যশোর জেলা পুলিশের বিশেষ অভিযানে চট্টগ্রামের শীর্ষ সন্ত্রাসী ডেভিড ইমনসহ ৪ জনকে আটক করেছে পুলিশ। গতকাল ভোর সাড়ে ৪টার দিকে যশোর নড়াইল সড়কের ঝুমঝুমপুর এলাকা থেকে তাদের আটক করা হয়।
আটককৃতরা হলো- চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি থানার কাঞ্চনগর গ্রামের মৃত মোহাম্মদ মুসার ছেলে শীর্ষ সন্ত্রাসী এবং একাধিক হত্যা মামলার পুলিশের মোস্ট ওয়ান্টেড আসামি মোবারক হোসেন ইমন ওরফে ডেভিড (২৫), ঢাকার শ্যামপুর থানার জুরাইন পোস্তগোলা এলাকার টপটেরর জাফর আলীর ছেলে আল ইসলাম আলিফ ওরফে তমাল (২৫) ও কুমিল্লার মনোহরগঞ্জের আব্দুল মান্নানের ছেলে মো. শামীম (২৮) ও নোয়াখালী জেলার সোনাইমুড়ী থানার সাহাপাড়ার মৃত বেলায়েত হোসেনের ছেলে টপটেরর সাফায়েত হোসেন (২৮)। ইমন ছাড়া বাকি ৩ জনই ঢাকার আন্ডার ওয়ার্ল্ডের গডফাদার।
যশোর পুলিশের মুখপাত্র অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) মিরাজুল ইসলাম জানান, গোপন সূত্রে জানতে পারি একটি প্রাইভেটকারে চট্টগ্রামের শীর্ষ সন্ত্রাসী ইমন ওরফে ডেভিড ইমনসহ তার তিন সহযোগী যশোর হয়ে বেনাপোলে যাচ্ছে। পরে চট্টগ্রাম পুলিশের অভিযান অনুযায়ী ভোর সাড়ে ৪টার দিকে ঝুমঝুমপুর এলাকায় যশোর পুলিশের একাধিক টিম অবস্থান নেয়। পরে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের অভিযানপত্র মূলে মোবারক হোসেন ইমন ওরফে ডেভিড (২৫) কে তার তিন সহযোগীসহ আটক করা হয়। তিনি জানান, প্রাথমিকভাবে জানা যায় ইমন তার সহযোগীসহ ভারতে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিল। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ শেষে ইমন ও তার সহযোগীদের আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য চট্টগ্রাম পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এরা যৌথভাবে যাত্রাবাড়ী, পোস্তগোলা, মতিঝিল, শ্যামপুরসহ গোটা অঞ্চলে ত্রাসের রাজস্ব কায়েম করছিল। এসব সন্ত্রাসীরা দেশে বড় ধরনের কোনো নাশকতার পরিকল্পনা নিয়ে বেনাপোল হয়ে ভারতে পাড়ি জমাচ্ছিলো বলে ধারণা করা হচ্ছে।
যেভাবে ‘ডেভিড উত্থান
চট্টগ্রামের অপরাধ জগতের বহুল আলোচিত নাম মোবারক হোসেন ইমন, যিনি ‘ডেভিড ইমন’ নামে পরিচিত। দীর্ঘদিন পলাতক থাকার পর তাকে গ্রেপ্তার করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য থেকে সংঘবদ্ধ সন্ত্রাসী চক্রের অন্যতম সক্রিয় সদস্য হয়ে ওঠার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার কাঞ্চননগরের বাসিন্দা মোবারক হোসেন ইমন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, অল্প বয়সেই কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন তিনি। পরবর্তীতে চট্টগ্রামের পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী বড় সাজ্জাদ গ্রুপে যোগ দিয়ে অপরাধ জগতে নিজের অবস্থান তৈরি করেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই পরিচয় ছাড়িয়ে নিজস্ব বলয় গড়ে তোলেন বলেও দাবি পুলিশের।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর চট্টগ্রামের অপরাধ জগতে ডেভিড ইমনের নাম আরও বেশি আলোচনায় আসে। শুরুতে বড় সাজ্জাদের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে পরিচিত থাকলেও পরে তিনি আলাদা একটি নেটওয়ার্ক গড়ে তোলেন। রাজনীতিবিদ, আবাসন ব্যবসায়ী, ইন্টারনেট ও ডিশ ব্যবসায়ী, গার্মেন্টস মালিক এবং খাতুনগঞ্জের আড়তদারদের কাছে তিনি আতঙ্কের নাম হয়ে ওঠেন। তদন্ত-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দাবি, বিদেশি নম্বর ব্যবহার করে চাঁদা দাবি, চাঁদা না দিলে হামলা, গুলিবর্ষণ, ভাঙচুর এবং ভুক্তভোগীদের পরিবারের সদস্যদের হুমকি দেয়ার মতো নানা কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিলেন তিনি ও তার সহযোগীরা। নগর জুড়ে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ, আলোচিত কয়েকটি হত্যাকাণ্ড এবং সাম্প্রতিক সময়ে ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানে হামলার ঘটনাতেও তার নাম উঠে আসে। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ডেভিড ইমনের বিরুদ্ধে হত্যা, চাঁদাবাজি ও অস্ত্র আইনের মামলাসহ অন্তত সাতটি ফৌজদারি মামলা রয়েছে।
এর আগে গত রোববার রাতে নগরের অক্সিজেন-কুয়াইশ সড়কের ওয়াজেদিয়া এলাকা থেকে বিদেশি একটি পিস্তল ও চার রাউন্ড গুলিসহ ডেভিড ইমনের দুই সহযোগী মো. আসিফ (২৫) ও সাইদুল ইসলাম ওরফে আরিফ (২৪)কে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তাদের মধ্যে আসিফ একটি মামলার পরোয়ানাভুক্ত পলাতক আসামি। চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার (এসপি) মাসুদ আলম বলেন, ‘ডেভিড ইমন ও রায়হানসহ দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী চক্রের সদস্যদের গ্রেপ্তারে জেলা পুলিশের একাধিক টিম কাজ করছে। যশোর থেকে ডেভিড ইমনকে গ্রেপ্তার করতে আমরা সক্ষম হয়েছি। নোয়াখালীতে রায়হানকে গ্রেপ্তারের জন্যও একটি টিম অভিযান চালিয়েছে। তবে অল্পের জন্য সে পালিয়ে গেছে। তাকেও দ্রুত গ্রেপ্তার করা হবে।’ তিনি আরও জানান, ডেভিড ইমনকে গ্রেপ্তার এবং পুরো অভিযানের বিষয়ে বৃহস্পতিবার সংবাদ সম্মেলনে বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরা হবে।
