নারায়ণগঞ্জের ৫ জনের বাড়িতে শোকের মাতম

দক্ষিণ আফ্রিকায় আগুনে নিহত ৬

নারায়ণগঞ্জের ৫ জনের বাড়িতে শোকের মাতম

ফন্ট সাইজ:

দক্ষিণ আফ্রিকার কুইন্সটাউন সমো এলাকায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে নিহত ৬ বাংলাদেশির ৫ জনই নারায়ণগঞ্জের। তারা সদর উপজেলার আলীরটেক ও বক্তাবলী ইউনিয়নের বাসিন্দা। মর্মান্তিক এই ঘটনায় দুই ইউনিয়নের তিন গ্রাম জুড়ে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। নিহতদের পরিবারে চলছে আহাজারি। নিহতরা হলেন, আলীরটেক ইউনিয়নের ক্রোকেরচর গ্রামের মনির হোসেনের ছেলে ফাহিম (২৯), আলী মিয়ার ছেলে আপন আহমেদ (২৩), মৃত শরব আলীর ছেলে নূর মোহাম্মদ (৫৫), তৈলখিরারচর গ্রামের ফারুক হোসেনের ছেলে মো. ফয়সাল (২৬), বক্তাবলী ইউনিয়নের কানাইনগর গ্রামের মো. শাহীন (৩০) এবং মুন্সীগঞ্জ জেলার মিরকাদিম পৌরসভার মৃত সালাম ব্যাপারীর ছেলে মো. শাহীন (৩০)।

জানা গেছে, মঙ্গলবার ভোররাতে দক্ষিণ আফ্রিকার ইস্টার্ন কেপ প্রদেশের কুইন্সটাউন (বর্তমান কোমানি) থেকে প্রায় ১৫০ কিলোমিটার দূরের সমো এলাকায় ফতুল্লার আলীরটেক ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য রওশন মেম্বারের ভাই রতনের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। দোকানের ভেতরের আবাসিক কক্ষে ৭ জন ঘুমিয়ে ছিলেন। গভীর রাতে হঠাৎ আগুন ছড়িয়ে পড়লে ৬ জন ঘটনাস্থলেই মারা যান। গুরুতর আহত আল আমিনকে উদ্ধার করে কুইন্সটাউন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। তিনি বর্তমানে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

১১ বছর পর বিয়ের জন্য দেশে ফেরার কথা ছিল ফাহিমের
পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে কৈশোরেই পাড়ি জমিয়েছিলেন সুদূর দক্ষিণ আফ্রিকায়। স্বপ্ন ছিল কিছুটা সচ্ছলতা এনে বাবা-মায়ের কষ্ট ঘোচাবেন, দেশে ফিরে বিয়ে করবেন, নতুন জীবন শুরু করবেন। কিন্তু সেই স্বপ্ন আর পূরণ হলো না। দক্ষিণ আফ্রিকায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে প্রাণ হারিয়েছেন নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার আলীরটেক ইউনিয়নের ক্রোকের চর গ্রামের বাসিন্দা মো. ফাহিম (২৯)। তার মৃত্যুর খবরে পুরো গ্রামে নেমে এসেছে শোকের ছায়া।

ফাহিম ওই গ্রামের মনির হোসেনের ছেলে। পাঁচ ভাই-বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার বড়। মাত্র ১৮ বছর বয়সে পরিবারের একমাত্র ভরসা হয়ে জীবিকার সন্ধানে দক্ষিণ আফ্রিকায় যান। সেখানে ইস্টার্ন কেপ প্রদেশের কুইন্সটাউন থেকে প্রায় ১৫০ কিলোমিটার দূরের সমো এলাকায় একটি সুপার শপে কর্মরত ছিলেন। দীর্ঘ ১১ বছর ধরে সেখানে কাজ করলেও একবারও দেশে ফেরার সুযোগ হয়নি।

পরিবারের সদস্যরা জানান, সবকিছু ঠিক থাকলে খুব শিগগিরই দেশে ফিরে বিয়ে করার কথা ছিল ফাহিমের। বাবা-মাও সেই অপেক্ষায় দিন গুনছিলেন। কিন্তু সেই প্রতীক্ষার অবসান ঘটলো এক হৃদয়বিদারক সংবাদে। আগুনে পুড়ে মৃত্যু হয়েছে তাদের আদরের সন্তানের।

ফাহিমের মৃত্যুর খবরে তার বাড়িতে চলছে আহাজারি। ঘরের ভেতর আর্তনাদ করে কাঁদছিলেন ফাহিমের মা লুৎফুন্নেছা, ছোট দুই বোন মুনমন, মিম এবং যমজ দুই ভাই জাহিদ ও নাহিদ। শোকাহত পরিবারের সদস্যদের কান্না যখন স্বজনরা থামাতে পারছিলেন তখন ফাহিমের বাবা মনির হোসেন ছিলেন পাশের ঘরে চুপচাপ বসা। পরিবারের উপার্জনক্ষম পাঁচ সন্তানের বড়জনকে হারিয়ে নির্বাক মনির বলেন, আমার কিছু বলার নাই। ঘুম ভাঙলো পোলার মৃত্যুর খবর শুইনা। আমি আর কী কমু! এই বলে আবারও চুপ হয়ে গেলেন এ পিতা। আশপাশের স্বজনরা তাকে কান্না করে অন্তত ‘মনটা হালকা’ করার পরামর্শ দিলেন। কিন্তু তাতেও কোনো বিকার দেখা গেল না মনিরের।

পরিবারের প্রধান উপার্জনক্ষম সন্তানকে হারিয়ে রীতিমতো ভেঙে পড়েছেন তিনি। কোনো কথা বলতে পারছেন না। ফাহিমের যমজ দুই ছোট ভাই জাহিদ ও নাহিদ নীরবে চোখের পানি ফেলছেন। দুই বোনও শোক সামলাতে পারছেন না। নিজেরা কান্নায় ভেঙে পড়লেও মা’কে সান্ত্বনা দেওয়ার ভাষা খুঁজে পাচ্ছেন না।

নিহত ফাহিমের মা লুৎফুন্নেছা কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ১১ বছর ধরে আমার ছেলে বিদেশে। কথা ছিল দেশে এসে বিয়ে করবে। আমরা সবাই সেইদিনের অপেক্ষায় ছিলাম। কিন্তু আমার বুকের ধন আর ফিরবে না। আমাকে তো আর ‘মা’ বলে ডাকবে না।” এ কথা বলেই তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন।

স্থানীয়রা জানান, ফাহিম ছিলেন অত্যন্ত পরিশ্রমী ও ভদ্র স্বভাবের একজন তরুণ। পরিবারের স্বপ্ন পূরণে নিজের জীবনের সেরা সময় বিদেশে কাটিয়েছেন। তার এমন মর্মান্তিক মৃত্যু শুধু পরিবারের নয়, পুরো গ্রামের মানুষের জন্যই এক অপূরণীয় ক্ষতি।

এদিকে, ছেলের শোকে কাঁদতে কাঁদতে বারবার মূর্ছা যাচ্ছিলেন একই ঘটনায় নিহত মো. আপন আহমেদের মা আঁখি বেগম। ২০ বছর বয়সী আপন চার বছর আগে দক্ষিণ আফ্রিকায় যান।

নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এসএম ফয়েজ উদ্দিন সাংবাদিকদের জানান, নিহতদের মধ্যে পাঁচজনের বাড়ি নারায়ণগঞ্জের সদর উপজেলায়। আরেকজনের বাড়ি মুন্সীগঞ্জে। ভুক্তভোগী পরিবারের খোঁজখবর নিয়েছি এবং আমরা শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের সান্ত্বনা দিয়েছি। সকল প্রক্রিয়া শেষে যত দ্রুত নিহতের মরদেহ দেশে আনা যায় স্বজনদের এই দাবি বাস্তবায়নে আমরা কাজ করবো।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন