প্রশাসনে হঠাৎ রদবদল, নানা আলোচনা

প্রশাসনে হঠাৎ রদবদল, নানা আলোচনা

ফন্ট সাইজ:

প্রশাসনের নানা পদে পরিবর্তন আনছে সরকার। প্রশাসনকে আরও গতিশীল ও কার্যকর করতে সততা, দক্ষতা ও প্রশাসনিক অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। ব্যক্তিগত দক্ষতা, শিক্ষাগত যোগ্যতা ও পেশাদারিকে নিয়োগ ও পদোন্নতির ভিত্তি হিসেবে বিবেচনায় নিয়ে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগে সিনিয়র সচিব ও সচিব পদে এই পরিবর্তনের কাজ শুরু করেছে সরকার। এ ছাড়া, আমলাদের বাইরেও হঠাৎ করে রাজনীতিবিদকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিয়ে কাজে গতি আনার উদ্যোগও দেখা যাচ্ছে। ইতিমধ্যে বিতর্কের অভিযোগ ওঠা কিছু কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরেও পাঠিয়েছে বর্তমান সরকার।

সম্প্রতি সরকার ১১টি সরকারি প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে এক বছরের জন্য চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিয়েছে ক্ষমতাসীন বিএনপি’র নেতাদের। এর আগে কখনোই সরকারি বিভিন্ন সংস্থা, বোর্ড ও করপোরেশনে একসঙ্গে এত রাজনীতিবিদকে নিয়োগ দিতে দেখা যায়নি। অন্যদিকে, গত সোমবার ৩২ জন যুগ্ম সচিবকে একসঙ্গে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠিয়েছে সরকার। তারা পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে জেলা প্রশাসক (ডিসি)সহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ছিলেন। এদের প্রায় সবাই ২০১৮ সালে বিতর্কিত নির্বাচনের সময়ে জেলা প্রশাসক ও রিটার্নিং কর্মকর্তার দায়িত্বে ছিলেন।

সংশ্লিষ্টরা জানান, সরকারি প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে বাইরে থেকে কাউকে নিয়োগ দিতে আইনি কোনো বাধা নেই।

গত ২৩শে জুলাই রাতে আলাদা প্রজ্ঞাপনে ১১টি সরকারি সংস্থা, বোর্ড ও করপোরেশনের শীর্ষ পদে বিএনপি’র নেতাদের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেয় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। গ্রেড-২ পদমর্যাদায় এক বছরের জন্য নিয়োগ পেয়েছেন তারা। বাংলাদেশ বনশিল্প উন্নয়ন করপোরেশনের চেয়ারম্যান পদে বিএনপি’র বন ও পরিবেশবিষয়ক সম্পাদক, রাজশাহীর সাবেক মেয়র মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল; বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন করপোরেশনের (বিআইডব্লিউটিসি) চেয়ারম্যান পদে দলের সহ-ধর্মবিষয়ক সম্পাদক এটিএম আবদুল বারী ড্যানি এবং বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্টের (বিসিসিটি) ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে দলের সহ-বন ও পরিবেশবিষয়ক সম্পাদক কাজী রওনাকুল ইসলাম নিয়োগ পেয়েছেন। বাংলাদেশ তাঁত বোর্ডের চেয়ারম্যান পদে যুবদলের সাবেক কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি জাকির হোসেন ও বাংলাদেশ জুট করপোরেশনের চেয়ারম্যান পদে বিএনপি’র জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য মামুন হাসানকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক করা হয়েছে সালাহ্‌উদ্দিন সরকারকে। তিনি জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের কেন্দ্রীয় কমিটির কার্যকরী সভাপতি। বাংলাদেশ ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে বিএনপি’র আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক মোহাম্মদ রাশেদুল হককে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। জাতীয় সমাজকল্যাণ পরিষদের নির্বাহী সচিব পদে নিয়োগ পেয়েছেন যুবদলের সাবেক কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি মো. কামরুজ্জামান। বাংলাদেশ ইস্পাত ও প্রকৌশল করপোরেশনের চেয়ারম্যান পদে বিএনপি’র রংপুর বিভাগীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক আবদুল খালেক এবং বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্যশিল্প করপোরেশনের চেয়ারম্যান পদে দলের জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য শামসুজ্জামানকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) চেয়ারম্যান পদে নিয়োগ পেয়েছেন বেনজীর আহমেদ। তিনি বিএনপি’র ঢাকা বিভাগীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক। এ ছাড়া, নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের অতিরিক্ত সচিব পদে এক বছরের জন্য দায়িত্ব পেয়েছেন সামসুল আলম। তিনি এর আগে নির্বাচন কমিশন সচিবালয় থেকে অবসরে যান। আমলাদের বাদ দিয়ে কেন বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে রাজনীতিবিদদের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেয়া হচ্ছে। এমন প্রশ্ন করেছেন অনেকে।

আরও পড়ুন:
সংখ্যা রহস্য

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা বলেন, সরকার মনে করছে, প্রশাসনে যে গতি আসার কথা, সেটা আসছে না। তা ছাড়া বর্তমানে আমলাদের মধ্য থেকে এসব গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ দেয়ার মতো বিশ্বস্ত কাউকে পাওয়াও যাচ্ছে না।

অন্যদিকে, পদোন্নতি, দপ্তর পরিবর্তন, অবসর গ্রহণ ও চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ এই চারটি প্রক্রিয়ার সমন্বয়ে ছয় থেকে ১০টি মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও দপ্তরে এই পরিবর্তন আসতে পারে। নতুন মুখ দেখা যেতে পারে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, জনপ্রশাসন, ভূমি, গৃহায়ন ও গণপূর্ত, বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের সচিব পদে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
সূত্র জানায়, গত ২৯শে জুলাই অবসরে গেছেন গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. নজরুল ইসলাম। এখানে নতুন কাউকে দেয়া হতে পারে। অর্থসচিব খায়রুজ্জামান মজুমদার নিয়মিত অবসরে যাচ্ছেন অক্টোবরে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের গুঞ্জন আছে এদের একজনকে এক বছরের জন্য চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেয়া হতে পারে। পাশাপাশি অন্তর্বর্তী সরকারের সময় নিয়োগ পাওয়া প্রথমে রাষ্ট্রপতির সচিব, পরবর্তী সময়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং সর্বশেষ মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সচিব ড. নাসিমুল গনি এবং ১৯৮২ ব্যাচের কর্মকর্তা সর্বশেষ জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন মো. এহছানুল হক। তিনি ২০২৫ সালের ১২ই অক্টোবর জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে যোগ দেন। ড. নাসিমুল গনি ও মো. এহছানুল হকের চুক্তির মেয়াদ শেষ হচ্ছে আগস্টের প্রথম সপ্তাহে। সরকারের গুরুত্বপূর্ণ এই দু’টি পদেও আসতে পারে নতুন মুখ।

জানা গেছে, চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পাওয়া ভূমি সচিব এ এস এম সালেহ আহমেদের চুক্তির মেয়াদ আরও এক বছর বাড়িয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সচিব করা হতে পারে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের নতুন সচিব হিসেবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরী, নির্বাচন কমিশন সচিব আখতার আহমেদ, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সচিব আবদুল খালেক, স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ ও স্বাস্থ্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. কামরুজ্জামান চৌধুরীর নামও ব্যাপক আলোচনায় রয়েছে। এ ছাড়া কয়েকজন অতিরিক্ত সচিব পদোন্নতি পেয়ে সচিব হওয়ার দৌড়ে এগিয়ে আছেন।

এদিকে সরকার এরই মধ্যে মেধাভিত্তিক ও দক্ষ কর্মকর্তাদের উপ-সচিব থেকে যুগ্ম সচিব পদে ১৭৯ জনকে পদোন্নতি দিয়েছে। বিএনপি সরকার গঠন করার পর প্রশাসনে এটিই প্রথম বড় ধরনের পদোন্নতি। তবে এই পদোন্নতি নিয়েও কর্মকর্তাদের মধ্যে কিছু প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মো. আবদুল বারী মানবজমিনকে বলেন, বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর সকল ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং দুর্নীতি মুক্তভাবে কাজ করছে। অবচয় বন্ধ করা হয়েছে। প্রশাসনেও সেভাবে কাজ শুরু হয়েছে। দীর্ঘ ১৭ বছর প্রশাসনে দলীয়করণ করা হয়েছিল। এতে সকল স্তরে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছিল। তা থেকে উদ্ধার করতে হবে। গত পাঁচ মাসে আমাদের প্রশাসন ফাংশনিং করা হয়েছে। দলীয় ব্যক্তিদের নিয়োগ প্রশ্নে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী বলেন, সকল আইন-বিধি বিধান মেনেই যোগ্য লোককে যোগ্য জায়গায় নিয়োগ দেয়া হয়েছে। সততা, দক্ষতাকে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। দলীয়ভাব এখানে কার্যকর নয় বলে তিনি জানান। সবক্ষেত্রে স্বচ্ছতা বজায় রাখা হয়েছে।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন