২৩শে জুন ২০০৭ সালের গভীর রাত। দিনের ক্লান্তি শেষে সবাই যখন ঘুমে আচ্ছন্ন, তখন শেরপুরের নালিতাবাড়ী উপজেলার সীমান্তবর্তী পানিহাটা গ্রামের একটি ছনের বেড়ার ঘর ঘিরে ফেলে বন্য হাতির পাল। ঘড়ির কাঁটা তখন রাত আনুমানিক আড়াইটার ঘরে। মুহূর্তেই ঘুমন্ত একটি পরিবারের জীবনে নেমে আসে ভয়াবহ বিভীষিকা। সেদিন ভারতের পাহাড়ি এলাকা থেকে নেমে আসা প্রায় ৩৫টি বন্য হাতির একটি পাল হামলা চালায় ইলিশন সাংমার বাড়িতে। ঘরে ছিলেন ইলিশন সাংমা, তার স্ত্রী কল্পনা সাংমা এবং তাদের দুই ছেলে তিন বছরের বিপুল সাংমা ও সাত বছরের ফারুক সাংমা।
কল্পনা সাংমার ভাষ্য, বাইরে অস্বাভাবিক শব্দ শুনে ঘুম ভাঙার পর অন্ধকারে তাকিয়ে দেখেন, হাতির শূঁড় তার ছোট ছেলে বিপুলকে নিয়ে যাচ্ছে। ভয়ে তার স্বামী ইলিশন সাংমা নিজেই ঘর থেকে পালিয়ে যান। আর হাতির পাল ঘরের ভেতরেই ছোট ছেলে বিপুল সাংমাকে পায়ের নিচে পিষ্ট করে হত্যা করে। এদিকে অসুস্থ বড় ছেলে ফারুক সাংমাকে কাঁধে তুলে নিয়ে প্রাণ বাঁচাতে দৌড় দেন কল্পনা সাংমা। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস- কিছুদূর যাওয়ার পর হাতির পাল তার কাঁধ থেকেও ফারুককে ছিনিয়ে নেয়। কল্পনা সাংমা বলেন, ছেলেটার শেষ কথা ছিল ‘মা, আমারে ফালাইয়া গেলাগা।’ এরপর নিজেকে বাঁচাতে রাস্তার পাশের একটি গর্তে পড়ে যান কল্পনা। হাতিরা গর্তের ওপর আকাশমণি গাছের ডাল ভেঙে ফেললে তিনি সেটির নিচে চাপা পড়ে যান। আর তার চোখের সামনেই হাতির পায়ের নিচে পিষ্ট হয়ে মারা যায় তার সন্তান। এই স্মৃতি বলতে গিয়ে আজও কেঁদে ফেলেন কল্পনা সাংমা। কিছুক্ষণ কথা বলতে গিয়ে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েন তিনি।
চোখের পানি মুছে বলেন, সেদিন আমি আমার ছেলেকে বাঁচাতে পারিনি। ওই রাতের তাণ্ডবে শুধু দুই শিশুর প্রাণই যায়নি; হাতির পালটি বাড়িঘর ভেঙে দেয়, আশপাশের আরও তিনটি বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং বেশ কয়েকটি গাছ উপড়ে ফেলে। এতে পুরো এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। প্রত্যক্ষদর্শী আমতী দিও বলেন, শব্দ শুনে ঘর থেকে বের হয়ে দেখি, ঘরটা লণ্ডভণ্ড হয়ে আছে। হাতির ভয়ে আমরা পালিয়ে যাই। ঘটনার পর পরিবারটি কিছুটা সহযোগিতা পেয়েছিল বলে জানান কল্পনা সাংমা। তবে তার ভাষ্য, সেই সহযোগিতা ছিল খুবই সামান্য। তৎকালীন সময়ে হাতির আক্রমণে নিহতদের জন্য বর্তমানের মতো ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা ছিল না বলেই তারা উল্লেখযোগ্য কোনো আর্থিক সহায়তা পাননি- এমনটাই জানান পরিবারের সদস্যরা।
দুই সন্তানকে হারানোর ১৯ বছর পেরিয়ে গেলেও সেই রাতের বিভীষিকা আজও কল্পনার চোখে জীবন্ত। বর্তমানে ইলিশন সাংমা ও কল্পনা সাংমার সংসার চলে অন্যের জমিতে কাজ করে। নিজেদের জমিজমা বলতে প্রায় কিছুই নেই। এদিকে হাতি-মানুষের সংঘাত কমাতে নালিতাবাড়ীতে প্রথম ধাপে ১৫টি এআইভিত্তিক স্মার্ট ক্যামেরা বসানোর উদ্যোগ নিয়েছে বন বিভাগ। এসব ক্যামেরা হাতির গতিবিধি শনাক্ত করে বন কর্মকর্তা ও এলিফ্যান্ট রেসপন্স টিমকে আগাম সতর্কবার্তা দেবে।
তবে স্থানীয়দের প্রশ্ন, এতে ফসল কতোটা রক্ষা পাবে? কারণ নিহতদের অধিকাংশই ফসল রক্ষা করতে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছেন। আগাম সতর্কবার্তা পেলেও কৃষকদের সামনে থাকবে একই বাস্তবতা ফসল ছেড়ে দেবেন, নাকি জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আবারো মাঠে নামবেন। বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন, ২০১২ অনুযায়ী হাতি হত্যা দণ্ডনীয় অপরাধ। তবে স্থানীয়দের মতে, শুধু আইন বা প্রযুক্তি দিয়ে এই সংকটের সমাধান হবে না। দ্রুত ক্ষতিপূরণ, নিরাপদ ফসল সুরক্ষা ব্যবস্থা, অবৈধ বিদ্যুতায়িত ফাঁদ বন্ধ এবং হাতির নিরাপদ করিডোর নিশ্চিত করা না গেলে নালিতাবাড়ীর সীমান্ত এলাকায় হাতি-মানুষের এই রক্তক্ষয়ী দ্বন্দ্ব থামবে না।
