসব কৌশলগত লক্ষ্য অর্জনে আইডিআরএ আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন আধুনিক নিয়ন্ত্রক কাঠামো গড়ে তুলতে নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করে যাবে।
সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইকোনমিক রিসার্চ (সিএসইআর)-এর চেয়ারপারসন এবং ল্যাবএইড হাসপাতাল গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাকিফ শামীম বলেন, বাংলাদেশের মতো দ্রুত বিকাশমান অর্থনীতিতে বীমা খাতকে শুধু একটি আর্থিক সেবা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; এটিকে জাতীয় ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার অন্যতম প্রধান ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। আন্তর্জাতিকভাবে বীমা খাতের সফলতা অনেকাংশেই নির্ভর করে দ্রুত ও স্বচ্ছ ক্লেইম নিষ্পত্তির ওপর। বাংলাদেশেও যদি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে গ্রাহকের দাবি পরিশোধ নিশ্চিত করা যায়, তাহলে খাতটির প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে।
বীমা খাতে প্রযুক্তিনির্ভর গ্রাহকসেবা ও উদ্ভাবনী পণ্য চালুর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন গ্রিন ডেল্টা ইন্স্যুরেন্স পিএলসি’র ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ফারজানা চৌধুরী। তিনি বলেন, ভবিষ্যতের বীমা বাজার পুরোপুরি নির্ভর করবে স্বয়ংক্রিয় গ্রাহকসেবা এবং পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল সমাধানের ওপর। তাই প্রচলিত পদ্ধতি থেকে বেরিয়ে এসে ডিজিটালাইজড আন্ডাররাইটিং, অটোমেটেড ক্লেইম প্রসেসিং এবং তথ্যভিত্তিক ঝুঁকি মূল্যায়ন নিশ্চিত করতে হবে। আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন বীমা পণ্য, সাইবার ইন্স্যুরেন্স, সাপ্লাই চেইন প্রোটেকশন এবং নতুন ঝুঁকিভিত্তিক বীমা সেবা চালুর মাধ্যমে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগ পরিবেশকে আরও স্থিতিশীল করা সম্ভব। একইসঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ডেটা অ্যানালিটিক্স এবং ডিজিটাল যাচাই ব্যবস্থা ব্যবহার করে প্রতারণা কমানো এবং সেবার মানোন্নয়ন করা যাবে।
