প্রাণ ফিরেছে আদ্‌-দ্বীন হাসপাতালে

প্রাণ ফিরেছে আদ্‌-দ্বীন হাসপাতালে

ফন্ট সাইজ:

দীর্ঘ দেড় মাস পর পুনরায় স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম চালু করেছে রাজধানীর মগবাজারের আদ্‌-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় বাতিল হয়েছিল হাসপাতালটির লাইসেন্স। সোমবার বিকালে শর্তসাপেক্ষে হাসপাতালের লাইসেন্স ফেরত দিয়ে স্বাস্থ্যসেবা চালুর অনুমতি দেয় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। এ খবর শোনার পর সন্ধ্যা থেকেই আসতে শুরু করে রোগীরা। গতকাল সকাল ৮টা থেকে পুরোদমে শুরু হয় হাসপাতালটির কার্যক্রম। প্রথম দিনেই সরগরম ছিল রোগীদের চিকিৎসাসেবা কার্যক্রম। সকাল থেকেই ছিল রোগীদের চাপ। দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে চিকিৎসা নিতে আসেন রোগীরা। উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা দূর হয়ে ব্যস্ত সময় পার করেছেন হাসপাতালটির স্টাফরা। এ ছাড়া কাজে ফেরার সুযোগ পেয়ে উৎফুল্ল মেডিকেল কলেজের ইন্টার্ন চিকিৎসবরা।

সরজমিন দেখা যায়, হাসপাতালের কার্যক্রম পুরোপুরিভাবে শুরু হয়েছে। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মাঝে দেখা যায়, ভিন্ন এক উদ্দীপনা। আগের দিন হাসপাতালে এসে কর্মচারীরা একে অপরকে মিষ্টি খাওয়ান। এদিন অনেক কর্মচারীকে একে অপরের সঙ্গে করমর্দন করতেও দেখা যায়। হাসপাতালের আশপাশেও ছিল মানুষের সরগরম। পাশের গলির দোকানগুলোতেও ছিল মানুষের ব্যাপক ভিড়। দোকানগুলোর পুরোনো কর্মচারীরা পুনরায় কাজে যোগ দিয়েছেন। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়, হাসপাতালের বহির্বিভাগ, আন্ত-বিভাগ, ইমার্জেন্সি ও প্রয়োজনীয় সবধরনের সেবা কার্যক্রম চলমান রয়েছে। গতকাল সকাল ৮টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত বহির্বিভাগে ৬০৭ জন রোগী সেবা গ্রহণ করেছেন। ৫৬ জন নতুন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। ৮ জন গর্ভবতী রোগী সিজারিয়ান ডেলিভারি এবং ৩ জন রোগী নরমাল ডেলিভারির মাধ্যমে সন্তান প্রসব করেছেন। এ ছাড়া হাসপাতালে স্বল্প খরচে উন্নত চিকিৎসাসেবার পাশাপাশি ঢাকা শহরে মাত্র ৩৮০ টাকায় এম্বুলেন্স সেবা কার্যক্রম চালু রয়েছে।

অনিশ্চিয়তা কেটেছে শিক্ষার্থী ও ইন্টার্ন চিকিৎসকদের: হাসপাতাল বন্ধের পর থেকে অনিশ্চয়তায় পড়ে যান মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থী ও ইন্টার্ন চিকিৎসকরা। হাসপাতাল খোলার পর থেকে তাদের অনিশ্চয়তা কেটে যায়। এদিন তাদের বেশ উৎফুল্ল দেখা যায়। বিদেশি ইন্টার্ন চিকিৎসক ইলিয়াস মানসুর বলেন, আদ্‌-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিল হওয়ায় আমরা মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলাম। আমাদের দেশে একই প্রতিষ্ঠান থেকে পড়াশোনা ও ইন্টার্নশিপ শেষ না করলে ডিগ্রির অনুমোদন মেলে না। এখন আমরা ইন্টার্নরা রোগীদের চিকিৎসাসেবা করার মধ্যদিয়ে ইন্টার্নশিপ শেষ করতে পারবো। সেজন্য আমরা ও আমাদের পরিবার অনেক আনন্দিত। ৩য় বর্ষে অধ্যায়নরত এক নেপালি শিক্ষার্থী বলেন, কলেজের নিয়মিত একাডেমিক কার্যক্রম চালু ছিল। তৃতীয় বর্ষ থেকে শেষ বর্ষ পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের ক্লিনিক্যাল ক্লাসও সীমিত আকারে চালু ছিল। তবে হাসপাতালের সেবা কার্যক্রম পুনরায় চালু হওয়ায় আমরা রোগীদের সেবাদানের মাধ্যমে ফের হাতে-কলমে শেখার সুযোগ পেলাম।

স্বস্তিতে রোগী ও স্বজনরা: হাসপাতাল চালুর খবর শুনে স্বস্তি ফিরে মধ্য ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের মাঝে। নিশ্চিত হওয়ার জন্য সোমবার থেকে হাসপাতালে ফোন দিতে থাকেন রোগী ও স্বজনরা। আদ্‌-দ্বীন গরিবের হাসপাতাল নামেও পরিচিত। এখানে কম খরচে ভালোমানের চিকিৎসাসেবা দেয়া হয় বলে ব্যাপক পরিচিতি রয়েছে। চিকিৎসার জন্য কুড়িল বিশ্বরোড থেকে মাকে নিয়ে এসেছিলেন মো. শামীম। প্রথমবারের মতো এসেছেন তিনি। শামীম মানবজমিনকে বলেন, আমি আগে কখনো আদ্‌-দ্বীন হাসপাতালে আসিনি। অনেক প্রসংসা শুনেছি। আজ নিজে দেখলাম। অনেক কম টাকায় মাকে ডাক্তার দেখালাম। মায়ের আল্ট্রাসনোগ্রাফি করিয়েছি। যা অন্য কোনো বেসরকারি হাসপাতালের থেকে অনেক কমে করতে পেরেছি। আবার এখানকার পরিবেশও অনেক সুন্দর।

আগারগাঁও থেকে ভাবিকে নিয়ে চিকিৎসার জন্য আসেন সুমা আক্তার। তিনি বলেন, অনেক আগে থেকে এখানে আমরা পুরো পরিবার চিকিৎসা করাই। সোমবার শুনলাম হাসপাতালটি লাইসেন্স ফিরে পেয়েছে। এজন্য ফোন দিয়ে আজকে ভাবিকে নিয়ে চলে এসেছি। শরীয়তপুর থেকে সেবা নিতে আসা আমেনা আক্তার বলেন, এই হাসপাতালে আমার প্রথম সন্তান নরমালে এবং দ্বিতীয় সন্তান সিজারের মাধ্যমে হয়েছে। আগামী মাসে আমার আবারো সন্তান প্রসবের ডেট রয়েছে। তাই ডাক্তার দেখাতে এসেছি।

এ বিষয়ে আদ্‌-দ্বীন ফাউন্ডেশনের মানবসম্পদ বিভাগের সহকারী ব্যবস্থাপক জাহেদ হোসাইন জানান, এখানে প্রায় দুই হাজার স্টাফ কাজ করেন। হাসাপাতাল বন্ধ করে দেয়ায় তাদের চাকরি হুমকির মুখে পড়ে গিয়েছিল। স্টাফদের মধ্যে অনেক উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা কাজ করছিল। লাইসেন্স ফেরত পাওয়ায় সেই উৎকণ্ঠা কেটে গেছে। এজন্য আমরা সরকারসহ সংশ্লিষ্ট সকলকে ধ্যন্যবাদ জানাই। আমরা আশা করি এখন থেকে নতুন উদ্যোমে আরও ভালোভাবে রোগীদের সেবা দিতে পারবো। আদ্‌-দ্বীন ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. জামালুন্নেসা বলেন, আদ্‌-দ্বীন হাসপাতাল পুনরায় চালু হওয়ায় আমরা প্রধানমন্ত্রী, স্বাস্থ্যমন্ত্রী, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, সেবাগ্রহীতা, সাংবাদিক, বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠনসহ সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ প্রকাশ করছি। সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী হাসপাতালের অবকাঠামোগত উন্নয়নের মাধ্যমে আমরা ব্যাপক সংস্কার কার্যক্রম সম্পন্ন করেছি। প্রতিটি ওয়ার্ডে পর্যাপ্ত ভেন্টিলেশন, আলো-বাতাস চলাচলসহ অক্সিজেনের উপস্থিতি নিশ্চিত করা হয়েছে। ডাক্তার, নার্স ও কর্মীদের অধিকতর দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। স্বল্প খরচে রোগীদের মানসম্মত ও উন্নত চিকিৎসাসেবা দেয়ায় ব্যাপারে আদ্‌-দ্বীন বদ্ধপরিকর।

উল্লেখ্য, অলাভজনক প্রতিষ্ঠান আদ্‌-দ্বীন ফাউন্ডেশন ১৯৮০ সাল থেকে সমাজের দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জন্য স্বাস্থ্যসেবা, চিকিৎসা শিক্ষা, সাধারণ শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও আয়বৃদ্ধিমূলক প্রকল্প নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে। বর্তমানে আদ্‌-দ্বীন ফাউন্ডেশনের অধীনে ৯টি হাসপাতাল, ৫টি মেডিকেল কলেজ, ১টি নার্সিং কলেজ, ৪টি নার্সিং ইনস্টিটিউট, ১টি ইনস্টিটিউট অব হেলথ টেকনোলজি, ২টি স্কুল এবং বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক ভ্রাম্যমাণ স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম চলমান রয়েছে।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন