বিএনপি, যুবদল, ছাত্রদল ও জাতীয় নাগরিক পার্টি এনসিপি’র পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি ঘিরে দিনভর উত্তাপ ছিল হবিগঞ্জে। দুইপক্ষের কর্মসূচি থাকায় পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে পৌর শহরে ১৪৪ ধারা জারি করে প্রশাসন। সভা-সমাবেশে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও এনসিপি নেতারা মৌলভীবাজারের কর্মসূচি স্থগিত করে হবিগঞ্জের উদ্দেশ্যে রওনা হলে উত্তেজনা বাড়ে। পথে দফায় দফায় তাদের গতিরোধ করে পুলিশ। দুইদফা বাধা পেরিয়ে সন্ধ্যায় হবিগঞ্জ জেলার বাহুবল উপজেলার কামাইছড়া এলাকায় পৌঁছালে এনসিপি নেতাদের গতিরোধ করে পুলিশ। সেখানে বিএনপি’র স্থানীয় নেতাকর্মীরাও উপস্থিত হয়ে বিভিন্ন স্লোগান দেন। পুলিশ এনসিপি নেতাদের কামাইছড়ায় আটকে দিলে তারা বাকবিতণ্ডায় জড়ান। একপর্যায়ে এনসিপি আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম, মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী ও উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম ও দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আব্দুল্লাহকে অভিযোগ জমা দিতে কামাইছড়া পুলিশ ফাঁড়িতে যেতে বলা হয়। সন্ধ্যার পর জেলা পুলিশ সুপারের উপস্থিতিতে তারা মঙ্গলবারের হামলার ঘটনার বিষয়ে অভিযোগ দায়ের করেন।
মঙ্গলবারের হামলার ঘটনায় হবিগঞ্জে এনসিপি’র পক্ষ থেকে প্রতিবাদ-সমাবেশ করার ঘোষণা দিলে উত্তেজনাকর পরিস্থিতি তৈরি হয়। তাদের সমাবেশের বিপরীতে যুবদল ও ছাত্রদল সমাবেশ করার ঘোষণা দেয়। অনাকাক্সিক্ষত পরিস্থিতি এড়াতে পৌর শহরে ১৪৪ ধারা জারি করে প্রশাসন। আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে মোতায়েন করা হয় ৩ প্লাটুন বিজিবি ও অতিরিক্ত পুলিশ। এদিকে বুধবার বিকালে প্রতিবাদ সমাবেশে যোগ দিতে এনসিপি’র কেন্দ্রীয় নেতারা হবিগঞ্জে প্রবেশের চেষ্টা করলে মৌলভীবাজার-হবিগঞ্জ সীমান্তের সাতগাঁও এলাকায় তাদের গাড়িবহর আটকে দেয় পুলিশ। সেখানে দফায় দফায় বাকবিতণ্ডা হয় পুলিশের সঙ্গে। পুলিশ পথরোধ করায় নেতারা বৃষ্টির মধ্যেই সড়কে বসে প্রতিবাদ শুরু করেন। সেখানে সড়কে খালি ট্রাক, ট্রাক্টর আড়াআড়ি রেখে পথ আটকে দিতে দেখা যায়। একপর্যায়ে ব্যারিকেড ভেঙে এনসিপি’র নেতাকর্মীরা হবিগঞ্জের সীমানায় প্রবেশ করলে বাহুবলের আমতলী এলাকায় পুলিশ আবারও ব্যারিকেড দেয়। এ সময় নাহিদ ইসলাম, হাসনাত আবদুল্লাহ, নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, ডা. মাহমুদা মিতুসহ কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে পুলিশের বাকবিতণ্ডা ও ধস্তাধস্তি হয়। ঘটনাস্থলে পুলিশ জানায়, আইনশৃক্সঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে নেতাদের হবিগঞ্জে যাওয়ার সুযোগ নেই। একপর্যায়ে ঘটনাস্থলের পাশে কামাইছড়া পুলিশ ফাঁড়িতে অভিযোগ জমা দেয়ার প্রস্তাব দেয় পুলিশ। সেখানে জেলা পুলিশ সুপারের উপস্থিতিতে এনসিপি নেতারা অভিযোগ জমা দেন।
হবিগঞ্জ শহরে কর্মসূচিতে মঙ্গলবার হামলার পর বুধবার মৌলভীবাজারের নির্ধারিত দু’টি পদযাত্রা স্থগিত করে হবিগঞ্জে বিক্ষোভ কর্মসূচি ঘোষণা করে এনসিপি। এতে কেন্দ্রীয় নেতাদের অংশ নেয়ার কথা ছিল। অন্যদিকে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে নিয়ে ‘মিথ্যাচারের’ অভিযোগ তুলে বিক্ষোভ কর্মসূচি ঘোষণা করে জেলা ছাত্রদল, যুবদল ও পৌর বিএনপি। জেলা ছাত্রদলের সভাপতি শাহ রাজিব আহমেদ রিংগন, জেলা যুবদলের আহ্বায়ক জালাল আহমেদ এবং সদস্য সচিব শফিকুর রহমান সিতু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কর্মসূচির ঘোষণা দেন। একই ধরনের কর্মসূচি দেয় পৌর বিএনপিও। এ সময় নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের কয়েকজন নেতাকর্মীকেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন পোস্ট দিতে দেখা যায়। দু’পক্ষের পাল্টাপাল্টি কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ায় জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ড. জিএম সরফরাজ পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত হবিগঞ্জ পৌর এলাকায় ১৪৪ ধারা জারি করেন। বুধবার সকাল থেকেই টাউন হল, জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, সদর মডেল থানা, আদালত এলাকা, টাউন হল রোড, চৌধুরীবাজার, কালীবাড়ী রোড, রাজনগর ও শায়েস্তানগরসহ গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় শতাধিক পুলিশ সদস্যকে দায়িত্ব পালন করতে দেখা যায়।
এদিকে, হামলায় আহতদের মধ্যে জেলা এনসিপি’র সদস্য সচিব মাহবুবুল বারী চৌধুরী মুবিন হাত ভাঙা অবস্থায় সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। চোখে গুরুতর আঘাত পাওয়া কর্মী আলিফ আহমেদকে সিলেট থেকে এয়ার এম্বুলেন্সে রাজধানীর জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
হবিগঞ্জের পুলিশ সুপার তারেক মাহমুদ বলেন, এনসিপি’র কর্মসূচিকে ঘিরে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছিল। তারপরও হামলার ঘটনা অনাকাক্সিক্ষত। পুলিশ প্রাণপণ চেষ্টায় কেন্দ্রীয় নেতাদের উদ্ধার করে নিরাপদে মৌলভীবাজারে পাঠিয়েছে। ভিডিও ফুটেজ সংগ্রহ করা হয়েছে। অপরাধীদের শনাক্ত করে অভিযোগ পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে। যাতে আর কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে, সে জন্য পুলিশ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। এদিকে, পাল্টাপাল্টি কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে ১৪৪ ধারা জারির পরও উত্তেজনা অব্যাহত থাকায় তিন প্লাটুন বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) মোতায়েন করা হয়েছে। বুধবার বিকাল সাড়ে ৪টা থেকে বিজিবি সদস্যরা জেলা সদরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় টহল শুরু করেন। পাশাপাশি পুলিশের সদস্যরাও গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে দায়িত্ব পালন করেন।
৫৫ বিজিবি’র অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল তানজিলুর রহমান বলেন, ‘১৪৪ ধারা কার্যকর থাকা এলাকায় জনগণের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিজিবি ড্রোনের মাধ্যমে মাইকিং করছে। সংঘাতপ্রবণ এলাকাগুলোতে অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে দায়িত্ব পালন করছে বিজিবি।’
মৌলভীবাজারের সমাবেশ স্থগিত
পূর্ব নির্ধারিত সমাবেশ স্থগিত করে মৌলভীবাজার ছাড়েন জাতীয় নাগরিক পার্টি’র (এনসিপি) কেন্দ্রীয় নেতারা। গতকাল বিকাল ৩টায় জেলার কুলাউড়া উপজেলার ডাক বাংলো মাঠে ও বিকাল ৬টায় রাজনগর উপজেলার মুন্সিবাজার ইউনিয়নের খলাগাঁও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে জুলাই পদযাত্রা কর্মসূচি পালনের ব্যাপক প্রস্তুতি ছিল। কর্মসূচি সফল করতে জেলা ও উপজেলা দলের নেতাকর্মীদের পক্ষ থেকে চালানো হয়েছিল প্রচারণাও। মঙ্গলবার হবিগঞ্জের হামলার ঘটনায় জুলাই পদযাত্রা কর্মসূচির সমাবেশ স্থগিত করে এনসিপি নেতৃবৃন্দ হবিগঞ্জের উদ্দেশ্যে মৌলভীবাজার ত্যাগ করেন। এনসিপি’র নেতৃবৃন্দ মৌলভীবাজার অবস্থান থাকাকালে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি।
তবে মৌলভীবাজার ছেড়ে শ্রীমঙ্গল শহর অতিক্রম করার পরই পুলিশি ব্যারিকেড দিয়ে এবং রাস্তায় এলোপাতাড়ি গাড়ি রেখে তাদের গতিরোধ করে পুলিশ। কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে পুলিশ এনসিপি নেতাকর্মীদের অগ্রযাত্রা থামাতে গেলে উভয়পক্ষের মধ্যে উত্তেজনাকর পরিস্থিতি ও বাকবিতণ্ডার সৃষ্টি হয়।
শ্রীমঙ্গল-ঢাকা আঞ্চলিক মহাসড়কের চা কন্যা ভাস্কর্য এলাকায় এই ঘটনা ঘটে। এ সময় এনসিপি কেন্দ্রীয় নেতা ও স্থানীয় নেতাকর্মীরা বৃষ্টি অপেক্ষা করে রাস্তায় বসে পড়েন। পুলিশের সঙ্গে বাকবিতণ্ডার একপর্যায়ে সন্ধ্যা ৬টার দিকে তারা ব্যারিকেড ভেঙ্গে হবিগঞ্জের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন।
