বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাসে কিছু সিদ্ধান্ত আছে, যেগুলো শুধু একটি খেলার ভবিষ্যৎ নয়, আন্তর্জাতিক রাজনীতি, বৈশ্বিক অর্থনীতি এবং প্রাতিষ্ঠানিক শাসনব্যবস্থার গতিপথও বদলে দেয়। জুরিখভিত্তিক বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফার সর্বশেষ উদ্যোগ ঠিক তেমনই একটি সিদ্ধান্তের ইঙ্গিত দিচ্ছে। বিশ্বের সবচেয়ে মূল্যবান ক্রীড়া সম্পদ ফিফা বিশ্বকাপ ও অন্যান্য প্রধান প্রতিযোগিতার সম্প্রচার, স্পনসরশিপ এবং টিকিট বিক্রির বাণিজ্যিক অধিকার একটি নতুন কোম্পানির অধীনে এনে তার প্রায় ২০ শতাংশ মালিকানা বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রির পরিকল্পনা শুধু একটি আর্থিক লেনদেন নয়; এটি বিশ্ব ফুটবলের ক্ষমতার কাঠামো পুনর্গঠনের সূচনা হতে পারে।
ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো এই উদ্যোগকে ফুটবলের জন্য “ঐতিহাসিক সুযোগ” হিসেবে তুলে ধরছেন। তার বক্তব্য, কয়েক বিলিয়ন ডলারের নতুন বিনিয়োগ থেকে আগামী চার বছরে ১০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারেরও বেশি অর্থ বিশ্ব ফুটবলের উন্নয়নে ব্যয় করা সম্ভব হবে। আফ্রিকা, এশিয়া, ক্যারিবীয় অঞ্চল ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় ছোট দেশগুলোর ফুটবল উন্নয়ন, নারী ফুটবলের প্রসার, যুব একাডেমি, অবকাঠামো এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য এই অর্থ ব্যবহার করা হবে।
প্রথম দৃষ্টিতে এই পরিকল্পনার বিরোধিতা করা কঠিন। কারণ ফুটবলের সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য হলো এটি বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা হলেও উন্নয়নের সুযোগ সবচেয়ে অসমভাবে বণ্টিত। ইউরোপের শীর্ষ ক্লাবগুলো যেখানে এক মৌসুমেই শত শত মিলিয়ন ইউরো আয় করে, সেখানে আফ্রিকা বা দক্ষিণ এশিয়ার বহু জাতীয় ফেডারেশন বছরে একটি আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট আয়োজনের অর্থও জোগাড় করতে হিমশিম খায়। সেই বাস্তবতায় নতুন অর্থায়নের ধারণা স্বাভাবিকভাবেই আকর্ষণীয়।
কিন্তু অর্থনীতির ভাষা এবং ক্রীড়ার ভাষা সব সময় এক নয়। এখানেই শুরু হয়েছে মূল বিতর্ক।
উয়েফা এই পরিকল্পনাকে এমন একটি সীমারেখা হিসেবে বর্ণনা করেছে, যা কোনো বৈশ্বিক ক্রীড়া নিয়ন্ত্রক সংস্থার অতিক্রম করা উচিত নয়। কারণ ফিফার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদের সঙ্গে যখন বাইরের বিনিয়োগকারীদের মালিকানা যুক্ত হবে, তখন তাদের প্রত্যাশাও যুক্ত হবে। একজন বিনিয়োগকারী কখনোই শুধুমাত্র সামাজিক উন্নয়নের জন্য অর্থ বিনিয়োগ করেন না; তিনি দীর্ঘমেয়াদে মুনাফা, প্রভাব এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশীদারিত্ব চান। সেই বাস্তবতা অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
বিশ্ব ক্রীড়া অর্থনীতির সাম্প্রতিক ইতিহাসও এই আশঙ্কাকে উড়িয়ে দেয় না। গত এক দশকে ইউরোপীয় ফুটবলে মার্কিন প্রাইভেট ইকুইটি ফান্ড, মধ্যপ্রাচ্যের সার্বভৌম সম্পদ তহবিল এবং বহুজাতিক বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠানের উপস্থিতি দ্রুত বেড়েছে। ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ থেকে শুরু করে ইতালির সিরি আ, ফরাসি লিগ ওয়ান কিংবা স্প্যানিশ ক্লাব সবখানেই পুঁজির নতুন মানচিত্র তৈরি হয়েছে। এর ফলে আয় বেড়েছে, কিন্তু একই সঙ্গে ফুটবল ক্রমশ সাধারণ দর্শকের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। টিকিটের মূল্য বৃদ্ধি, সম্প্রচার স্বত্বের ব্যয় বৃদ্ধি এবং অতিরিক্ত বাণিজ্যিকীকরণ ইতোমধ্যেই ইউরোপের সমর্থকদের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি করেছে।
এই প্রেক্ষাপটে ফিফার সিদ্ধান্তকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখার সুযোগ নেই।
আরও একটি বিষয় পরিস্থিতিকে জটিল করেছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের তথ্যমতে, সম্ভাব্য বিনিয়োগকারী গোষ্ঠীর একজন অংশীদারের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের পরিবারের ব্যবসায়িক সম্পর্ক রয়েছে। বিষয়টি আইনগতভাবে অনিয়মের প্রমাণ নয়, কিন্তু এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ নৈতিক প্রশ্ন উত্থাপন করে। বিশ্বকাপ কেবল একটি ক্রীড়া আসর নয়; এটি এখন বৈশ্বিক কূটনীতি, অর্থনীতি ও সফট পাওয়ারের অন্যতম শক্তিশালী মঞ্চ। সেখানে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর উপস্থিতি ভবিষ্যতে স্বার্থের সংঘাতের আশঙ্কা বাড়াতে পারে।
বিশ্বকাপের আয়োজক নির্বাচন, নতুন প্রতিযোগিতা চালু করা, সম্প্রচার অধিকার বণ্টন কিংবা বাণিজ্যিক কৌশল এসব সিদ্ধান্ত কি শুধুই ফুটবলের স্বার্থে নেওয়া হবে, নাকি বিনিয়োগকারীদের আর্থিক প্রত্যাশাও সেখানে প্রভাব ফেলবে? এই প্রশ্নের সুস্পষ্ট উত্তর এখনও নেই।
উয়েফার আপত্তির পেছনেও কেবল নীতিগত কারণ রয়েছে এমন ভাবারও সুযোগ নেই। ইউরোপ দীর্ঘদিন ধরে বিশ্ব ফুটবলের আর্থিক কেন্দ্র। বিশ্বকাপের বাণিজ্যিক মূল্য বাড়লেও ইউরোপীয় ক্লাব ফুটবলই এখনও সবচেয়ে লাভজনক বাজার। ফলে ফিফা যদি নতুন অর্থনৈতিক কাঠামোর মাধ্যমে এশিয়া, আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের দিকে আরও বেশি সম্পদ ও প্রভাব সরিয়ে দেয়, তাহলে ইউরোপের ঐতিহ্যগত প্রভাব কিছুটা হলেও কমতে পারে। অর্থাৎ এখানে নীতির পাশাপাশি ক্ষমতার প্রশ্নও জড়িত।
এ কারণেই বর্তমান বিতর্ককে শুধু “ফিফা বনাম উয়েফা” হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি মূলত বিশ্ব ফুটবলের নেতৃত্ব কার হাতে থাকবে সেই প্রশ্নের লড়াই।
বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর জন্য এই ঘটনায় গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা রয়েছে। আমাদের মতো উন্নয়নশীল ফুটবল জাতিগুলো দীর্ঘদিন ধরে বৈশ্বিক সম্পদ বণ্টনে বৈষম্যের শিকার। যদি সত্যিই নতুন অর্থায়নের মাধ্যমে প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি, অবকাঠামো ও প্রতিযোগিতার সুযোগ বৃদ্ধি পায়, তাহলে সেটি ইতিবাচক হবে। কিন্তু উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে অর্থ বণ্টনের স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ওপর।
ফিফা অতীতেও দুর্নীতির অভিযোগে বড় ধরনের সংকটের মুখে পড়েছে। সেই অভিজ্ঞতা বিশ্বকে শিখিয়েছে, শুধু অর্থের পরিমাণ নয়; অর্থের উৎস, ব্যবস্থাপনা এবং জবাবদিহিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আজ যদি ফিফা নতুন বিনিয়োগ গ্রহণ করে, তবে তাদের ওপর আগের চেয়ে অনেক বেশি স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার দায়িত্ব বর্তাবে।
বিশ্ব এখন এমন এক সময়ে প্রবেশ করেছে, যেখানে খেলাধুলাও ভূরাজনীতির অংশ। অলিম্পিক, বিশ্বকাপ, ক্লাব মালিকানা, সম্প্রচার অধিকার, ক্রীড়া প্রযুক্তি সবকিছুই আন্তর্জাতিক প্রভাব বিস্তারের নতুন ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। এই বাস্তবতায় ফিফার বর্তমান সিদ্ধান্তকে কেবল অর্থনৈতিক উদ্যোগ হিসেবে ব্যাখ্যা করলে পুরো চিত্রটি ধরা পড়বে না। এটি আসলে বৈশ্বিক ক্ষমতা, করপোরেট পুঁজি এবং ক্রীড়া শাসনের নতুন সমীকরণের সূচনা।
ফুটবলের সৌন্দর্য তার অনিশ্চয়তায়, তার আবেগে এবং তার সর্বজনীনতায়। কোটি কোটি মানুষ এই খেলাকে ভালোবাসে, কারণ এটি এখনও মানুষের খেলা। সেই খেলার নিয়ন্ত্রণ যদি ধীরে ধীরে করপোরেট বিনিয়োগের হিসাব-নিকাশে সীমাবদ্ধ হয়ে যায়, তবে লাভের অঙ্ক বাড়লেও ফুটবলের আত্মা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি থেকে যাবে।
ফিফার সামনে তাই আজ সবচেয়ে বড় প্রশ্ন অর্থ সংগ্রহের নয়; বিশ্বাস রক্ষার। কারণ বিশ্বকাপের ট্রফি সোনা দিয়ে তৈরি হতে পারে, কিন্তু তার প্রকৃত মূল্য নির্ধারণ করে মানুষের আস্থা। সেই আস্থা হারিয়ে গেলে কোনো বিনিয়োগ, কোনো করপোরেট অংশীদারিত্ব এবং কোনো আর্থিক সাফল্যই বিশ্ব ফুটবলের হারিয়ে যাওয়া মর্যাদা ফিরিয়ে আনতে পারবে না।
লেখক: সহিদুল আলম স্বপন, সুইজারল্যান্ডভিত্তিক বেসরকারি ব্যাংকিং আর্থিক অপরাধ বিশেষজ্ঞ কলামিস্ট ও কবি
ইমেইল: [email protected]
