আপনার নিজের বাড়ি আছে আমরা আমাদের বাড়িকে মিস করি

দূতের গাড়িবহরের সামনে প্ল্যাকার্ড

আপনার নিজের বাড়ি আছে আমরা আমাদের বাড়িকে মিস করি

ফন্ট সাইজ:

কক্সবাজারের উখিয়ার রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবির পরিদর্শনে এসে বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের দীর্ঘদিনের প্রত্যাবাসনের আকুতি প্রত্যক্ষ করলেন যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া বিষয়ক বিশেষ দূত সার্জিও গোর। শুক্রবার উখিয়ার বিভিন্ন ক্যাম্প পরিদর্শনের সময় তার গাড়িবহরের সামনে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে প্ল্যাকার্ড প্রদর্শন করেন রোহিঙ্গারা। শান্তিপূর্ণ এ কর্মসূচির মাধ্যমে তারা নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসন, নাগরিক অধিকার এবং মিয়ানমারে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানান। রোহিঙ্গাদের হাতে থাকা প্ল্যাকার্ডে ইংরেজিতে লেখা ছিল “ণড়ঁ যধাব ুড়ঁৎ যড়সব! ডব সরংং ড়ঁৎ যড়সব!” বাংলায় যার অর্থ ‘আপনার নিজের বাড়ি আছে, আমরা আমাদের বাড়িকে মিস করি।’

প্ল্যাকার্ডের পাশাপাশি অনেক রোহিঙ্গা নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষার কথাও জানান। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, মার্কিন বিশেষ দূতের সফরকে কেন্দ্র করে রোহিঙ্গারা আগে থেকেই তাদের দাবিগুলো তুলে ধরার প্রস্তুতি নেন। গাড়িবহর ক্যাম্পের বিভিন্ন সড়ক দিয়ে যাওয়ার সময় তারা রাস্তার পাশে সারিবদ্ধ হয়ে প্ল্যাকার্ড প্রদর্শন করেন। এ সময় কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা ছাড়াই শান্তিপূর্ণভাবে নিজেদের দাবির কথা জানান তারা। প্রত্যক্ষদর্শী আব্দুর রহিম বলেন, রোহিঙ্গারা শান্তিপূর্ণভাবে প্ল্যাকার্ড প্রদর্শনের মাধ্যমে তাদের প্রত্যাবাসনের দাবি জানিয়েছেন। তাদের মূল কথা হলো নিরাপত্তা ও নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করে তারা নিজ দেশে ফিরে যেতে চান। রোহিঙ্গা নেতা মো. জুবায়ের বলেন, আমরা বছরের পর বছর ধরে ক্যাম্পে অনিশ্চিত জীবন কাটাচ্ছি। আমাদের একটাই চাওয়া নাগরিক অধিকার, নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করে নিজ দেশে ফিরে যেতে চাই।

আমরা আর শরণার্থী হয়ে জীবন কাটাতে চাই না। তিনি বলেন, রোহিঙ্গারা বাংলাদেশের প্রতি কৃতজ্ঞ। কিন্তু কোনো মানুষ চিরকাল নিজের দেশ ছেড়ে অন্যের আশ্রয়ে থাকতে চায় না। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের এখন কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন, যাতে আমরা নিরাপদে আমাদের মাতৃভূমিতে ফিরতে পারি। ক্যাম্প সূত্র জানায়, মার্কিন বিশেষ দূতের সফর ঘিরে রোহিঙ্গাদের মধ্যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। তাদের আশা, যুক্তরাষ্ট্রসহ আন্তর্জাতিক সমপ্রদায়ের সক্রিয় কূটনৈতিক উদ্যোগে মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা, নাগরিকত্ব ও অধিকার নিশ্চিত করার পাশাপাশি প্রত্যাবাসনের উপযোগী পরিবেশ তৈরির পথ তৈরি হবে। সফরকালে সার্জিও গোর রোহিঙ্গা ক্যাম্পের সার্বিক পরিস্থিতি, মানবিক সহায়তা কার্যক্রম এবং বাস্তুচ্যুত মানুষের জীবনযাত্রা সরজমিন দেখেন।

ক্যাম্পে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও অন্যান্য মানবিক কার্যক্রম সম্পর্কেও সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে তথ্য নেন বলে জানা গেছে। একইসঙ্গে রোহিঙ্গা সংকটের বর্তমান পরিস্থিতি এবং প্রত্যাবাসন-সংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়েও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন তিনি। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ও দীর্ঘস্থায়ী শরণার্থী সংকটের কেন্দ্র কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে বর্তমানে ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গা বসবাস করছেন। ২০১৭ সালে মিয়ানমারের রাখাইনে সামরিক অভিযানের পর বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেন।

দীর্ঘদিন ধরে প্রত্যাবাসনের আলোচনা চললেও নিরাপত্তা, নাগরিকত্ব ও অধিকার নিশ্চিত না হওয়ায় এখনো বড় পরিসরে প্রত্যাবাসন শুরু হয়নি। সামপ্রতিক সময়ে ক্যাম্পের মানবিক পরিস্থিতিও নানা সংকটে পড়েছে। বর্ষা মৌসুমে পাহাড়ধস, জলাবদ্ধতা ও ভারী বৃষ্টিতে ঝুঁঁকিপূর্ণ পাহাড়ি এলাকায় বসবাসকারী রোহিঙ্গাদের জীবন আরও অনিরাপদ হয়ে উঠেছে। চলতি জুলাইয়ে ভারী বৃষ্টির পর উখিয়া ও টেকনাফের বিভিন্ন ক্যাম্পে পাহাড়ধস ও দুর্ঘটনায় প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছে। এরই মধ্যে মার্কিন বিশেষ দূতের বাংলাদেশ সফরকে রোহিঙ্গা সংকটের বিষয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নতুন করে আলোচনার সুযোগ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।

সফরের আগে বাংলাদেশি কর্মকর্তারা জানিয়েছিলেন, সার্জিও গোরের তিনদিনের সফরের শেষ পর্যায়ে কক্সবাজারে রোহিঙ্গা পরিস্থিতি সরজমিন দেখার কর্মসূচি ছিল। ক্যাম্পে বিশেষ দূতের গাড়িবহরের সামনে রোহিঙ্গাদের হাতে তুলে ধরা সেই প্ল্যাকার্ড যেন দীর্ঘ প্রায় এক দশকের বাস্তুচ্যুত জীবনেরই প্রতিচ্ছবি আপনার নিজের বাড়ি আছে, আমরা আমাদের বাড়িকে মিস করি। তাদের প্রত্যাশা, আন্তর্জাতিক চাপ ও কার্যকর উদ্যোগের মাধ্যমে একদিন নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণভাবে নিজ দেশে ফেরার পথ খুলবে।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন