ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী বলেছেন, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের জন্য তারা ‘অধীর আগ্রহে অপেক্ষা’ করছেন। তিনি আশা প্রকাশ করেন, শিগগিরই এই সফর বাস্তবায়িত হবে। গতকাল মন্ত্রণালয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের সঙ্গে নিজের প্রথম আনুষ্ঠানিক সাক্ষাতের পর সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এসব বলেন ত্রিবেদী। এদিন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদের সঙ্গেও তার সৌজন্য সাক্ষাৎ হয়েছে।
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর বা ব্রিকস সম্মেলনে অংশগ্রহণ প্রসঙ্গে এক প্রশ্নের জবাবে দীনেশ ত্রিবেদী বলেন, এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া সম্পূর্ণভাবে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর এখতিয়ার। তবে আমাদের পক্ষ থেকে বলতে পারি, আমরা বাংলাদেশ সরকারের প্রধানকে ভারতে স্বাগত জানানোর জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছি। আশা করছি, খুব শিগগিরই এই সফরটি বাস্তবায়িত হবে।
সৌজন্য সাক্ষাৎ সম্পর্কে তিনি বলেন, পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান এবং পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলামের সঙ্গে তার অত্যন্ত আন্তরিক পরিবেশে আলোচনা হয়েছে। এক কথায় বৈঠকটি ‘অত্যন্ত চমৎকার’ হয়েছে।
হাইকমিশনার বলেন, ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্ক ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক এবং খেলাধুলাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে গভীর। বৈঠকে এসব বিষয় নিয়ে খোলামেলা আলোচনা হয়েছে। তিনি বলেন, আমি এখান থেকে অত্যন্ত আনন্দিত ও কৃতজ্ঞ মনে ফিরে যাচ্ছি। মাননীয় মন্ত্রীগণ আমাকে যে সময় ও সম্মান দিয়েছেন, তার জন্য ধন্যবাদ। ভারত বাংলাদেশিদের জন্য ভিসা সেবা পুনরায় চালু করেছে উল্লেখ করে হাইকমিশনার বলেন, এর মাধ্যমে দুই দেশের মানুষই উপকৃত হবেন।
তিস্তা চুক্তি ও গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে হাইকমিশনার বলেন, এদিনের সাক্ষাৎটি মূলত সৌজন্যমূলক ছিল। তবে পারস্পরিক বোঝাপড়া থাকলে এমন কোনো সমস্যা নেই, যা সমাধান করা সম্ভব নয়। দিনশেষে সাধারণ মানুষের কল্যাণই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি আরও বলেন, পানি-সংক্রান্ত বিষয়ে ভারত ও বাংলাদেশের যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপ কাজ করছে এবং তারা নিজেদের মধ্যে আলোচনা চালিয়ে যাবে। এসব বিষয়ে ইতিবাচক অগ্রগতি হবে বলেও তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
সবশেষে দীনেশ ত্রিবেদী বলেন, ভারত ও বাংলাদেশ শুধু সীমান্ত নয়, ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং ভবিষ্যতের স্বপ্নও ভাগাভাগি করে। এ সম্পর্কের ভিত্তি দুই দেশের মানুষের কল্যাণ। তিনি এটিকে একটি সূচনা উল্লেখ করে ভবিষ্যতে আরও নিবিড়ভাবে একসঙ্গে কাজ করার আশা প্রকাশ করেন।
উল্লেখ্য, আগামী ১২ ও ১৩ই সেপ্টেম্বর ভারতের নয়াদিল্লিতে ব্রিকসের ১৮তম শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে। ব্রিকসের সদস্য না হলেও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে বিশেষ অতিথি হিসেবে সম্মেলনে অংশ নেয়ার আমন্ত্রণ জানিয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি।
এক সম্পর্ক ভেঙে আরেক সম্পর্ক নয়, স্বার্থের ভিত্তিতে এগোবে ঢাকা: ওদিকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান বলেছেন, একজনের সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট করে আরেকজনের সঙ্গে সম্পর্ক বৃদ্ধি করা বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির অংশ নয়। জাতীয় স্বার্থকে অক্ষুণ্ন রেখে বিশ্বের সকল দেশের সঙ্গে সম্পর্ক আরও জোরদার করাই সরকারের লক্ষ্য। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর সঙ্গে বৈঠকের পর সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এসব কথা বলেন। বৈঠকে পারস্পরিক স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক আরও এগিয়ে নেয়ার বিষয়ে উভয় পক্ষ গুরুত্ব আরোপ করে।
চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের ঘনিষ্ঠতা নিয়ে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগের বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, কূটনীতিতে আমরা আন্দাজের ভিত্তিতে কাজ করি না। আমরা বাস্তবতার ভিত্তিতে কাজ করি। সোশ্যাল মিডিয়ার ওপর নির্ভর করে পররাষ্ট্রনীতি পরিচালিত হয় না।
তিনি বলেন, কোনো দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক অন্য কোনো দেশের পরিপ্রেক্ষিতে ‘জিরো-সাম গেম’ নয়। একজনের সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট করে আরেকজনের সঙ্গে সম্পর্ক বৃদ্ধি করার নীতি বাংলাদেশ অনুসরণ করে না। এক্ষেত্রে নিজস্ব স্বার্থকে অক্ষুণ্ন রেখে এবং সেই স্বার্থকে এগিয়ে নিতে সব দেশের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা করা হচ্ছে।
খলিলুর রহমান বলেন, কারও সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন হওয়ার অর্থ এই নয় যে, অন্য কারও সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি হচ্ছে। চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক সফর অত্যন্ত সফল হয়েছে। ভবিষ্যতে প্রধানমন্ত্রী ভারত সফরে গেলে সেই সফরও ইতিবাচক হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। একইভাবে যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্টের প্রতিনিধিদের সঙ্গেও তার বৈঠক হয়েছে এবং এসব মতবিনিময়ের মাধ্যমে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও এগিয়ে নেয়ার প্রচেষ্টা চলছে।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের সঙ্গে শুধু একটি দেশের নয়, বহু দেশের সম্পর্ক রয়েছে। এসব সম্পর্কের ভিত্তি হচ্ছে জাতীয় স্বার্থ। যেখানে বাংলাদেশের স্বার্থ থাকবে, সেখানেই দেশ এগিয়ে যাবে।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতেই ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক আরও এগিয়ে নেয়া হবে। অভিন্ন স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ অব্যাহত রাখা এবং বিদ্যমান সহযোগিতা আরও জোরদারের বিষয়ে উভয় পক্ষ একমত হয়েছে।
