আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল নিয়ে হিউম্যান রাইটস ওয়াচের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনটি একপাক্ষিক ও আসামিপক্ষের প্রভাবে প্রকাশিত বলে মন্তব্য করেছেন চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম। বুধবার আন্তজার্তিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে নিজ কার্যালয়ে প্রতিবেদনটির সমালোচনা করে চিফ প্রসিকিউটর মানবজমিনকে বলেন, একই ধরনের ঘটনার একাধিক মামলায় সাক্ষ্য-প্রমাণের মধ্যে মিল থাকা স্বাভাবিক এবং এটিকে প্রশ্নবিদ্ধ করার কোনো যৌক্তিকতা নেই। তার ভাষায়, একই পদ্ধতিতে সংঘটিত অপরাধের ক্ষেত্রে সাক্ষীদের বক্তব্যেও স্বাভাবিকভাবেই সামঞ্জস্য থাকবে। প্রসিকিউটরের বিরুদ্ধে ওঠা আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, অভিযোগ পাওয়ার পরই সংশ্লিষ্ট প্রসিকিউটরকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং বিষয়টি তদন্তে একটি ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং কমিটি গঠন করা হয়েছে। তিনি দাবি করেন, ঘটনাটি একতরফা নয়; কথোপকথনে জড়িত উভয় পক্ষের ভূমিকা তদন্তের আওতায় আসা উচিত। তিনি আরও অভিযোগ করেন, বিচারপ্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করার উদ্দেশ্যেই পরিকল্পিতভাবে ওই কথোপকথনগুলো করা হয়েছে। তার মতে, যদি এটি ঘুষসংক্রান্ত কোনো ঘটনা হয়ে থাকে, তাহলে আইন অনুযায়ী প্রস্তাবদাতা ও গ্রহণকারী উভয়েই সমানভাবে দায়ী।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের সমালোচনা করে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, সংস্থাটি নির্দিষ্ট কিছু আসামির পক্ষে অবস্থান নিয়ে পক্ষপাতদুষ্ট প্রতিবেদন প্রকাশ করছে। তিনি দাবি করেন, যথাযথ তথ্য যাচাই না করেই এসব প্রতিবেদন প্রকাশ করা হচ্ছে। ট্রাইব্যুনালের সক্ষমতার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, তদন্ত সংস্থায় এডিশনাল আইজিপি, এডিশনাল এসপি ও এসপি পদমর্যাদার অভিজ্ঞ কর্মকর্তারা দায়িত্ব পালন করছেন। পাশাপাশি প্রসিকিউশন টিমেও দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞ ফৌজদারি আইনজীবীরা রয়েছেন। তিনি আরও বলেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন, ১৯৭৩ বাংলাদেশের নিজস্ব আইন। তাই দেশের বিচারক, আইনজীবী ও তদন্ত কর্মকর্তাদের মাধ্যমেই বিচারকার্য পরিচালিত হবে। বিদেশি বিচারক বা আইনজীবী আনার কোনো আইনি প্রয়োজন নেই বলেও মন্তব্য করেন তিনি। শেষে তিনি বলেন, ট্রাইব্যুনালের কর্মকর্তা বা প্রসিকিউশন টিমের দক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ নেই। বরং হিউম্যান রাইটস ওয়াচসহ কিছু আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিবেদন কতটা নিরপেক্ষ, সেটিই এখন প্রশ্নের বিষয়।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) আন্তর্জাতিক আইনি মানদণ্ড অনুসরণে ব্যর্থ হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)। বুধবার প্রকাশিত এক বিবৃতিতে সংস্থাটি বলেছে, বিচারপ্রক্রিয়ার এসব ত্রুটি ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত করতে পারে এবং আইনের শাসন দুর্বল হওয়ার পাশাপাশি রাজনৈতিক প্রতিহিংসামূলক বিচারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। গত ২৭শে জুলাই শাপলা চত্বর মামলায় মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যার অভিযোগে ৪১ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র জমা দেওয়ার পর এ প্রতিক্রিয়া জানায় এইচআরডব্লিউ।
সংস্থাটি অভিযোগ করেছে, একাধিক মামলায় সাক্ষীদের জবানবন্দিতে একই ধরনের অংশ হুবহু পুনরাবৃত্তি হয়েছে, যা সাক্ষ্যের নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। এছাড়া গ্রেপ্তার, দীর্ঘদিন আটক, প্রমাণ উপস্থাপন ও আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগসহ বিচারপ্রক্রিয়ার বিভিন্ন দিক নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে সংস্থাটি। একই সঙ্গে ট্রাইব্যুনালের এক প্রসিকিউটরের বিরুদ্ধে ঘুষের অভিযোগের তদন্ত দ্রুত শেষ করার আহ্বান জানিয়ে এইচআরডব্লিউ বলেছে, বিচারব্যবস্থার প্রতি আস্থা বজায় রাখতে স্বচ্ছ তদন্ত নিশ্চিত করা জরুরি। এইচআরডব্লিউর এশিয়া অঞ্চলের উপপরিচালক মীনাক্ষী গাঙ্গুলী বলেন, অতীতের মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিচার অবশ্যই হতে হবে, তবে তা আন্তর্জাতিক মানের ন্যায়বিচারের নীতিমালা অনুসরণ করেই পরিচালিত হওয়া প্রয়োজন।
