ইসলামী ব্যাংকের শেয়ার কেলেঙ্কারি সংক্রান্ত মামলার শুনানিতে বিব্রতবোধ করেছেন হাইকোর্ট। মামলার নথি পাঠানো হয়েছে প্রধান বিচারপতির কাছে। বুধবার হাইকোর্টের বিচারপতি মুজিবুর রহমান মিয়া ও বিচারপতি রেজাউল করিমের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চের একজন বিচারপতি বিব্রতবোধ করেন। বিষয়টি নিশ্চিত করে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী জায়েদ
বিন আমজাদ মানবজমিনকে বলেন, এই মামলায় আমরা শুনানির জন্য প্রস্তুতি নিয়ে গেলেও কোর্ট এটি শুনতে বিব্রতবোধ করায় মামলাটির শুনানি হয়নি। এখন প্রধান বিচারপতি একটি নতুন বেঞ্চ নির্ধারণ করবেন এবং সেই বেঞ্চে রুলের উপর আবার নতুন করে শুনানি হবে।
গতকাল এই মামলার সংশ্লিষ্ট আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির প্রেস ব্রিফিংয়ে বলেন, এস আলমের নেতৃত্বে ২৪টি কোম্পানি তৈরি করে ইসলামী ব্যাংকের ৮১ দশমিক ৯২ শতাংশ শেয়ার দখল ও লুটপাটের অভিযোগে দায়ের করা মামলাটি হাইকোর্ট বিভাগে শুনানির জন্য আসে। টানা দু’দিন শুনানি হওয়ার পর তৃতীয় দিন (বুধবার) সকালে সংশ্লিষ্ট ডিভিশন বেঞ্চের জুনিয়র বিচারপতি এই মামলা শুনতে বিব্রতবোধ করেন। ফলে মামলাটি প্রধান বিচারপতির দপ্তরে পাঠানো হয়েছে। এখন প্রধান বিচারপতি সিদ্ধান্ত নেবেন, পরবর্তী শুনানি কোন বেঞ্চে হবে। আমাদের মতে, এ ধরনের প্রবণতা মোটেও ইতিবাচক নয়।
শিশির মনির আরও বলেন, একটি মামলার দু’দিন শুনানি হওয়ার পর তৃতীয় দিনে এসে যদি কোনো বিচারপতি বিব্রতবোধ করে শুনানি থেকে সরে দাঁড়ান, বিশেষ করে ইসলামী ব্যাংকের কেলেঙ্কারি-সংক্রান্ত এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ মামলায়, তাহলে তা বিচার বিভাগের জন্যও ভালো নজির সৃষ্টি করে না। সরকার, বাংলাদেশ ব্যাংকসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের প্রতি আমাদের আহ্বান বিচার বিভাগ যেন স্বাধীনভাবে ও সুষ্ঠুভাবে কাজ করতে পারে, সে পরিবেশ নিশ্চিত করুন। অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিন। আইন, আদালত ও বিচার প্রক্রিয়াকে নিজের ইচ্ছামতো পরিচালিত বা প্রভাবিত করার চেষ্টা করবেন না। ইতিহাস বলে, এমন প্রচেষ্টা শেষ পর্যন্ত কারও জন্যই কল্যাণকর হয় না। এ ঘটনাকে সংশ্লিষ্ট সবার জন্য একটি সতর্কবার্তা ও শিক্ষা হিসেবে দেখা উচিত। কেউ যেন পরিস্থিতিকে অস্থিতিশীল বা উত্তপ্ত করার চেষ্টা না করেন। বিচার বিভাগকে ব্যবহার করে কিংবা বিচার বিভাগের উপর চাপ সৃষ্টি করে উদ্দেশ্য হাসিলের যে প্রবণতা- তা কখনোই ভালো ফল বয়ে আনে না। আমি আশা করি, সবাই এ বিষয়ে সতর্ক হবেন। অন্যথায়, প্রত্যেককেই নিজ নিজ কর্মকাণ্ডের পরিণতি ভোগ করতে হবে।
কেন তিনি বিব্রতবোধ করেছেন- এমন প্রশ্নের জবাবে বলেন, এই প্রশ্নের উত্তর সংশ্লিষ্ট বিচারপতিই ভালো দিতে পারবেন। তবে এটুকু বলতে পারি, এই মামলার দু’দিন শুনানি হয়েছে। আমরাও পক্ষভুক্তির আবেদন করেছিলাম এবং সেই আবেদন মঞ্জুর হয়েছে। দু’দিন নিয়মিত শুনানি হয়েছে। বুধবার বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে বক্তব্য উপস্থাপনের কথা ছিল। আমরাও আমাদের যুক্তি উপস্থাপনের জন্য প্রস্তুত ছিলাম। কিন্তু দুই বিচারপতির বেঞ্চে যিনি জুনিয়র বিচারপতি, তিনি এই মামলা শুনতে বিব্রতবোধ করেছেন।
এর আগে ইসলামী ব্যাংকের শেয়ার জালিয়াতি, অর্থ আত্মসাৎ এবং এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার ঘটনায় সাবেক প্রেসিডেন্ট মো. সাহাবুদ্দিনের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ নতুন করে আলোচনায় আসে। হাইকোর্টে দাখিল করা তদন্ত প্রতিবেদনে জেএমসি বিল্ডার্সের মাধ্যমে ব্যাংকের শেয়ার নিয়ন্ত্রণ এবং এস আলম গ্রুপের স্বার্থ রক্ষায় তার ভূমিকার অভিযোগ উঠে এসেছে বলে দাবি করা হয়েছে। তদন্ত-সংশ্লিষ্ট তথ্যে বলা হয়, ২০১৭ সালে সরকারের প্রত্যক্ষ মদতে এস আলম গ্রুপ ব্যাংক কোম্পানি আইনের একাধিক বিধান লঙ্ঘন করে ইসলামী ব্যাংকের প্রায় ৮২ শতাংশ শেয়ারের নিয়ন্ত্রণ নেয়। ওই সময় জেএমসি বিল্ডার্সের প্রতিনিধি হিসেবে মো. সাহাবুদ্দিনকে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। পরে তিনি ব্যাংকটির ভাইস চেয়ারম্যানের দায়িত্বও পালন করেন। প্রেসিডেন্ট হওয়ার আগে তিনি ওই পদ থেকে সরে দাঁড়ান। ২০২৪ সালের ৫ই আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর হাইকোর্টের নির্দেশে ইসলামী ব্যাংকের শেয়ার কেলেঙ্কারির বিষয়ে তদন্ত শুরু করে বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থা (বিএফআইইউ)। এ বিষয়ে হাইকোর্টে প্রতিবেদন দাখিল করেছে বিএফআইইউ।
