ইনফান্তিনোর মহাসংকট ও বিশ্ব ফুটবলে ঝড়

উয়েফার পর এএফসি

ইনফান্তিনোর মহাসংকট ও বিশ্ব ফুটবলে ঝড়

ফন্ট সাইজ:

বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা এবং ইউরোপিয়ান ফুটবলের অভিভাবক উয়েফার মধ্যকার দ্বন্দ্ব এখন চরম রূপ নিয়েছে। বিশ্বকাপ ফুটবলের বাণিজ্যিক শেয়ার বিক্রির এক গোপন ও বিতর্কিত পরিকল্পনা সামনে আসায় ফিফা প্রধান জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর বিরুদ্ধে ফুঁসে উঠেছে পুরো ইউরোপ। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, ইনফান্তিনো তার সিদ্ধান্ত থেকে সরে না দাঁড়ালে ফিফার যেকোনো টুর্নামেন্ট বয়কট করার ঐতিহাসিক ঘোষণা দিয়েছে উয়েফা। কনকাক্যাফের পর এবার ফিফার পরিকল্পনা প্রত্যাখ্যান করেছে এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশন এএফসি-ও।

অবশ্য ইউরোপের মতো তারা সরাসরি বয়কটের হুমকি দেয়নি। এক বিবৃতিতে এএফসি বলে, ‘ফুটবলের কখনোই এমন অবস্থানে পৌঁছানো উচিত ছিল না।’ মূলত ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর একটি ‘মাস্টারপ্ল্যান’কে ঘিরেই এই সংকটের সূত্রপাত। কাতারভিত্তিক সংবাদ এবং বিশ্ব গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, ইনফান্তিনো বিশ্বকাপের একটি বাণিজ্যিক অংশের ২০ শতাংশ মালিকানা প্রাইভেট ইনভেস্টর বা বাইরের বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রি করতে গোপনে তোড়জোড় চালাচ্ছিলেন।

বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর উয়েফা সভাপতি আলেকজান্ডার সেফেরিনের আহ্বানে জরুরি ভার্চুয়াল বৈঠকে বসেন ইউরোপের ৫৫টি সদস্য দেশের প্রতিনিধিরা। তারা একযোগে ভোট দিয়ে বিশ্বকাপ বর্জনের হুমকি দিয়েছে।

ইংলিশ এফএ-র প্রধান নির্বাহী এবং ফিফা সহ-সভাপতি ডেবি হিউইট স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, ‘আমরা আমাদের ইউরোপিয়ান ভাইদের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করছি। ফিফার এই পরিকল্পনা আমরা কোনোভাবেই মেনে নেবো না। ফিফা বিশ্বকাপ কেবলই ফুটবলের এবং এটি চিরকাল তাই থাকবে।’ উয়েফার এই কঠোর অবস্থানের পর নড়েচড়ে বসেছে ফিফা। শুক্রবার ভোরে এক বিবৃতিতে ফিফা দাবি করে, ‘কেউ ফুটবল বিক্রি করছে না এবং ফিফা কখনোই এমন কিছু কল্পনাও করতে পারে না।’

অনিশ্চয়তায় ফিফার যে আসরগুলো
এর প্রভাব সবার আগে পড়তে পারে ফিফা অনূর্ধ্ব-২০ নারী বিশ্বকাপে। আগামী ৫ থেকে ২৭শে সেপ্টেম্বর পোল্যান্ডে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া টুর্নামেন্টে ইউরোপ থেকে স্বাগতিক পোল্যান্ডসহ খেলার কথা রয়েছে স্পেন, ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, ইতালি ও পর্তুগালের। সূচিতে আগামী অক্টোবরে হতে যাওয়া নারী বিশ্বকাপের বাছাইপর্বের প্লে-অফও রয়েছে। সেখানে খেলার কথা ইংল্যান্ড, উত্তর আয়ারল্যান্ড, স্কটল্যান্ড ও ওয়েলসের। এরপর আছে মরক্কোয় অনুষ্ঠেয় অনূর্ধ্ব-১৭ নারী বিশ্বকাপ। যদিও টুর্নামেন্টটির চূড়ান্ত সূচি এখনো ঘোষণা করা হয়নি। তালিকায় আছে আগামী নভেম্বরে কাতারে হতে যাওয়া ছেলেদের অনূর্ধ্বু১৭ বিশ্বকাপও। সেখানে বেলজিয়াম, ক্রোয়েশিয়া, ডেনমার্ক, স্পেন, ফ্রান্স, গ্রিস, আয়ারল্যান্ড, ইতালি, মন্টেনেগ্রো, রোমানিয়া ও সার্বিয়ার অংশগ্রহণ নিশ্চিত হয়েছে। ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে ফিফার অনুমোদিত বেশ কয়েকটি বড় টুর্নামেন্ট। এর মধ্যে রয়েছে ব্রাজিলে ২০২৭ নারী বিশ্বকাপ, ২০৩০ বিশ্বকাপ ফুটবল এবং আজারবাইজান ও উজবেকিস্তানে ২০২৭ অনূর্ধ্ব-২০ পুরুষ বিশ্বকাপ।

তবে ফিফার এই বিবৃতিকে অত্যন্ত ‘অপেশাদার ও আত্মপক্ষ সমর্থনের দেউলিয়া রূপ’ হিসেবে দেখছেন ক্রীড়া বিশ্লেষকরা। স্কাই স্পোর্টস নিউজের প্রধান সংবাদদাতা কাভে সোলহেকল মন্তব্য করেছেন, ‘ইনফান্তিনো এখন গভীর গর্তে আটকা পড়েছেন। তাকে এখনই থামতে হবে। যেভাবে তিনি সংবাদমাধ্যমকে দুষে যাচ্ছেন, তাতে মনে হচ্ছে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের নীতি অনুসরণ করছেন। অথচ দ্য টাইমস এবং ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের অনুসন্ধানী রিপোর্টগুলো পুরোপুরি সত্য ছিল।’

অন্যান্য কনফেডারেশনের অবস্থান কী?
শুধু উয়েফাই নয়, উত্তর ও মধ্য আমেরিকার ফুটবল সংস্থা কনকাক্যাফ এবং এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশন এএফসি-ও ইনফান্তিনোর এমন একরোখা সিদ্ধান্তে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। কনকাক্যাফ এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, ফিফার অভ্যন্তরীণ কোনো সঠিক প্রক্রিয়া বা গভর্নিং বডির অনুমোদন ছাড়াই এ ধরনের গোপন চুক্তি সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য। তারা আরও জানায় যে, তাদের ৪১টি সদস্যদেশ এ পরিকল্পনা একবাক্যে ‘প্রত্যাখ্যান’ করেছে। যদিও ফিফার সদস্য দেশগুলোর বড় একটি অংশ এখনো আর্থিক প্রণোদনার লোভে ইনফান্তিনোর পক্ষে থাকতে পারে।

তবে ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী দলগুলো ছাড়া যে বিশ্বকাপ মূল্যহীন- তা বলার অপেক্ষা রাখে না। আগামী মার্চে ফিফা নির্বাচনে ইনফান্তিনো বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় পুনর্নির্বাচিত হওয়ার স্বপ্ন দেখলেও এই মহা সংকটের পর তার মসনদ এখন নড়বড়ে। বিশ্লেষকদের মতে, ইনফান্তিনো যদি দ্রুত ক্ষমা না চান এবং নিজের ভুল সংশোধন না করেন, তবে আধুনিক বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাসে এটিই হবে সবচেয়ে বড় ভাঙন। এখন দেখার বিষয়, নিজের ক্ষমতা বাঁচাতে শেষ পর্যন্ত কোন পথে হাঁটেন এই বিতর্কিত বনে যাওয়া ফিফা প্রধান।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন