বাংলাদেশের ইতিহাসে কিছু কিছু দিন কেবল ক্যালেন্ডারের একটি তারিখ নয়; সেগুলো জাতির রাজনৈতিক অভিযাত্রার গতিপথ পরিবর্তনের মাইলফলকে পরিণত হয়। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট তেমনই একটি দিন। দীর্ঘ দেড় দশকের বহুমাত্রিক রাজনৈতিক সংকট, প্রাতিষ্ঠানিক অচলাবস্থা, ক্রমবর্ধমান জন-অসন্তোষ, গণতান্ত্রিক অধিকার নিয়ে অব্যাহত বিতর্ক এবং রাষ্ট্র পরিচালনা সম্পর্কে গভীর প্রশ্নের এক যুগান্তকারী পরিণতি ঘটে এই দিনে। ছাত্র-জনতার ব্যাপক আন্দোলনের মুখে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতা ত্যাগ করে কাপুরুষের মতো দেশ ছেড়ে পার্শ্ববর্তী ভারতে চলে যান। তার দেশত্যাগের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়। যা দেশের ক্ষমতার কাঠামো, রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং গণতান্ত্রিক অভিযাত্রায় একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে বিবেচিত হয়।
তবে ইতিহাসের এই ঘটনাকে যদি কেবল জুলাই-আগস্টের কয়েক সপ্তাহের ঘটনাপ্রবাহ হিসেবে দেখা হয়, তাহলে পুরো বাস্তবতা ধরা পড়ে না। কোনো গণঅভ্যুত্থানই হঠাৎ করে সৃষ্টি হয় না; এর পেছনে থাকে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা, মানুষের জমে থাকা ক্ষোভ, নাগরিক সমাজের প্রতিবাদ এবং বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির ধারাবাহিক আন্দোলন। জুলাই গণঅভ্যুত্থানও তার ব্যতিক্রম নয়।
দীর্ঘ সময় ধরে রাষ্ট্র পরিচালনার বিভিন্ন বিষয় নিয়ে দেশে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। নির্বাচনব্যবস্থার গ্রহণযোগ্যতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, মানবাধিকার, বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতা, প্রশাসনের নিরপেক্ষতা এবং আইনের শাসন নিয়ে বিভিন্ন মহল থেকে প্রশ্ন ওঠে। বিরোধী রাজনৈতিক দল, মানবাধিকারকর্মী, সাংবাদিক, শিক্ষক, পেশাজীবী এবং নাগরিক সমাজের বিভিন্ন অংশ এসব ইস্যুতে ধারাবাহিকভাবে উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছিল। অন্যদিকে অর্থনৈতিক চাপ, মূল্যস্ফীতি, সীমাহীন দুর্নীতির অভিযোগ এবং সামাজিক বৈষম্যও সাধারণ মানুষের মধ্যে অসন্তোষকে আরও গভীর করে তোলে।
শেখ হাসিনার শাসনামলে আন্দোলন-সংগ্রাম পরিচালনা করতে গিয়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপিকে ব্যাপক দমন-পীড়নের মুখোমুখি হতে হয়। এ সময় বিএনপি নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে দেড় লক্ষাধিক রাজনৈতিক মামলা দায়ের করা হয়, যাতে প্রায় ৬০ লাখ নেতাকর্মীকে আসামি করা হয়। একই সময়ে ১,৫৫১ জনকে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হতে হয়। এ ছাড়া লাখ লাখ নেতাকর্মী আহত ও বিভিন্ন সময়ে গ্রেপ্তার হন এবং রাজনৈতিক কর্মসূচি পালনেও নানামুখী বাধা ও দমনপীড়নের সম্মুখীন হন। তবুও বিএনপির ধারাবাহিক আন্দোলন-সংগ্রাম দেশে বিরোধী রাজনীতির সক্রিয় উপস্থিতি বজায় রাখতে এবং গণতন্ত্র, ভোটাধিকার ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের দাবিকে জনপরিসরে জোরালোভাবে তুলে ধরতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষকের মতে, বিএনপির এই দীর্ঘ আন্দোলন সরকারবিরোধী রাজনৈতিক পরিবেশকে সক্রিয় রাখতে সহায়ক হয়, যা পরবর্তী সময়ে ছাত্রসমাজের আন্দোলন গড়ে ওঠার জন্য একটি অনুকূল রাজনৈতিক পরিমণ্ডল সৃষ্টি করে। বিশ্লেষকদের একটি অংশের মতে, সে সময় ছাত্রদের আন্দোলনের প্রতি সরকারের প্রাথমিক সংযমের পেছনে বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির সম্ভাব্য সম্পৃক্ততা এবং বৃহত্তর সরকারবিরোধী আন্দোলনে পরিস্থিতি রূপ নেওয়ার আশঙ্কাও একটি বিবেচ্য কারণ হিসেবে কাজ করে। ফলে ছাত্রদের আন্দোলন এবং বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির দীর্ঘদিনের গণতান্ত্রিক আন্দোলন—উভয় ধারাই শেষ পর্যন্ত দেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রক্রিয়ায় পরস্পর-সম্পূরক ভূমিকা পালন করে।
২০২৪ সালের জুলাই মাসে সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন শুরু হলে সেটি প্রথমদিকে ছিল একটি নির্দিষ্ট দাবিকেন্দ্রিক ছাত্র আন্দোলন। দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীরা শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পালন করেন। কিন্তু আন্দোলনকারীদের সঙ্গে সংঘর্ষ, প্রাণহানি এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির পর আন্দোলনের চরিত্র দ্রুত বদলে যেতে থাকে। শিক্ষার্থীদের দাবি ক্রমে গণতন্ত্র, জবাবদিহি, মানবাধিকার এবং ন্যায়বিচারের বৃহত্তর প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ে।
এই পর্যায়ে দেশের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ আন্দোলনের প্রতি সংহতি প্রকাশ করতে শুরু করেন। শিক্ষক, অভিভাবক, রাজনৈতিক অঙ্গনের প্রতিনিধিগণ, আইনজীবী, চিকিৎসক, সাংবাদিক, সংস্কৃতিকর্মী, শ্রমিক, কৃষক, ব্যবসায়ী—সমাজের বিস্তৃত অংশ আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে থাকে। ফলে এটি আর শুধু একটি ছাত্র আন্দোলন হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং একটি জাতীয় গণআন্দোলনের রূপ লাভ করে।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের এই সময়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের রাজনৈতিক ভূমিকা বিশেষভাবে আলোচনায় আসে। দীর্ঘদিন দেশের বাইরে অবস্থান করলেও তিনি দলের সাংগঠনিক কার্যক্রমকে সক্রিয় রাখা, নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ বজায় রাখা এবং গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার দাবিকে জাতীয় রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে রাখতে ধারাবাহিকভাবে কাজ করেন। একই সঙ্গে জুলাই আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে মতবিনিময় ও যোগাযোগের মাধ্যমে পরিবর্তনকামী শক্তিগুলোর মধ্যে সংলাপ ও সমন্বয়ের পরিবেশ গড়ে তোলার প্রচেষ্টাও অব্যাহত রাখেন। প্রতিকূল রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যেও দলের সাংগঠনিক কাঠামোকে কার্যকর রাখা, কর্মীদের মনোবল অটুট রাখা এবং আন্দোলনের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে তাঁর নেতৃত্ব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
একই সঙ্গে তাঁর একটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানও বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে তিনি নিজেকে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের 'মাস্টারমাইন্ড' হিসেবে আখ্যায়িত করার ধারণা প্রত্যাখ্যান করেন। বরং তিনি আন্দোলনের কৃতিত্ব জনগণ এবং গণতন্ত্রকামী ছাত্র-জনতার প্রতি অর্পণ করেন। তাঁর এই অবস্থান সমর্থকদের কাছে রাজনৈতিক বিনয় ও গণতান্ত্রিক চেতনার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।
তবে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাসে সবচেয়ে উজ্জ্বল অধ্যায় নিঃসন্দেহে ছাত্র-জনতার আত্মত্যাগ। আবু সাঈদ, মুগ্ধ, ওয়াসিম, ইয়ামিনসহ অসংখ্য তরুণ নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছেন। আরও বহু মানুষ স্থায়ীভাবে পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন; কেউ হারিয়েছেন দৃষ্টিশক্তি, কেউ হাত বা পা, আবার কেউ আজীবনের জন্য শারীরিক যন্ত্রণা বয়ে বেড়াচ্ছেন। তাঁদের আত্মত্যাগই আন্দোলনের নৈতিক ভিত্তিকে অপ্রতিরোধ্য শক্তিতে পরিণত করে। তাঁদের সাহস, দেশপ্রেম এবং আত্মোৎসর্গ বাংলাদেশের ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।
একই সঙ্গে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আন্দোলনের সময় বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর বহু নেতা-কর্মীও গ্রেপ্তার, আহত এবং বিভিন্ন নির্যাতনের শিকার হন। জুলাই গণঅভ্যুত্থানেও বিএনপির সহযোগী সংগঠন জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের ১৪২ জন নেতাকর্মী নিহত হন।
ইতিহাসের নিরপেক্ষ মূল্যায়ন আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, কোনো গণঅভ্যুত্থানের কৃতিত্ব একক ব্যক্তি বা একক রাজনৈতিক দলের নয়। তবে এটিও সমানভাবে সত্য যে, ছাত্র-জনতার আন্দোলন যখন একটি সর্বজনীন গণআন্দোলনে রূপ নেয়, তখন তার পেছনে দীর্ঘ রাজনৈতিক প্রস্তুতি, বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির ধারাবাহিক কর্মসূচি, নাগরিক সমাজের ভূমিকা এবং সাধারণ মানুষের জমে থাকা আকাঙ্ক্ষা—সবকিছুই সম্মিলিতভাবে কাজ করে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাসও সেই বৃহত্তর বাস্তবতার অংশ।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শেষ পর্যায়ের ঘটনাপ্রবাহ ছিল অত্যন্ত দ্রুত, নাটকীয় এবং ইতিহাসের গতিপথ পরিবর্তনকারী। প্রতিদিন নতুন নতুন কর্মসূচি, সংঘর্ষ, প্রাণহানি এবং গণগ্রেপ্তারের মধ্য দিয়ে পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হয়ে ওঠে। শিক্ষার্থীদের আন্দোলন তখন আর কেবল ক্যাম্পাসের ভেতরে সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে জেলা ও উপজেলা শহরেও সাধারণ মানুষ রাস্তায় নেমে আসেন। শিক্ষক, অভিভাবক, চিকিৎসক, আইনজীবী, সাংবাদিক, সংস্কৃতিকর্মী, শ্রমজীবী মানুষ, ব্যবসায়ী—সমাজের প্রায় সব শ্রেণি-পেশার মানুষ এক অভিন্ন দাবিতে সোচ্চার হয়ে ওঠেন। এই বহুমাত্রিক অংশগ্রহণই আন্দোলনকে একটি পূর্ণাঙ্গ জাতীয় গণঅভ্যুত্থানে রূপ দেয়।
একই সময়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বাংলাদেশের পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়তে থাকে। বিশ্বের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম আন্দোলনের ঘটনাবলি গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশ করে। মানবাধিকার সংস্থাগুলো প্রাণহানি ও বলপ্রয়োগের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে এবং সংযমের আহ্বান জানায়। আন্তর্জাতিক এই মনোযোগ দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে এবং সংকটের দ্রুত সমাধানের প্রয়োজনীয়তা সামনে নিয়ে আসে।
অবশেষে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক যুগান্তকারী পরিবর্তনের দিন হিসেবে আবির্ভূত হয়। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষের ঢল রাজধানীর দিকে অগ্রসর হয়। ছাত্র-জনতার অভূতপূর্ব গণজোয়ার এবং দ্রুত পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতা ছেড়ে দেশ ত্যাগ করেন। এর মধ্য দিয়ে দীর্ঘ দেড় দশকের একটি রাজনৈতিক অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটে এবং নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার সূচনা হয়।
তবে ৫ আগস্টকে শুধু একটি সরকারের পতনের দিন হিসেবে দেখলে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রকৃত তাৎপর্য উপলব্ধি করা যাবে না। এর সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো—রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি জনগণ। জনগণের আকাঙ্ক্ষা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, ন্যায়বিচার এবং গণতান্ত্রিক অধিকারকে দীর্ঘদিন উপেক্ষা করলে একসময় সেই ক্ষোভ বিস্ফোরিত রূপ ধারণ করতে পারে। ইতিহাস বারবার এই সত্যের সাক্ষ্য দিয়েছে; জুলাই গণঅভ্যুত্থানও তার ব্যতিক্রম নয়।
এই আন্দোলনের সবচেয়ে উজ্জ্বল অধ্যায় নিঃসন্দেহে শহীদ ও আহতদের আত্মত্যাগ। আবু সাঈদ, মুগ্ধ, ওয়াসিম, ইয়ামিনসহ অসংখ্য তরুণের আত্মদান এবং হাজারো আহত মানুষের বেদনাময় সংগ্রাম জাতির ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। তাঁদের ত্যাগই গণঅভ্যুত্থানকে নৈতিক শক্তি দিয়েছে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে দেশপ্রেম, সাহস ও ন্যায়বোধের এক অনন্য দৃষ্টান্ত উপহার দিয়েছে।
আজ সেই আত্মত্যাগের যথার্থ মর্যাদা রক্ষার দায়িত্ব শুধু রাষ্ট্রের নয়, সমাজেরও। শহীদ পরিবারের দীর্ঘমেয়াদি কল্যাণ, আহতদের উন্নত চিকিৎসা, পুনর্বাসন, শিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কেবল মানবিক কর্তব্য নয়; এটি জাতীয় দায়িত্বও। একই সঙ্গে আন্দোলনের সময় সংঘটিত হত্যাকাণ্ড ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও বিশ্বাসযোগ্য তদন্ত এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করাও একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের অপরিহার্য দায়িত্ব।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শহীদ ও আহতদের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় মর্যাদা, যথাযথ স্বীকৃতি এবং পূর্ণাঙ্গ পুনর্বাসন নিশ্চিত করার দৃঢ় অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, জুলাইয়ের আত্মত্যাগ শুধু ইতিহাসের একটি অধ্যায় নয়; এটি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রার এক অনন্য মাইলফলক। সেই অঙ্গীকার বাস্তবায়নে সরকার ইতোমধ্যে আর্থিক সহায়তা প্রদান, শহীদ পরিবারগুলোর সঙ্গে ধারাবাহিক মতবিনিময়, দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন কর্মসূচি গ্রহণ এবং আহতদের উন্নত চিকিৎসা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন কার্যকর উদ্যোগ বাস্তবায়ন করে চলেছে।
প্রধানমন্ত্রী শহীদ পরিবারগুলোর আর্থিক ও সামাজিক নিরাপত্তা জোরদার করার পাশাপাশি আহত যোদ্ধাদের চিকিৎসা, পুনর্বাসন এবং জীবনমান উন্নয়নে সরকারের অব্যাহত প্রতিশ্রুতির কথাও পুনর্ব্যক্ত করেন। একই সঙ্গে তিনি জুলাই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ, স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ বিচারপ্রক্রিয়া নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তাঁর আহ্বান ছিল—জুলাইয়ের আত্মত্যাগকে দলীয় ও রাজনৈতিক বিভাজনের ঊর্ধ্বে স্থান দিয়ে জাতীয় ঐক্যকে আরও সুদৃঢ় করা এবং সেই চেতনার আলোকে একটি গণতান্ত্রিক, ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলা।
জুলাই গণঅভ্যুত্থান আমাদের আরও একটি মূল্যবান শিক্ষা দিয়েছে—রাজনৈতিক পরিবর্তন কেবল আবেগ দিয়ে টেকসই হয় না; এর জন্য প্রয়োজন সুদীর্ঘ প্রস্তুতি, সাংগঠনিক সক্ষমতা, রাজনৈতিক প্রজ্ঞা এবং সর্বোপরি জাতীয় ঐক্য। ছাত্রসমাজ ছিল এই আন্দোলনের অগ্রভাগে, কিন্তু তাদের পাশে সাধারণ মানুষ, নাগরিক সমাজ এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তির সমর্থনও একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা ছিল। এই সম্মিলিত শক্তিই শেষ পর্যন্ত ইতিহাসের গতিপথ পরিবর্তন করেছে।
আজ বাংলাদেশ নতুন প্রত্যাশা নিয়ে ভবিষ্যতের পথে এগিয়ে যাচ্ছে। এখন একটি বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হবে, যেখানে জনগণই হবে সকল রাষ্ট্রক্ষমতার প্রকৃত উৎস; নির্বাচন হবে অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক; বিচারব্যবস্থা হবে স্বাধীন; রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো হবে জবাবদিহিমূলক; আর বৈষম্য, দুর্নীতি, দুঃশাসন ও রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কোনো স্থান থাকবে না।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাস তাই কেবল ৩৬ দিনের একটি আন্দোলনের ইতিহাস নয়। এটি বহু বছরের রাজনৈতিক সংগ্রাম, ছাত্র-জনতার আত্মত্যাগ, সাধারণ মানুষের আকাঙ্ক্ষা এবং পরিবর্তনের অদম্য প্রত্যয়ের সম্মিলিত ইতিহাস। এই ইতিহাসে ছাত্রদের সাহস যেমন অবিস্মরণীয়, তেমনি গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার দাবিতে দীর্ঘদিন আন্দোলন চালিয়ে যাওয়া রাজনৈতিক শক্তিগুলোর ভূমিকাও ইতিহাসের আলোচনায় স্থান পাওয়ার দাবিদার। আর সেই প্রেক্ষাপটে তারেক রহমানের রাজনৈতিক নেতৃত্ব, সাংগঠনিক ধারাবাহিকতা এবং গণতান্ত্রিক রূপান্তরের পক্ষে তাঁর অবস্থান—সমর্থক ও পর্যবেক্ষকদের মূল্যায়নে—জুলাই গণঅভ্যুত্থানের বৃহত্তর রাজনৈতিক পটভূমির একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হয়ে থাকবে।
জুলাইয়ের শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা, আহতদের প্রতি অকুণ্ঠ সম্মান এবং গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার ও জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকারই হোক এই ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তিতে আমাদের সম্মিলিত প্রত্যয়।
লেখক: প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব, সম্পাদক ও প্রকাশক দৈনিক দিনকাল, আহবায়ক, আমরা বিএনপি পরিবার ও সদস্য, বিএনপি মিডিয়া সেল।
