ঈদানীং সংখ্যাতত্ত্ব নিয়ে ভালো করে লেখাপড়া করতে ইচ্ছা করছে। একসময় এই সংখ্যা নিয়ে খেলা করতাম। ছোটবেলায় শিখেছিলাম কেউ মনে মনে একটি সংখ্যা ধরলে সেটিকে নানা যোগ বিয়োগ করে সে না বললেও আসল সংখ্যাটি বলে দেয়া যেতো। সেই ম্যাজিকের মতো খেলাটি ভুলে গেছি। কিন্তু সংখ্যা নিয়ে এখনো নানারকম জিনিস চোখে পড়ে। পৃথিবীর বড় বড় এয়ারলাইন্সের বিমানে এমনকি বাংলাদেশ বিমানেও ১৩ নং সিট থাকে না।
কারণ ১৩ নম্বরকে অনেকেই অশুভ মনে করে। অনেকে ১৩ নম্বর ফ্ল্যাটে কিংবা ১৩ নম্বর সংশ্লিষ্ট কোনো কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকতেও সংকোচ বোধ করেন। অপরদিকে সাত নম্বরকে অনেকে সৌভাগ্যের প্রতীক বলে মনে করেন। কোনো ধর্মের লোকেরা মাসের কোনো একদিনকে অশুভ মনে করেন। এক নম্বর যে প্রথম সেটা তো বিশ্বময় স্বীকৃত। কোনো নাম্বারের প্রতি যে আমার দুর্বলতা রয়েছে তা কিন্তু নয়। তবে এবারে গাড়ি কেনার সময় কেন যেন মনে হলো সবগুলো নাম্বার একই হলে মনে হয় ভালো হয়। গাড়ি নেয়ার পর দেখলাম নাম্বার প্লেটে চারটি চার। মনে মনে ভাবলাম এটা তো পাঁচটি পাঁচ হলে আরও ভালো হয়। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে সেটাও পেয়ে গেলাম। সিরাজ মানে শাইখ সিরাজকে এই কথা বলতেই সে বললো, তোমার তো এই সংখ্যাপ্রীতি অনেক আগে থেকেই রয়েছে।
আমি বললাম কীভাবে?
শাইখ সিরাজ বললো, খাবার দাবার-এর টেলিফোন নাম্বার ছিল-২৫৫৬১১। যখন সরকার আবার নতুন টেলিফোন লাইন দেয়া শুরু করলো তখন তুমি ওই নাম্বারের কাছাকাছি একটি নাম্বারের জন্য পাগল হয়ে গেলে। এবং অনেককে রিকোয়েস্ট করে নতুন নাম্বার নিয়েছিলে-২৪৪৬১১। নতুন নাম্বারটি শুরু হয়েছিল ২৪ দিয়ে। প্রায় কাছাকাছি দুটো নম্বর। এটা থেকেই বুঝা যায় তোমার সংখ্যাপ্রীতি রয়েছে।
এই নম্বর প্রীতি থেকে আরও মনে পড়ছে-জন্মদিন এলে সকলেই মনে করেন আমার এক বছর বাড়লো। এখন এই বয়সে এসে মনে হচ্ছে আমার এক বছর কমলো। সংখ্যাতত্ত্ব নিয়ে নিচের দিকে তাকালেও মনে হয় আমি তো দেশটাকে ভালোবাসি। বাংলাদেশটাকে ভালোবাসি। আমার জন্ম ফেব্রুয়ারি মাসে। আমার বাবা-মায়ের বিয়ে হয়েছে ১৯৫২ সালে। আবার ১৯৭১ সালে আমার এসএসসি পরীক্ষা দেয়ার কথা ছিল। সেদিন হঠাৎ করে খেয়াল হলো আমার ব্যাংক অ্যাকাউন্ট নাম্বারও বায়ান্ন-একাত্তর। সারাজীবন যে চ্যানেলটিতে কাজ করে গেলাম সেই চ্যানেলের স্লোগানও ‘হৃদয়ে বাংলাদেশ’। অনেকবার ভেবেছি বাংলাদেশকে ছেড়ে কোথাও চলে যাবো। কিন্তু যাওয়া আর হয় কোথায়! বাংলাদেশের মানুষের নানারকম সমস্যা ও কষ্ট রয়েছে। দুঃখ রয়েছে। আবার একই সঙ্গে বুঝি এদেশের মানুষের অনেক ঐতিহ্য ও গর্ব রয়েছে। আমাদের রয়েছে ৫২ সালের মহান ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস। রয়েছে ১৯৭১ সালে আমাদের গর্বের মহান মুক্তিযুদ্ধ। তেমনি আমাদের জাতীয় জীবনে নব্বই এবং ২৪ সংখ্যা দু’টিও গুরুত্বপূর্ণ। আমরা ঈদ বা কোনো ধর্মীয় অনুষ্ঠান উদ্যাপন করি সংখ্যাতত্ত্বের উপর ভিত্তি করে।
সংখ্যাতত্ত্ব ছাড়া কোনো কিছুই হয় না। যার সঙ্গে সম্পৃক্ত এদেশের শিশু থেকে শুরু করে নারী এবং পুরুষেরা। এরা আজীবন সংগ্রামী মানুষ। এরা কঠোর পরিশ্রম যেমনি করতে পারে তেমনি অস্ত্র হাতে যুদ্ধও করতে পারে। যে হাতে লাঙলের ফলায় বিদ্ধ করে মাটিতে ফসল ফলায় সেই হাতে আবার রাইফেল ধরে দেশকে শত্রু মুক্তও করে। তাই দেশ নিয়ে আমাদের এত গর্ব, এত অহংকার। সেই দেশ সংখ্যাতত্ত্বের দিক থেকেই হোক কিংবা ভালোবাসার কারণেই হোক, অথবা এই দেশের ধুলোমাটিতে আমরা বেড়ে উঠেছি সেই কারণেই হোক আমাদের আত্মার সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। কিংবা সেই গানটির কথা-এই দেশের কাছে আমার অনেক ঋণ আছে।
এই ঋণটা শোধ করার জন্যই যার যে অবস্থান রয়েছে সেই অবস্থায় থেকে দেশের উন্নয়নের জন্য চেষ্টা করি। দেশটাকে ভালোবাসার চেষ্টা করি। তাহলে নিশ্চয়ই এই দেশ একদিন মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে। পৃথিবীর মানুষ বলবে বাংলাদেশ এমন একটি দেশ যেখানে শান্তিতে বসবাস করা যায়। তারা বাংলাদেশে এসে বসবাস করতে চাইবে। এদেশের মানুষের ভূমিকার কথা, অনেক পণ্যের কথা আমরা গর্বের সঙ্গে বলতে পারবো। ভবিষ্যতে আরও অনেক পণ্য কিংবা আমাদের ইতিহাস ঐতিহ্যের কথা বিশ্বসভায় আলোচিত হবে। আমাদের প্রাকৃতিক সম্পদ আর সৌন্দর্যের কথা। সুন্দরবন আর কক্সবাজারের সমুদ্র সৈকতের কথা। আর আমরা বুক উঁচু করে গর্বের সঙ্গে বলতে পারবো এই তো আমার দেশ। ভালোবাসার বাংলাদেশ। আর ভালোবাসায় গেয়ে উঠবো ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’।
