ঝুঁকিতে বিশ্ব, এখন বাঁচার উপায় মাত্র একটি!

সিএনএনের বিশ্লেষণ

ঝুঁকিতে বিশ্ব, এখন বাঁচার উপায় মাত্র একটি!

ফন্ট সাইজ:

ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে সামরিক হামলা চালিয়েও তেহরানকে আলোচনার টেবিলে ফেরাতে পারেননি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। সর্বশেষ বুধবার (২৯ জুলাই) নতুন হামলার পরও পরিস্থিতির কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা যায়নি। বরং যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক ও সামরিক বিকল্প ক্রমেই সীমিত হয়ে পড়ছে।

এর আগে ট্রাম্প মধ্যপ্রাচ্যে ঐতিহাসিক শান্তি প্রতিষ্ঠার দাবি করে যে সমঝোতা স্মারক (মেমোরেন্ডাম অব আন্ডারস্ট্যান্ডিং) নিয়ে আশাবাদী ছিলেন, সেটিও শেষ পর্যন্ত ভেঙে পড়ে। ফলে এখন ওয়াশিংটনের সামনে দুটি কঠিন পথই যেন খোলা রয়েছে- একদিকে স্থলযুদ্ধে নেমে শত শত মার্কিন সেনার জীবন ঝুঁকিতে ফেলা, অন্যদিকে হরমুজ প্রণালিতে ইরানের কার্যত নিয়ন্ত্রণ মেনে নেয়া।
বিশ্লেষকদের ভাষায়, যুক্তরাষ্ট্র এখন এমন এক অবস্থায় পৌঁছেছে যেখানে “ভালো কোনো বিকল্প নেই”- এ কথাটি প্রায় ক্লিশে হয়ে উঠেছে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক থিংক ট্যাঙ্ক ডিফেন্স প্রায়োরিটিজের এশিয়া এনগেজমেন্ট বিভাগের পরিচালক লাইল গোল্ডস্টেইন বলেন, আমরা সত্যিই একটি কঠিন সংকটে পড়েছি।

যুদ্ধের প্রভাব ছড়িয়ে পড়ছে বিশ্বজুড়ে
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের প্রভাব কেবল যুদ্ধরত দুই দেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপজুড়ে এর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অভিঘাত বাড়ছে। ফলে আন্তর্জাতিক পক্ষগুলোর ওপর নতুন করে কূটনৈতিক উদ্যোগ নেয়ার চাপও বাড়ছে।

বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথ হরমুজ প্রণালি যদি দীর্ঘ সময় সাধারণ বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য অকার্যকর থাকে, তবে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের সংকট তৈরি হতে পারে। এতে তেলের মজুত কমে আসবে, ডিজেল ও সারসহ তেলনির্ভর পণ্যের দাম বাড়বে এবং আগামী শীতে ইউরোপে তরল প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সংকটও দেখা দিতে পারে।
একই সঙ্গে উপসাগরীয় দেশগুলোকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা পর্যটন ও প্রবাসী বিনিয়োগের পরিবেশও এই যুদ্ধে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ইউরোপের দুর্বল অর্থনীতিগুলোও যুদ্ধজনিত মূল্যস্ফীতির কারণে নতুন চাপের মুখে পড়েছে।

ট্রাম্পের জনপ্রিয়তাও চাপে
যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরেও যুদ্ধের রাজনৈতিক মূল্য দিতে হচ্ছে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে। বুধবার প্রকাশিত সিএনএন/এসএসআরএস জরিপে দেখা গেছে, ইরান নীতি ও জ্বালানির মূল্য নিয়ন্ত্রণে ট্রাম্পের প্রতি জনসমর্থন ৩০ শতাংশেরও নিচে নেমে এসেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এমন পরিস্থিতি আগামী মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের জন্য বড় ধরনের রাজনৈতিক ক্ষতির কারণ হতে পারে। একই সঙ্গে ২০২৪ সালের নির্বাচনে জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর যে প্রতিশ্রুতি দিয়ে ট্রাম্প ভোটারদের সমর্থন পেয়েছিলেন, সেটিও প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে।

সমাধানের পথ কোথায়?
বিশেষজ্ঞদের মতে, শেষ পর্যন্ত কূটনৈতিক সমঝোতার মাধ্যমেই সংঘাতের অবসান সম্ভব। সম্ভাব্য একটি কাঠামোয় যুক্তরাষ্ট্র এমন একটি সমাধান চাইতে পারে যাতে তারা কৌশলগত পরাজয় স্বীকার না করেও সংকট থেকে বেরিয়ে আসতে পারে। অন্যদিকে ইরানও দাবি করতে পারবে যে যুদ্ধের পরও তারা নিজেদের কৌশলগত অবস্থান ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে।
তবে এমন অবস্থানে পৌঁছানো সহজ হবে না। এর জন্য হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ ব্যবস্থাপনা এবং বেসামরিক জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক অংশগ্রহণ প্রয়োজন হবে।

এই সংকটের মধ্যে নতুন একটি ধারণা সামনে এসেছে। প্রস্তাব অনুযায়ী, উপসাগরীয় দেশগুলো- ইরানসহ একটি আন্তর্জাতিক কাঠামোর অধীনে যৌথভাবে হরমুজ প্রণালির ব্যবস্থাপনা ও এর অর্থনৈতিক সুবিধা ভাগাভাগি করতে পারে।
মজার বিষয় হলো, ভেস্তে যাওয়া সমঝোতা স্মারকেও ইরান ও ওমানকে অন্যান্য উপসাগরীয় উপকূলীয় রাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ প্রশাসন ও সামুদ্রিক সেবা নির্ধারণের আহ্বান জানানো হয়েছিল।
এদিকে সম্প্রতি যুক্তরাজ্যের উদ্যোগে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিয়ে একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনের পরিকল্পনা করা হলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। তবে ইউরোপ ও পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর স্বার্থ বিবেচনায় ভবিষ্যতে এ ধরনের উদ্যোগ আবারও সামনে আসতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ওমানের মধ্যস্থতা
বর্তমানে প্রকাশ্যে চলমান একমাত্র কূটনৈতিক উদ্যোগ হলো ইরান ও ওমানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের আলোচনা। সেখানে হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু হলে কীভাবে জাহাজ চলাচল পরিচালিত হবে, তা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে।
জানা গেছে, ইরান যেখানে তেলবাহী জাহাজের ওপর ট্রানজিট ফি আরোপ করতে চায়, সেখানে ওমান আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী প্রণালিতে অবাধ ও নিরাপদ নৌ চলাচলের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। তবে “সামুদ্রিক সেবা ফি” নামে একটি সমঝোতার পথও আলোচনায় রয়েছে।

লন্ডনভিত্তিক বোর্স অ্যান্ড বাজার ফাউন্ডেশন প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে “হরমুজ ফি” ধারণা তুলে ধরা হয়েছে। এটি সরাসরি টোল নয়; বরং উপসাগরীয় উপকূলীয় রাষ্ট্রগুলোর যৌথ ব্যবস্থাপনার জন্য একটি আর্থিক অবদান হিসেবে বিবেচিত হবে।
প্রস্তাবটি মালাক্কা প্রণালির যৌথ ব্যবস্থাপনা মডেলের মতো হতে পারে, যেখানে সিঙ্গাপুর, ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়া অংশ নেয়।

বিশ্লেষণ অনুযায়ী, নেদারল্যান্ডসের রটারডাম বন্দরের মতো প্রতি গ্রস মেট্রিক টনে প্রায় ০.০৮ ডলার হারে ফি নেয়া হলে বছরে প্রায় ২ কোটি ৬০ লাখ ডলার আয় হতে পারে। এমনকি ব্যারেলপ্রতি কয়েক ডলার অতিরিক্ত খরচও বর্তমান অস্থিতিশীল বাজারের তুলনায় গ্রহণযোগ্য হতে পারে, কারণ যুদ্ধের কারণে একদিনেই তেলের দাম প্রায় ৮ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৯০ ডলারের ওপরে উঠে গেছে।

এই বিশ্লেষণের অন্যতম লেখক এসফানদিয়ার বাতমানগেলিজ বলেন, ইরানের জন্য মূল লক্ষ্য শুধু অতিরিক্ত অর্থ আয় নয়। বরং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং তেল রপ্তানির স্বাভাবিক প্রবাহ পুনরুদ্ধারই তাদের বড় স্বার্থ হতে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, অতীতের মার্কিন প্রশাসনগুলো এমন পরিস্থিতিতে ইউরোপীয় মিত্রদের কূটনৈতিক সহায়তা চাইত। ওবামা প্রশাসনের সময় ইরানের পারমাণবিক চুক্তি বাস্তবায়নেও ইউরোপ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্কনীতি, কঠোর ভাষা এবং ইউরোপীয় মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতির কারণে এখন সেই সহযোগিতা পাওয়া কঠিন হয়ে উঠেছে। উপরন্তু, যুক্তরাষ্ট্র হামলা শুরুর আগে অনেক মিত্র দেশের সঙ্গে পরামর্শও করেনি।
জার্মান মার্শাল ফান্ডের ব্রাসেলসভিত্তিক বিশ্লেষক ইয়ান লেসার বলেন, ইউরোপকে কোনো কৌশলে সহায়তা করতে বলা এক বিষয়, কিন্তু বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলটাই স্পষ্ট নয়।

অন্যদিকে এসফানদিয়ার বাতমানগেলিজের মতে, তেহরান ওমানের প্রস্তাব পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করেনি। তবে যুক্তরাষ্ট্র সামরিক অভিযান চালিয়ে যাওয়ার সময় ইরান হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ সহজে ছেড়ে দেবে না।
তার ভাষায়, ইরান শেষ পর্যন্ত প্রণালিকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে পারে। কারণ সেটি তাদেরও স্বার্থে। তবে তারা তখনই তা করবে, যখন তাদের মনে হবে যুক্তরাষ্ট্র প্রয়োজনীয় শিক্ষা পেয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে কোনো সমঝোতা হলেও সেটি কেবল বর্তমান সংকটের একটি অংশের সমাধান করবে। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি উদ্বেগের সমাধান তখনও বাকি থাকবে।

তবে অনেক বিশেষজ্ঞের ধারণা, সামরিক ও রাজনৈতিক বিকল্প সীমিত হয়ে আসায় শেষ পর্যন্ত ওয়াশিংটন ও তেহরান- উভয় পক্ষকেই কোনো না কোনো সমঝোতার পথেই এগোতে হতে পারে। অন্যথায় এই সংঘাতের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক মূল্য শুধু দুই দেশ নয়, গোটা বিশ্বকেই আরও দীর্ঘ সময় ধরে বহন করতে হবে।








কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন