আনোয়ারা বেগম। বাড়ি টাঙ্গাইলের মির্জাপুর হলেও স্বামীসহ চার ছেলে-মেয়েকে নিয়ে থাকেন মিরপুরে। ভ্যানচালক স্বামীর উপার্জনে সংসার না চলায় মানুষের বাসাবাড়িতে গৃহকর্মীর কাজ করেন তিনি। মঙ্গলবার সকালে তিনিও গিয়েছিলেন মিরপুর দুই নম্বরে টিসিবি’র গাড়িতে কম টাকায় পণ্য কিনতে। কিন্তু পণ্য তো পায়ওনি উল্টো পায়ে রড নিয়ে পঙ্গু হাসপাতালের চারতলার জিএইচ ওয়ার্ডের ৫৩ বেডে শুয়ে কাতরাচ্ছেন। আনোয়ারার মতো আহত আরও ৫ নারী রাজধানীর পঙ্গু হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন। এ ছাড়া এ ঘটনায় রাতে আরও এক নারী মৃত্যু বরণ করায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে তিনে। এদিকে আহতদের দেখতে গিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুল ফ্রি চিকিৎসার ঘোষণা দিলেও সংসারের খরচ নিয়ে চিন্তিত এসব নিম্নআয়ের নারী।
গতকাল পঙ্গু হাসপাতালে গিয়ে কথা হয় আহত আনোয়ারা বেগমের সঙ্গে। তিনি বলেন, স্বামীর তেমন কোনো কাজ নেই। ছোট ছেলে মোবাইলের দোকানে থাকে। মেয়ে দুইটা লেখাপড়া করে। আর আমি একটা বাসায় কাজ করে ৬ হাজার টাকা পাই। এসব দিয়েই কোনোমতে সংসারটা চালায়। তাই সপ্তাহে দু’দিন টিসিবি’র গাড়ি এলে একটু চেষ্টায় থাকি কম টাকায় পণ্য নিতে। তিনি বলেন, মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে আমি প্রথম ওই টিসিবি’র লাইনে দাঁড়াই। তখন মাত্র গাড়ি আসছে। মাল (পণ্য) দেয়া শুরু হয়নি। যারা লাইনে তাদের হাতে নম্বর দেয়া হচ্ছিল। আমার হাতে এখনো সেই নম্বর লেখা রয়েছে। ২৮। বেশ কয়েকজনের পেছনে। তাই আমি ভাবলাম একটু কাজ সেরে আসি। কাজ শেষে আমি আবারো লাইনে গিয়ে দাঁড়ায়। আমি ঠিক ট্রাকটার পেছনে ছিলাম।
আমার দেরি হওয়ায় ওরা (টিসিবি’র দায়িত্বে থাকা লোক) আমাকে পণ্য দিচ্ছিল না। তারপরও আমি ট্রাকের পাশে একটা গাছে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলাম। এর মধ্যেই হঠাৎ বিকট শব্দে দেয়াল ভেঙে আমাদের সকলের গায়ের উপর এসে পড়লো। সবাই দেখি তখন দৌড়াদৌড়ি করছে। কয়েকজন দেখি দেয়ালের ইটের নিচে চাপা পড়েছে। আর বড় একটা ইটের স্তূপ আমার ডান পায়ের উপর পড়ে। বাকিটা ট্রাক আর ওই গাছের জন্য আমার গায়ে পড়েনি। ইটগুলো এতটাই ভারী ছিল যে আমি সেগুলোকে সরাতে পারছিলাম না। মুহূর্তেই চারদিকে ধোঁয়ার মতো হয়ে গেল। এ সময় একটা লোক আমার গায়ের উপর থেকে ইটের স্তূপ সরিয়ে আমাকে ওঠায়।
পরে একটা রিকশায় করে ওই লোকটা আমার বাসার সামনে নিয়ে গেল। সিঁড়ি বেয়ে পাঁচতলায় উঠে আমার মেয়েকে ডেকে আনে। পরে সকলে মিলে আমাকে পঙ্গু হাসপাতালে নিয়ে আসে। এখানে আসার পর আমার পায়ে একটা অপারেশন করা হয়েছে। বর্তমানে পুরো পায়ে স্টিলের রড লাগানো। কিছুদিন আবার অপারেশন করা লাগবে। এরপর যে আর কতোদিন আমাকে হাসপাতালে থাকা লাগবে তার ঠিক নেই। তিনি বলেন, আমরা তো গরিব মানুষ। এখন আমরা কি করবো, কোথায় যাবো কিছুই বুঝতে পারছি না।
আনোয়ারা বেগমের পাশেই জিএইচ-৫১ নম্বর বেডে শুয়ে কাতরাচ্ছেন সুফিয়া বেগম। তিনিও টিসিবি’র পণ্য কিনতে গিয়ে মিরপুর কলেজের ধসে পড়া দেয়ালে আহত হয়েছেন। তিনি বলেন, যেখানে টিসিবি’র পণ্য দেয়া হচ্ছিল তার পেছনেই মিরপুর কেন্দ্রীয় মন্দিরের পাশেই আমাদের বাসা। আমার দুই মেয়ে, এক ছেলে। বড় মেয়েটার বিয়ে হলেও আরেকটার বয়স পাঁচ বছর। ছেলেটার বয়স ১১, পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ে। আমার স্বামী পেশায় গাড়িচালক। একটু বেশি পাওয়ার আশায় আমরা দু’জনেই মঙ্গলবার টিসিবি’র লাইনে পণ্য নিতে দাঁড়িয়েছিলাম। আমি ছিলাম মেয়েদের লাইনে আর আমার স্বামী ছিল ছেলেদের পাশে। বেলা তখন ১টা হবে। সামনে থেকে অনেকেই পণ্য নিয়ে চলে গেছে। আমরা ছিলাম মাঝামাঝি। এরই মধ্যে দেয়ালটা পড়লো আমাদের গায়ের ওপর। আমি একজনের গায়ে ধাক্কা খেয়ে পড়ে যায়। দেয়ালটা আমার পিঠের ওপর কোমর বরাবর পড়ে। কোনোভাবেই আমি উঠতে পারছিলাম না। পরে সকলে ধরাধরি করে হাসপাতালে নিয়ে আসে।
এদিকে একই ওয়ার্ডের জিএইচ-৫৮ নম্বর বেডে শুয়ে চিকিৎসা নিচ্ছেন মিরপুরে দেয়াল ধসে আহত হওয়া সত্তরোর্ধ্ব সাহেরা খাতুন। ধামরাই থেকে মেয়ে আনোয়ারাকে সঙ্গে নিয়ে তিনি চিকিৎসা নিতে এসেছিলেন মিরপুরে। মিরপুর ১২ নম্বরে ভাইয়ের বাসায় কাজ শেষে দুই নম্বর হয়ে মিরপুর-১ এ এক আত্মীয়ের বাসায় যাচ্ছিলেন। এরই মধ্যে ওই দেয়াল ধসে তার গায়ের ওপর পড়ে। পরে আশপাশের লোকের সহায়তায় তাকেও নিয়ে আসা হয়।
জিএইচ-৪৫ নম্বর বেডে চিকিৎসা নিচ্ছেন মিরপুর-২ নম্বর এলাকার তানিয়া বেগম। মিরপুর বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের দেয়াল পড়ে তারও ডান পায়ের উরু, হাঁটুর নিচে, কোমরসহ একাধিক জায়গার হাড় ভেঙেছে। কবে নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারবেন তা নিয়েই দুশ্চিন্তায় ডুবে রয়েছেন তিনি। তানিয়া বলেন, আমার বাসা ২ নম্বরের নূরানী মসজিদের পাশে। মঙ্গলবার আমি বাসাতেই ছিলাম। হঠাৎ আমার এক ভাবী আমাকে ফোন দিয়ে বললো টিসিবি’র গাড়ি আসছে, চাল আর আটা নিয়ে আসি। আমিও তার ফোন পেয়ে চলে আসি। এর মধ্যেই এত সব হয়ে গেল।
তানিয়াকে সেদিন ফোন করে ডেকে নিয়ে যাওয়া ভাবী খালেদা আক্তারও বাম পায়ে ব্যান্ডেজ নিয়ে তানিয়ার পাশেই জিএইচ-৪৪ নম্বর বেডে শুয়ে চিকিৎসা নিচ্ছেন। তিনি বলেন, কীসের থেকে যে কী হয়ে গেল কিছুই বুঝতে পারছি না। তিনি অভিযোগ করে বলেন, ওই দেয়াল আগে থেকেই ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। ফাটা ছিল। এরপরও কলেজ কর্তৃপক্ষ কোনো ধরনের সতর্কতামূলক নির্দেশনা টাঙ্গায়নি। মঙ্গলবার না হলেও যেকোনো দিন এই দেয়ালটা ধসে পড়তো। ব্যস্ততম মূল রাস্তার পাশের ফুটপাথের এই দেয়াল ঝুঁকিপূর্ণ জানার পরও ব্যবস্থা না নেয়ায় এই দুর্ঘটনা ঘটেছে।
