তিনদিনের সফরে ঢাকায় এসে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের সঙ্গে বৈঠক করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক বিশেষ দূত সার্জিও গর। বৈঠক শেষে যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ সম্পর্কের ইতিবাচক অগ্রগতির বার্তা দেন এই মার্কিন কূটনীতিক। ওদিকে বাংলাদেশের আঞ্চলিক সম্পর্ক, বিশেষ করে চীন ও ভারতের সঙ্গে ঢাকার সম্পর্ক নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো উদ্বেগের ইঙ্গিত নেই বলে জানান- পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান। বৃহস্পতিবার রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় সার্জিও গরের সঙ্গে প্রায় দেড় ঘণ্টার বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে তার সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির, পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম উপস্থিত ছিলেন। মার্কিন প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন সার্জিও গর।
বৈঠক শেষে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিজের এক্সে প্রতিক্রিয়াও ব্যক্ত করেছেন এই মার্কিন কূটনীতিক। তিনি বলেছেন, ‘আমার প্রথম বাংলাদেশ সফরে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ এবং যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক সুদৃঢ়করণে যৌথভাবে কাজ করার বিষয়ে আলোচনা করতে পেরে আমি আনন্দিত। অনেক ইতিবাচক অগ্রগতি ঘটেছে।’
ওদিকে বৈঠক শেষে সংবাদ সম্মেলনে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান বলেন, দুই দেশের মধ্যে বর্তমানে অত্যন্ত চমৎকার দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক বিদ্যমান। এ সম্পর্ককে আরও কীভাবে এগিয়ে নেয়া যায়, সে বিষয়ে ইতিবাচক আলোচনা হয়েছে। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, গত সপ্তাহে ম্যানিলায় সার্জিও গরের সঙ্গে তার বৈঠক হয়েছিল। একই সফরে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর সঙ্গেও তার সাক্ষাৎ হয়। তিনি বলেন, আমাদের সম্পর্ক এখন অত্যন্ত ইতিবাচক অভিমুখে আছে এবং আগামী দিনগুলোতে আমরা এ পর্যন্ত অর্জিত সাফল্যের ওপর ভিত্তি করে এগিয়ে যাবো।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বৈঠকে বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ই উঠে এসেছে। বাণিজ্য, বিনিয়োগ, জ্বালানি, অভিবাসনসহ বিভিন্ন খাতে সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তবে এটি ছিল সার্বিক অগ্রগতির পথ নিয়ে আলোচনা; নির্দিষ্ট কোনো বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়নি। প্রতিরক্ষা সহযোগিতা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, এ বিষয়ে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ই কথা বলতে পারবে।
জ্বালানি সহযোগিতা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান সমঝোতা স্মারকের আওতায় সহযোগিতা চলমান রয়েছে। তবে গ্যাস অনুসন্ধান বা উৎপাদন অংশীদারিত্ব চুক্তি (পিএসসি) নিয়ে বৈঠকে কোনো আলোচনা হয়নি।
রোহিঙ্গা ইস্যুতে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আন্তর্জাতিক সমপ্রদায়ের কাছ থেকে বাংলাদেশ যে সহায়তা পায়, তার অর্ধেকেরও বেশি আসে যুক্তরাষ্ট্র থেকে। মিয়ানমারের ওপর চাপ প্রয়োগের বিষয়টি বৈঠকে আলোচনা হয়নি। তবে বাংলাদেশ আশা করে, যুক্তরাষ্ট্র তাদের মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখবে এবং সংকট সমাধানে বহুপাক্ষিক উদ্যোগে সহযোগিতা করবে।
তিনি জানান, সফরের দ্বিতীয় দিন শুক্রবার সার্জিও গর কক্সবাজারে রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শনে যাবেন।
বাংলাদেশ-চীন-মিয়ানমার করিডোর নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো মন্তব্য ছিল কিনা- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, তাদের পক্ষ থেকে কোনো কথা নেই। আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং চীন-ভারত প্রসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো উদ্বেগ আছে কিনা- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এ বিষয়ে কোনো আলোচনাই হয় নাই। সুতরাং আমি ধরে নেব, এ বিষয়ে কোনো উদ্বেগ নেই। আওয়ামী লীগ বা তাদের কার্যক্রম নিয়ে কোনো আলোচনা হয়েছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ সম্পর্কে কোনো আলোচনাই হয়নি। সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল নিয়েও কোনো আলোচনা হয়নি বলে জানান তিনি।
র্যাবের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা ও ভিসা নীতির বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, র্যাবের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশ বিভিন্ন পর্যায়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা করে আসছে। তবে এদিনের বৈঠকে বিষয়টি উঠেনি।
বাংলাদেশের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের বোয়িং বিমান কেনার বিষয়টি বৈঠকে উল্লেখ করা হয়েছে বলে জানান পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রকে জানানো হয়েছে যে বাংলাদেশ শুধু রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে নয়, বেসরকারি খাতেও বোয়িং বিমান কিনছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) নিয়ে প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বিশ্ব এখন নতুন প্রযুক্তিগত বাস্তবতার দিকে এগোচ্ছে এবং প্রযুক্তিকে কেন্দ্র করে ভিন্ন ভিন্ন ব্যবস্থা গড়ে উঠছে। নতুন গঠিত ওয়ার্ল্ড এআই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র এখনো পর্যালোচনা করছে। এ বিষয়ে এখনো স্পষ্ট কোনো আন্তর্জাতিক অবস্থান তৈরি হয়নি।
মার্কিন শুল্কনীতি সম্পর্কে প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বিষয়টি নিয়ে অনেকেরই ভুল ধারণা রয়েছে। তিনি ব্যাখ্যা করেন, প্রথমে বাংলাদেশের ওপর ১৯ শতাংশ শুল্ক আরোপের উদ্যোগ নেয়া হলেও যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট সেই আইনি ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন তোলে। পরে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য আইনের ৩০১ ধারার আওতায় নতুন ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়।
তিনি বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশের ওপর ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হয়েছে, যেখানে কয়েকটি প্রতিযোগী দেশ ১২ থেকে সাড়ে ১২ শতাংশ পর্যন্ত শুল্কের মুখে পড়েছে।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরও জানান, যুক্তরাষ্ট্রের তুলা ও ম্যান-মেড ফাইবার ব্যবহার করে বাংলাদেশে তৈরি পোশাকের জন্য একটি ট্যারিফ কোটা সুবিধা দেয়া হয়েছে। এর ফলে বাংলাদেশ আরও বেশি বাজার সুবিধা পাবে। বাংলাদেশ ছাড়াও ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া এবং একটি আসিয়ান দেশ এ সুবিধা পেয়েছে।
ড. খলিলুর রহমান বলেন, আগামী ৮ই সেপ্টেম্বর তিনি জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করবেন। সেই দায়িত্ব পালনের বিষয়েও সার্জিও গরের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে।
তিনি বলেন, জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠায় যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহাসিক ভূমিকা রয়েছে। প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্কলিন ডি. রুজভেল্টের উদ্যোগেই আধুনিক জাতিসংঘের ভিত্তি তৈরি হয়েছিল। ফলে সাধারণ পরিষদের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের আগে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা হওয়া স্বাভাবিক এবং ভবিষ্যতেও এ যোগাযোগ অব্যাহত থাকবে।
তিন দিনের সফরের তৃতীয় ও শেষ দিনে শনিবার সকালে সার্জিও গর-এর সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বৈঠকের কথা রয়েছে। কূটনৈতিক সূত্র বলছে, ওই বৈঠকেও দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক, অর্থনৈতিক সহযোগিতা, আঞ্চলিক পরিস্থিতি এবং পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় গুরুত্ব পেতে পারে।
