বয়স ৩০ পার হওয়ার পর শরীরের মতো ত্বকেও কিছু স্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা দিতে শুরু করে। ত্বকের কোলাজেন উৎপাদন ধীরে ধীরে কমে যায়, কোষের পুনর্গঠন প্রক্রিয়া আগের তুলনায় ধীর হয়ে পড়ে এবং সূর্যের আলো, দূষণ ও মানসিক চাপের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবও দৃশ্যমান হতে শুরু করে। ফলে ত্বকে বলিরেখা, শুষ্কতা, উজ্জ্বলতা কমে যাওয়া কিংবা স্থিতিস্থাপকতা হ্রাস পাওয়ার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে।
তবে সুখবর হলো, স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের পাশাপাশি কিছু নির্দিষ্ট সাপ্লিমেন্ট ত্বকের স্বাস্থ্যের উন্নতিতে সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে।
কোলাজেন: তারুণ্যের অন্যতম চাবিকাঠি কোলাজেন হলো ত্বকের প্রধান গঠনমূলক প্রোটিন। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এর উৎপাদন কমতে থাকে। কোলাজেন পেপটাইড সাপ্লিমেন্ট নিয়মিত গ্রহণ করলে ত্বকের আর্দ্রতা বজায় রাখতে, স্থিতিস্থাপকতা বাড়াতে এবং সূক্ষ্ম বলিরেখা কমাতে সাহায্য করতে পারে বলে বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে।
ভিটামিন সি: উজ্জ্বল ত্বকের বন্ধু ভিটামিন সি শুধু রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাই বাড়ায় না, এটি কোলাজেন তৈরিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। পাশাপাশি এটি একটি শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, যা দূষণ ও সূর্যের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে ত্বককে সুরক্ষা দিতে সাহায্য করে। পর্যাপ্ত ভিটামিন সি ত্বককে আরও প্রাণবন্ত ও উজ্জ্বল দেখাতে সহায়তা করতে পারে।
ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড: ভেতর থেকে আর্দ্রতা মাছের তেল বা ওমেগা-৩ সমৃদ্ধ সাপ্লিমেন্ট ত্বকের স্বাভাবিক সুরক্ষা স্তরকে শক্তিশালী করতে সাহায্য করে। এতে ত্বকের শুষ্কতা কমে, আর্দ্রতা বজায় থাকে এবং প্রদাহজনিত সমস্যা হ্রাস পেতে পারে।
ভিটামিন ডি: অবহেলিত কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ বর্তমান জীবনযাত্রায় অনেকেই পর্যাপ্ত সূর্যালোক পান না, ফলে ভিটামিন ডি-এর ঘাটতি দেখা যায়। ত্বকের স্বাস্থ্য এবং শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার জন্য ভিটামিন ডি গুরুত্বপূর্ণ। ঘাটতি পূরণ করলে সামগ্রিক স্বাস্থ্যের পাশাপাশি ত্বকের অবস্থারও উন্নতি হতে পারে।
জিঙ্ক: ত্বকের মেরামতকারী ত্বকের ক্ষত নিরাময়, প্রদাহ নিয়ন্ত্রণ এবং কোষ পুনর্গঠনে জিঙ্ক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। পর্যাপ্ত জিঙ্ক গ্রহণ ত্বককে সুস্থ রাখতে এবং ব্রণের প্রবণতা কমাতে সহায়ক হতে পারে। হায়ালুরোনিক অ্যাসিড: আর্দ্রতার ভাণ্ডার হায়ালুরোনিক অ্যাসিড স্বাভাবিকভাবেই আমাদের ত্বকে উপস্থিত থাকে এবং পানি ধরে রাখতে সাহায্য করে। বয়স বাড়ার সঙ্গে এর পরিমাণ কমে যায়। সাপ্লিমেন্ট হিসেবে গ্রহণ করলে ত্বকের আর্দ্রতা বৃদ্ধি এবং শুষ্কতা কমাতে সাহায্য করতে পারে।
প্রোবায়োটিক: সুস্থ অন্ত্র, সুস্থ ত্বক বর্তমানে ‘গাট-স্কিন কানেকশন’ নিয়ে অনেক গবেষণা হচ্ছে। অন্ত্রের স্বাস্থ্য ভালো থাকলে তার ইতিবাচক প্রভাব ত্বকেও পড়ে। প্রোবায়োটিক সাপ্লিমেন্ট অন্ত্রের উপকারী ব্যাকটেরিয়ার ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে, যা ত্বকের সামগ্রিক স্বাস্থ্য উন্নত করতে পারে। শুধু সাপ্লিমেন্টই কি যথেষ্ট? এক কথায় উত্তর—না।ত্বক ভালো রাখার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সুষম খাদ্য, পর্যাপ্ত পানি পান, নিয়মিত ঘুম, মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ এবং প্রতিদিন সানস্ক্রিন ব্যবহার। কোনো সাপ্লিমেন্টই এসব অভ্যাসের বিকল্প নয়। বরং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের সঙ্গে সঠিক সাপ্লিমেন্ট যুক্ত হলে ত্বকের জন্য সর্বোত্তম ফল পাওয়া সম্ভব।
শেষ কথা
৩০ বছর পার হওয়ার পর ত্বকের যত্নে কোলাজেন, ভিটামিন সি, ওমেগা-৩, ভিটামিন ডি, জিঙ্ক, হায়ালুরোনিক অ্যাসিড এবং প্রোবায়োটিক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে মনে রাখতে হবে, উজ্জ্বল ও স্বাস্থ্যকর ত্বকের মূল রহস্য লুকিয়ে আছে সুষম খাদ্যাভ্যাস, পর্যাপ্ত বিশ্রাম এবং নিয়মিত ত্বকের যত্নে। সাপ্লিমেন্ট হতে পারে সেই যত্নের একটি সহায়ক অংশ, কিন্তু কখনোই একমাত্র সমাধান নয়।
লেখক
ডা. ফাতেমা-তুজ-জোহরা
সহকারী অধ্যাপক, চর্ম ও যৌন বিভাগ
চেম্বার: আলোক হাসপাতাল, মিরপুর-৬
হটলাইন: ১০৬৭২, ০৯৬১০১০০৯৯৯
