আইসিটি’র বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে এইচআরডব্লিউর উদ্বেগ

সাক্ষ্যে ‘কপি-পেস্ট’

আইসিটি’র বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে এইচআরডব্লিউর উদ্বেগ

ফন্ট সাইজ:

বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) আন্তর্জাতিক আইনি মানদণ্ড অনুসরণে ব্যর্থ হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)।

এনিয়ে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে মানবাধিকার সংস্থাটি বলেছে, এসব ব্যর্থতা ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত করতে পারে, আইনের শাসনকে দুর্বল করতে পারে, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে অন্যায়ভাবে কারাবন্দি করার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে এবং অতীতের মানবাধিকার লঙ্ঘনের পুনরাবৃত্তি ঘটাতে পারে।
শাপলা চত্বর মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউশনের অভিযোগপত্র জমা পড়ার বিষয়টি সামনে এনে বুধবার (২৯ জুলাই) এমন প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে এইচআরডব্লিউ।

গত ২৭ জুলাই ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটররা মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যার অভিযোগে ৪১ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র জমা দিয়েছেন। অভিযুক্তদের মধ্যে রয়েছেন রাজনীতিবিদ, নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য এবং সাংবাদিকও। তাদের বিরুদ্ধে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সংঘটিত গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ আনা হয়েছে।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়া অঞ্চলের উপপরিচালক মীনাক্ষী গাঙ্গুলী বলেন, শেখ হাসিনা সরকারের আমলে সংঘটিত বহু মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য দায়ীদের অবশ্যই জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। তবে অনেক মামলার বিচার আন্তর্জাতিক মানের ন্যায়বিচারের মানদণ্ড পূরণ করছে না।

তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশকে জরুরি ভিত্তিতে তার ফৌজদারি বিচারব্যবস্থার সংস্কার করতে হবে এবং নতুন সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে, যেন দুর্বল তদন্ত ও ভিত্তিহীন অভিযোগের মাধ্যমে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার সুযোগ না থাকে।
বর্তমানে ট্রাইব্যুনালে ২০২৪ সালের জুলাই ও আগস্টে শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বাধীন আন্দোলনে নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মামলাগুলোর বিচার চলছে।

ওই অভিযানে ৮০০ জনের বেশি নিহত এবং হাজারো মানুষ গুরুতর আহত হন, যার পরিণতিতে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে। এছাড়া শেখ হাসিনার শাসনামলে সংঘটিত বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও গুমের অভিযোগও ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন রয়েছে।

যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া নিয়ে উদ্বেগ
হিউম্যান রাইটস ওয়াচ জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় গুরুতর অপরাধের বিচার করার জন্য প্রতিষ্ঠিত এই দেশীয় ট্রাইব্যুনালে চলমান এক ডজনের বেশি মামলা পর্যবেক্ষণ করে তারা যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া (ডিউ প্রসেস) নিয়ে গুরুতর উদ্বেগ লক্ষ্য করেছে।

সংস্থাটির অভিযোগ, একাধিক মামলায় প্রসিকিউশন অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনে এমন সাক্ষ্য ব্যবহার করেছে, যেখানে একই ধরনের অভিযোগমূলক অংশ হুবহু কপি-পেস্ট করে একাধিক সাক্ষীর জবানবন্দিতে যুক্ত করা হয়েছে।

হাসিনা সরকারের পতনের পর ট্রাইব্যুনাল ৬টি মামলার বিচার সম্পন্ন করেছে। এতে ৬২ জন মানবতাবিরোধী অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন। এর মধ্যে ৪২ জনের বিচার অনুপস্থিতিতে (ইন অ্যাবসেনশিয়া) হয়েছে, যাদের মধ্যে শেখ হাসিনাও রয়েছেন। এছাড়া ১৬ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছে।

২০১০ সালের ট্রাইব্যুনাল নিয়েও ছিল সমালোচনা
২০১০ সালের মার্চে শেখ হাসিনা সরকারের সময় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়। এর উদ্দেশ্য ছিল, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সহযোগী হিসেবে আন্তর্জাতিক অপরাধে অভিযুক্তদের বিচার করা।
তবে সেই বিচার প্রক্রিয়াও প্রমাণের ঘাটতি, রাজনৈতিক পক্ষপাত, প্রসিকিউটর ও বিচারকদের মধ্যে যোগসাজশ এবং ন্যূনতম আইনি সুরক্ষার অভাবের অভিযোগে ব্যাপক সমালোচিত হয়েছিল। ওই বিচারগুলোতে ছয়জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।

২০২৪ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার ট্রাইব্যুনাল আইন সংশোধন করে আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার চেষ্টা করে। তবে হিউম্যান রাইটস ওয়াচের মতে, এসব সংশোধন আন্তর্জাতিক আদালতগুলোর সমপর্যায়ের যথাযথ আইনি ও প্রক্রিয়াগত সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পারেনি।
সংস্থাটি আরও উল্লেখ করেছে, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) সরকারের আমলেও এ আইনে আর কোনো সংশোধন আনা হয়নি।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের মতে, বর্তমান আইনে এখনও এমন বিধান রয়েছে, যার মাধ্যমে- পর্যাপ্ত প্রমাণের মানদণ্ড পূরণ ছাড়াই প্রসিকিউটর গ্রেপ্তারের নির্দেশ দিতে পারেন। লিখিত কারণ ছাড়াই অভিযুক্তকে মাসের পর মাস আটক রাখা সম্ভব। পৃথক আদালতে অন্তর্বর্তী আপিলের সুযোগ নেই। প্রসিকিউশন প্রমাণ প্রকাশের মাত্র তিন সপ্তাহ পরই বিচার শুরু করা যায়, ফলে আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য পর্যাপ্ত সময় পাওয়া যায় না। অনুপস্থিতিতে বিচার হলেও অভিযুক্তের নিজের আইনজীবী বেছে নেয়ার যথাযথ সুযোগ নেই। প্রতিরক্ষা আইনজীবীদের সাক্ষীদের জেরা করার ক্ষমতাও সীমিত।

গত ১৪ মে ট্রাইব্যুনাল একাত্তর টিভির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোজাম্মেল বাবু এবং উপস্থাপক ফারজানা রূপার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে। অভিযোগে বলা হয়, ২০১৩ সালের মে মাসে হেফাজতে ইসলাম আয়োজিত এক সমাবেশে নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানে হতাহতের ঘটনা নিয়ে তারা ভুল তথ্য প্রচার করে সরকারকে হত্যাকাণ্ড ধামাচাপা দিতে সহায়তা করেছেন।

তাদের আইনজীবীরা হিউম্যান রাইটস ওয়াচকে জানান, গ্রেপ্তারের সময় আন্তর্জাতিক নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার সম্পর্কিত চুক্তির (আইসিসিপিআর) ১৪ নম্বর অনুচ্ছেদ এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় লিখিত কারণ তাদের দেয়া হয়নি।

২৭ জুলাই দাখিল করা অভিযোগপত্রে ওই দুই সাংবাদিককেও ৪১ অভিযুক্তের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে মানবতাবিরোধী অপরাধ এবং গণহত্যার অভিযোগ আনা হয়েছে।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ উল্লেখ করেছে, আন্তর্জাতিক আইনে গণহত্যা বলতে কোনো জাতীয়, জাতিগত, বর্ণগত বা ধর্মীয় গোষ্ঠীকে সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে সংঘটিত নির্দিষ্ট অপরাধকে বোঝায়।

কপি-পেস্ট সাক্ষ্য নিয়ে প্রশ্ন
সংস্থাটি আরও বলেছে, ট্রাইব্যুনালের তদন্ত কর্মকর্তারা যে সাক্ষ্য রেকর্ড করেছেন, তার একাধিকটিতে একই ভাষার অনুচ্ছেদ হুবহু পুনরাবৃত্তি হয়েছে, যা সাক্ষ্যের সত্যতা নিয়ে সন্দেহ সৃষ্টি করে।

উদাহরণ হিসেবে তারা হাছান মাহমুদ চৌধুরী ও অন্যান্যদের মামলার কথা উল্লেখ করেছে। এই মামলায় চট্টগ্রাম নগরীতে ২০২৪ সালের ১৬ ও ১৮ জুলাই এবং ৪ আগস্ট সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ২২ জন আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে তিনটি অভিযোগ গঠন করা হয়েছে।

প্রকাশিত ৫৫টি সাক্ষ্যবিবৃতির মধ্যে অন্তত ১৪টিতে ছয় লাইনের একটি অংশ প্রায় হুবহু একইভাবে রয়েছে। সেখানে দাবি করা হয়েছে, সাতজন রাজনীতিক পরিকল্পনা, অর্থায়ন, উসকানি ও নির্দেশনার মাধ্যমে আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীদের ব্যবহার করে ছয়জনকে হত্যা করেছেন।

এছাড়া আরও ৯টি সাক্ষ্যবিবৃতিতে দীর্ঘ একটি অংশ প্রায় একই ভাষায় উল্লেখ করা হয়েছে, যেখানে বলা হয়েছে অভিযুক্তদের ছয়জন আন্দোলনকারীদের ‘জঙ্গি, সন্ত্রাসী ও সাম্প্রদায়িক উসকানিদাতা’ আখ্যা দিয়ে সর্বোচ্চ শক্তি প্রয়োগ এবং নিরস্ত্র শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষকে হত্যা ও নির্যাতনের নির্দেশ দেন।

ঘুষের অভিযোগও সামনে এসেছে
একই মামলায় আটক আওয়ামী লীগ নেতা এ বি এম ফজলে করিম চৌধুরীর আইনজীবীরা সাংবাদিকদের এমন একটি অডিও রেকর্ডিং দেন, যেখানে ট্রাইব্যুনালের এক প্রসিকিউটর ১ কোটি টাকা ঘুষের বিনিময়ে জামিনের ব্যবস্থা করে দেয়ার প্রস্তাব দিয়েছেন বলে দাবি করা হয়।

ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর ওই প্রসিকিউটর পদত্যাগ করেন। তবে প্রধান প্রসিকিউটরের কার্যালয় এখনও তদন্ত শেষ করেনি। এদিকে বিচারকরা অভিযোগ গঠন সম্পন্ন করেছেন এবং আগামী ৬ আগস্ট মামলার বিচার শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।

মীনাক্ষী গাঙ্গুলী বলেন, বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষকে বুঝতে হবে যে, অতীতে আওয়ামী লীগ সরকার যেভাবে রাজনৈতিক প্রতিহিংসামূলক বিচার পরিচালনা করেছিল, সেই ধরনের অপব্যবহারের পুনরাবৃত্তি করা যাবে না। একই ধরনের সাক্ষ্যবিবৃতির ভিত্তিতে অভিযোগ গঠন একটি বিশ্বাসযোগ্য বিচারপ্রক্রিয়ার অভাবকে স্পষ্ট করে। এতে আবারও ভুক্তভোগী, তাদের পরিবার এবং বাংলাদেশের জনগণ ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন