সৌদি আরব এখন এক কঠিন উভয় সংকটে। ২৮শে ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করার পর থেকে সৌদিরা যতটা সম্ভব এই সংঘাতের বাইরে থাকার চেষ্টা করেছে। কিন্তু এখন তিন দিক থেকে হামলার শিকার হওয়ার পর সৌদি আরবের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেছে। চলতি সপ্তাহে তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যৌথভাবে ইরান-সমর্থিত ইরাকি প্রক্সি মিলিশিয়াদের ওপর হামলা চালিয়েছে। রিয়াদের বিশ্বাস, এই গোষ্ঠীগুলোই ড্রোন ব্যবহার করে সৌদি আরবে হামলা চালিয়ে আসছে। এখন সৌদি আরবের সামনে প্রশ্ন- প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পাল্টা হামলা চালিয়ে যাবে, নাকি পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করবে, এমনকি প্রয়োজনে কিছু প্রতিপক্ষকে অর্থ দিয়ে সংঘাত কমানোর পথ বেছে নেবে?
কে কাকে আক্রমণ করছে, কেন?
প্রথমে কিছু প্রেক্ষাপট জানা প্রয়োজন। পাঁচ মাস ধরে উপসাগরীয় অঞ্চল এবং মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য অংশে চলমান সংঘাতে মূলত দুটি পক্ষ রয়েছে। একদিকে রয়েছে ইরান এবং তাদের ইসলামিক রেভ্যুলুশনারি গার্ড করপস (আইআরজিসি)। তাদের মিত্রদের মধ্যে রয়েছে ইয়েমেনের হুতিরা। তারা ২০১৪ সালে দেশটির বড় একটি অংশ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেয়। এ ছাড়া ইরানের সমর্থন রয়েছে ইরাকের পপুলার মোবিলাইজেশন ফোর্সেস-এর প্রতি। অভিযোগ রয়েছে, এই আধাসামরিক বাহিনী সৌদি আরবের ওপর প্রায় ৩০টি ড্রোন হামলা চালিয়েছে এবং এখন তারাই সৌদি-যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা হামলার লক্ষ্যবস্তু। আরও রয়েছে লেবাননের হিজবুল্লাহ। সংগঠনটি এখনো শক্তিশালী হলেও বর্তমানে অপেক্ষাকৃত নীরব অবস্থানে রয়েছে।
অন্যদিকে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। তার শক্তিশালী সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) বাহিনী এবং বিভিন্ন মাত্রায় উপসাগরীয় আরব রাষ্ট্রগুলো ও জর্ডান। ইসরাইল যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র হলেও বর্তমানে ইরাকের সঙ্গে এই যুদ্ধে সরাসরি অংশ নিচ্ছে না। সাম্প্রতিক সময়ে ইরান তাদের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা মূলত জর্ডান, কুয়েত ও বাহরাইনের দিকে কেন্দ্রীভূত করেছে। একই সঙ্গে তারা হরমুজ প্রণালি দিয়ে ইরানের নতুন নিয়ম ও নির্ধারিত রুট এড়িয়ে চলা বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকেও লক্ষ্যবস্তু করছে। ইরাকের মিলিশিয়া এবং ইয়েমেনের হুতিদের সক্রিয় অংশগ্রহণ তুলনামূলক নতুন ঘটনা। এটি দেখাচ্ছে যে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে স্থায়ী শান্তিচুক্তি না হলে এই সংঘাত আরও বিস্তৃত আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নিতে পারে।
কেন যুদ্ধ এড়িয়ে চলতে চাইছে সৌদি আরব?
সৌদি আরবের কার্যত শাসক, তুলনামূলক তরুণ যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান, দেশের জন্য ভিশন ২০৩০ নামে একটি উচ্চাভিলাষী কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছেন। এর লক্ষ্য হলো তেলনির্ভর অর্থনীতি থেকে দেশকে বের করে এনে আধুনিক ও বহুমুখী শিল্প গড়ে তোলা, যাতে প্রতি বছর কর্মবাজারে প্রবেশ করা লাখো শিক্ষিত তরুণ-তরুণীর জন্য অর্থবহ কর্মসংস্থান তৈরি হয়। ভিশন ২০৩০-এর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করা। পাশাপাশি ডাটা সেন্টারের মতো অবকাঠামো গড়ে তোলাও এর অন্তর্ভুক্ত, যেগুলো হামলার ঝুঁকিতে থাকে। কিন্তু ইয়েমেন থেকে হুতিদের ছোড়া ড্রোন কিংবা ইরান থেকে নিক্ষেপ করা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের স্থায়ী হুমকির মধ্যে থাকলে এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা কঠিন হয়ে পড়বে।
২০১৯ সালের সেই বড় সতর্কবার্তা
২০১৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসে সৌদি আরব একটি বড় ধাক্কা খেয়েছিল। তখন ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক খুবই খারাপ ছিল। এক সকালে ঘুম ভেঙে সৌদিরা জানতে পারে, ইরান-সমর্থিত একটি ইরাকি মিলিশিয়া আবকাইক ও খুরাইসে অবস্থিত তাদের দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তেল স্থাপনায় একযোগে ড্রোন হামলা চালিয়েছে। সে সময় কেউ কেউ দাবি করেন, হামলাটি ইয়েমেনের হুতিরা চালিয়েছে। কিন্তু আমি হামলার পরপরই ঘটনাস্থলে গিয়েছিলাম এবং স্পষ্ট দেখেছি যে স্থাপনাগুলোর ওপরের কাঠামোয় যে গর্তগুলো হয়েছে, সেগুলোর মুখ উত্তর দিকে। সেই হামলায় কয়েক দিনের জন্য সৌদি আরবের প্রায় অর্ধেক তেল রপ্তানি বন্ধ হয়ে যায়। একই সঙ্গে এটি রিয়াদকে বুঝিয়ে দেয় যে তাদের গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় অবকাঠামো কতটা ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। গত সোমবার প্রকাশিত স্যাটেলাইট ছবিতেও দেখা গেছে, আবকাইক তেল স্থাপনাটি আবারও ইরান-সমর্থিত ইরাকি মিলিশিয়াদের ড্রোন হামলার শিকার হয়েছে।
তেল এখনো সৌদি অর্থনীতির প্রাণ
তেল এখনো সৌদি অর্থনীতির প্রধান ভিত্তি। ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলার জবাবে ইরান কার্যত হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয়। এটি এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ, যার মাধ্যমে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবাহিত হয়। এর জবাবে সৌদি আরব তাদের পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইনের মাধ্যমে প্রতিদিন প্রায় ৫০ লাখ ব্যারেল তেল লোহিত সাগর উপকূলে ইয়ানবু রপ্তানি টার্মিনালে পাঠাতে শুরু করে। সেখান থেকে ট্যাংকারে করে তেল দক্ষিণে আরব সাগর পেরিয়ে এশিয়ার বিভিন্ন বাজারে পৌঁছে দেয়া হয়। শুরুর দিকে পরিকল্পনাটি সফলই মনে হচ্ছিল।
নতুন করে হুতিদের হুমকি
কিন্তু ১৩ জুলাই সৌদি আরব ইয়েমেনের রাজধানী সানার বাইরে অবস্থিত বিমানবন্দরে বোমা হামলা চালায়। সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেন সরকার দাবি করে, একটি ইরানি বিমানকে সেখানে অবতরণ করতে বাধা দিতেই এই হামলা চালানো হয়েছে। এর জবাবে হুতিরা সৌদি আরবের আভা ও জিজান আঞ্চলিক বিমানবন্দরে হামলা চালায়। তবে রিয়াদের জন্য আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, হুতিরা এখন লোহিত সাগরে সৌদি জাহাজগুলোকেও লক্ষ্যবস্তু করতে শুরু করেছে। ফলে লোহিত সাগরের দক্ষিণ প্রান্তের সংকীর্ণ বাব আল-মান্দেব প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এর ফলে এশিয়ায় সৌদি তেল রপ্তানিও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
ভিশন ২০৩০-এর পরিকল্পনায় ছিল না এমন বাস্তবতা
সৌদি আরব সাত বছর ধরে হুতিদের দমন করতে বোমা হামলা চালিয়েও সফল হয়নি। ইয়েমেনে চলা সেই যুদ্ধ ছিল আমাদের সময়ের সবচেয়ে ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়গুলোর একটি, যার প্রভাব এখনো রয়ে গেছে। ২০২২ সালে সৌদি আরব হুতিদের সঙ্গে একটি নড়বড়ে যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়। এমনও খবর প্রকাশিত হয়েছিল যে, সংঘাত কমাতে কিছু আর্থিক সমঝোতাও হয়েছিল। কিন্তু এখন মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে ধনী দেশ সৌদি আরব আবারও দক্ষিণে ইয়েমেন থেকে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার এবং উত্তরে ইরাক থেকে আসা হামলার দ্বিমুখী হুমকির মুখে দাঁড়িয়ে। ভিশন ২০৩০-এর পরিকল্পনা প্রণয়নের সময় এমন পরিস্থিতির কথা কেউ কল্পনাও করেনি।
(অনলাইন বিবিসি থেকে অনুবাদ)
