মুন্নু গ্রুপ অফ ইন্ডাস্ট্রিজের প্রতিষ্ঠাতা, শিল্প বিপ্লবের অগ্রদূত, শিক্ষানুরাগী, বরেণ্য রাজনীতিবিদ ও সাবেক মন্ত্রী মরহুম হারুণার রশিদ খান মুন্নু এবং তার সহধর্মিণী মরহুমা হুরন নাহার রশিদ। বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী আফরোজা খানম রিতার গর্বিত বাবা-মা। পরিবারের সকলকে কাঁদিয়ে মহাকাশের ডাকে সাড়া দিয়ে দু’জনেই চলে গেছেন অনন্তকালের ঠিকানায়। তাদের হারিয়ে আজ স্মৃতি আঁকড়ে পথ চলছেন স্বজনেরা।
২০১৭ সালের ১লা আগস্ট অর্থাৎ আজকের এই দিনে না ফেরার দেশে চলে যান মুন্নু পরিবারের আদর্শের প্রতীক হারুণার রশিদ খান মুন্নু। তার প্রয়াণের ৯ বছর পর গত ২০২৬ সালের ১লা মার্চ চিরদিনের জন্য স্বামীর ঠিকানায় পাড়ি জমান সহধর্মিণী হুরন নাহার রশিদ। জীবদ্দশায় তারা ছিলেন এক সুখী দম্পতি। স্বামীর সফলতার গল্পের পেছনের প্রধান শিরোনামই ছিলেন স্ত্রী হুরন নাহার রশিদ।
আফরোজা খানম রিতা ছোটবেলা থেকেই বাবার সততা আর আদর্শে মুগ্ধ ছিলেন। বাবার আদর্শ, কর্ম উদ্দীপনা, লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যকে নিজের ভেতর ধারণ ও লালন করেই এগিয়ে যাচ্ছেন সামনের দিকে। জীবদ্দশায় মরহুম হারুণার রশিদ খান মুন্নু যে কাজেই হাত দিতেন তাতেই পেতেন সফলতা। ঠিক তেমনি বাবার প্রতিচ্ছবি হয়ে রিতাও যে কাজে হাত দিচ্ছেন তাতে পাচ্ছেন সফলতা। ২৫ বছর আগে বাবার হাত ধরে রাজনীতিতে পদার্পণ করা রিতা এখন বেসরকারি বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন। তার বাবাও ২০০১ সালে চারদলীয় জোট সরকারের মন্ত্রী ছিলেন।
আফরোজা খানম রিতা রাজনীতির ময়দানে যেমন আলো ছড়ানো একজন মানুষ তেমনি দেশের একজন সফল শিল্পোদ্যোক্তা। বাবার মতো তিনিও মানবতার ফেরিওয়ালা হিসেবে মানুষের কল্যাণে কাজ করে যাচ্ছেন। বিশেষ করে মানিকগঞ্জের মানুষের ভাগ্য উন্নয়নে তিনি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। অন্যদিকে আফরোজা খানম রিতার রত্নগর্ভা মা হুরন নাহার রশিদ মেয়ের সর্বশেষ সফলতা দেখে গেছেন। তবে জীবনের অন্তিম সময়ে। গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রিতা যখন ভোটের রেকর্ড সৃষ্টি করে মানিকগঞ্জ-৩ আসন থেকে বিজয়ী হন তখন আনন্দের সেই বার্তা নিয়ে ছুটে গিয়েছিলেন হাসপাতালের বেডে শুয়ে থাকা মায়ের কাছে। সেদিন সেখানে এক আবেগঘন পরিবেশ তৈরি হয়। ক্যান্সার আক্রান্ত মৃত্যু পথযাত্রী মাকে জড়িয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন রিতা। জীবন-মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করতে থাকা মা’ও তখন মেয়েকে বুকে জড়িয়ে অঝোরে কাঁদেন। এর কিছুদিন পরেই তার মা মুন্নু পরিবারের সদস্যদের মায়ার বাঁধন ছেড়ে চলে যান না ফেরার দেশে। আফরোজা খানম রিতা তার বাবার স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে আবেগ আপ্লুত কণ্ঠে বলেন, আমার বাবা-মা হচ্ছেন আমার পৃথিবী, আমার আদর্শ, আমার অহংকার, আমার গর্ব। ছোটবেলা থেকেই দেখেছি বাবা কখনো সততা থেকে বিন্দু পরিমাণ বিচ্যুত হননি। তিনি আমাকে শিখিয়েছেন কীভাবে সমাজ ও দেশের কল্যাণে কাজ করতে হয়। তার স্বপ্ন ছিল আমি যেন মানুষের সেবা করি। আজ আমি এমপি ও মন্ত্রী হয়েছি, কিন্তু সবচেয়ে কষ্টের বিষয় হলো বাবা আমার এ সফলতা দেখে যেতে পারলেন না। বাবা ছিলেন আমার পদপ্রদর্শক, আদর্শ এবং শিক্ষাগুরু। আমার অহংকারের পুরো জায়গা জুড়ে আছেন বাবা। আমাকে নিয়ে তার স্বপ্ন ছিল পাহাড় পরিমাণ। তিনি যেমন স্বপ্ন দেখতেন ঠিক আমাকেও স্বপ্ন দেখাতেন।
রিতা বলেন, ‘বাবা আমাকে প্রায়ই বলতেন আমার অবর্তমানে এলাকার মানুষজনকে তুমি দেখে রাখবে। কেউ যেনো আমার বাড়ির দরজা থেকে ফিরে না যায়। বাবাকে আমি কথা দিয়েছিলাম, তোমার রক্ত আমার শরীরে। তুমি যেভাবে সারাজীবন মানুষের পাশে থেকে দেশ ও মানবকল্যাণে কাজ করেছো, ঠিক আমিও তোমার আদর্শের দীক্ষাতে সেই পথ অনুসরণ, অনুকরণ করেই চলবো। মায়ের স্মৃতিচারণ করতে গিয়েও আবেগ আপ্লুত হন রিতা। বলেন, বাবার অবর্তমানে মা-ই ছিলেন আমাদের পরিবারের মূল অভিভাবক। যিনি বটবৃক্ষের মতো আমাদের পুরো পরিবারকে ছায়া দিয়ে রেখেছিলেন। বাবার প্রতিটি সফলতার পেছনে মায়ের অবদান ছিল অপরিসীম। পর্দার আড়াল থেকে বাবাকে উৎসাহ ও সাহস যুগিয়েছেন। বাবার জীবনে আমার মা আশীর্বাদ হয়ে এসেছিলেন। আজ তারা কেউ-ই নেই, কিন্তু তাদের দোয়া আর আশীর্বাদ আমার পথ চলার মূল শক্তি।
