যশোর জেলা জামায়াতের আমীর এমপি গোলাম রসুলের বাসভবনে হামলা-ভাঙচুর

যশোর জেলা জামায়াতের আমীর এমপি গোলাম রসুলের বাসভবনে হামলা-ভাঙচুর

ফন্ট সাইজ:

তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে একদল বিক্ষুব্ধ এলাকাবাসী যশোর-৪ (বাঘারপাড়া-অভয়নগর) আসনের সংসদ সদস্য ও জেলা জামায়াতের আমীর অধ্যাপক গোলাম রসুলের শহরের নীলগঞ্জ এলাকার বাসভবনে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটিয়েছে। এমপি’র বাসভবনের সামনের সড়কে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন স্থানীয় শত শত ক্ষুব্ধ জনতা। এ সময় সংসদ সদস্য গোলাম রসুল এবং তার পরিবারের সদস্যরা বাড়ির ভেতরেই ছিলেন। এমপি গোলাম রসুল বার কয়েক বাড়ির কলাপসিবল গেট খুলে বাইরে উত্তেজিত জনতাকে শান্ত করার ব্যর্থ চেষ্টা করে শেষ পর্যন্ত উপরে ওঠে যান। খবর পেয়ে স্থানীয় দলীয় নেতাকর্মী ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য পুলিশ, ডিবি ও র‍্যাব সদস্যরা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করেন। গতকাল বেলা ১১টার দিকে এ ঘটনা ঘটে।

স্থানীয়রা জানান, শহরের নীলগঞ্জ এলাকায় এমপি গোলাম রসুলের বাড়ির পাশেই ‘আল মাদ্রাসাতুশ শারইয়াহ’ নামের একটি মাদ্রাসা রয়েছে। এই মাদ্রাসায় শিশু শ্রেণি থেকে কোরআনের হাফেজ ও মুফতি মাওলানা বিষয়ে পাঠদান করা হয়। মাদ্রাসায় কবির হোসেন নামের এক ব্যক্তি মুহতামিমের দায়িত্ব পালন করেন। এমপি গোলাম রসুলের মেডিকেল পড়ুয়া মেয়ে মেহেজাবিন জান্নাত অনন্যা মাদ্রাসার মুহতামিম ও শিক্ষার্থীদের যাতায়াতের রাস্তায় প্রায়ই বিঘ্ন সৃষ্টি করতেন। তিনি মাদ্রাসাটি চালু থাকুক তা চাননি। এই কারণে নানা ছলে মাদ্রাসার মুহতামিম ও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক ব্যবহার করতেন। তারই ধারাবাহিকতায় গত সোমবার দুপুরের পর মাদ্রাসার কয়েকজন শিক্ষার্থীর পথ আটকে এমপি কন্যা অনন্যা তাদেরকে নানা রকমের ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং হুমকি-ধামকি দেন। এমনকি তিনি আয়ানসহ কয়েকজন শিশু শিক্ষার্থীর গায়ে হাত তোলেন। প্রতিবাদ করলে তিনি রেক্সোনা নামে এক মহিলার ওপর চড়াও হন। এতে ওই মহিলার মাথা ফেটে যায়। স্থানীয়রা জানান, এমপি কন্যা অনন্যা তার হাতে থাকা একটি লোহার তালা দিয়ে জোরে আঘাত করায় রেক্সোনার মাথা ফেটে যায়। এ হামলার প্রতিবাদ করায় নাসির উদ্দিন নামে এক ব্যক্তিকে ধাক্কা মেরে ফেলে দিয়ে তার সাইকেলটি রাস্তার পাশে ছুড়ে ফেলে দেন এমপি কন্যা অনন্যা ও তার কয়েকজন সহযোগী বন্ধু ও বান্ধবী।

অভিযোগকারী স্থানীয় প্রতিবেশীরা জানান, ঘটনার পর সোমবার রাতে স্থানীয়ভাবে দুই পক্ষের মধ্যে একটি মীমাংসা হয়। তবে গতকাল মঙ্গলবার সকালে মাদ্রাসা খুললে অনন্যা পুনরায় সেখানে গিয়ে মাদ্রাসা বন্ধ করার নির্দেশ দেন। মাদ্রাসার মুহতামিম কবির হোসেনের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ করেন। এতে স্থানীয় অভিভাবকরা চরম ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। তারা সকাল ১১টার দিকে এমপি’র বাড়ির সামনে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বিক্ষোভ চলাকালে বেলা সাড়ে ১১টার দিকে বিষয়টি মীমাংসার উদ্দেশ্যে এমপি’র এক স্বজন ঘটনাস্থলে এলে ক্ষুব্ধ জনতার একাংশ তার ওপর চড়াও হয় এবং তাকে মারধর করে। এতে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠলে বিক্ষোভকারীরা যশোর-নড়াইল মহাসড়ক অবরোধ করে এমপি ও তার মেয়ের শাস্তির দাবিতে নানা স্লোগান দিতে থাকেন।

আহত রেক্সোনার ননদ অন্তু অভিযোগ করে বলেন, এমপি সাহেবের মেয়ে মেহেজাবিন জান্নাত অনন্যা কারণে-অকারণে মাদ্রাসায় গিয়ে ঝামেলা করতেন। তার ও তার লোকজনের কারণে এলাকায় শিশু শিক্ষার্থীদের লেখাপড়ার জন্য মাদ্রাসাটি পরিচালনা করাই মুশকিল হয়ে পড়েছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে যশোর-৪ আসনের সংসদ সদস্য গোলাম রসুলের স্ত্রী শারমিন ইয়াসমিন জানান, তার মেয়ে মেহেজাবিন জান্নাত অনন্যা দীর্ঘদিন ধরে মানসিক সমস্যায় ভুগছেন। তিনি দাবি করেন, মাদ্রাসা বন্ধ থাকলেও শিশুরা বিভিন্ন সময় এখানে এসে গোলযোগ সৃষ্টি করে। আমার মেয়ে শুধু এর প্রতিবাদ করেছিল। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে আমাদের সঙ্গে শত্রুতা তৈরি করা হয়েছে। এখন অহেতুক আমাদের বাড়িতে হামলা চালিয়ে মিথ্যা নানা অভিযোগ আনা হচ্ছে।

এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে এমপি গোলাম রসুল বলেন, একটি তুচ্ছ ঘটনাকে রং লাগিয়ে হামলাকারীরা তার বাসভবনের জানালার গ্লাস ভাঙচুর করে এবং শাবল ও ড্রিল মেশিন দিয়ে প্রধান ফটক ভাঙার চেষ্টা করে। এ সময় তাকে ও তার পরিবারকে অবরুদ্ধ অবস্থায় থাকতে হয় কয়েক ঘণ্টা এবং বাইরে থেকে বিভিন্ন ধরনের অশালীন গালিগালাজ করা হয়। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করেন। তিনি আরও বলেন, তার মেয়ে একজন মানসিক রোগী। তার চিকিৎসাসংক্রান্ত প্রয়োজনীয় সব কাগজপত্র সংরক্ষিত রয়েছে এবং প্রয়োজন হলে তদন্তকারী সংস্থার কাছে তা উপস্থাপন করা হবে। একজন চিকিৎসাধীন মানসিক রোগীর আচরণকে কেন্দ্র করে একটি পরিবারের ওপর হামলা, ভাঙচুরের চেষ্টা এবং আতঙ্কের পরিবেশ সৃষ্টি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তিনি ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উদ্‌ঘাটন এবং হামলার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান। ঘটনাস্থলে উপস্থিত কোতোয়ালি থানার পরিদর্শক (অপারেশন) মমিনুল হক জানান, দুই পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার চেষ্টা চলছে। কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাসুম খান বলেন, বিক্ষুব্ধ জনগণকে শান্ত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। আলোচনা সাপেক্ষে সমস্যার সমাধান করা হবে।

সর্বশেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত, ঘটনাস্থলে যশোরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আহসান হাবীব ও র‍্যাব যশোর ক্যাম্পের ইনচার্জ মেজর এ টি এম ফজলে রাব্বি প্রিন্সসহ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত রয়েছেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এলাকাটি কড়া নজরদারিতে রেখেছে।

এদিকে, যশোর জেলা জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে এ ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানানো হয়েছে। জেলা জামায়াতের পক্ষ থেকে এক বিবৃতিতে বলা হয়, একজন চিকিৎসাধীন মানসিক রোগীকে কেন্দ্র করে সংসদ সদস্যের বাসভবনে হামলা, ভাঙচুরের চেষ্টা এবং পরিবারের সদস্যদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি অত্যন্ত নিন্দনীয় ও উদ্বেগজনক। বিবৃতিতে অবিলম্বে ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত করে প্রকৃত দোষীদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানানো হয়। পাশাপাশি গুজব, উস্কানিমূলক প্রচারণা ও আইন নিজের হাতে তুলে নেয়া থেকে সকলকে বিরত থাকার আহ্বান জানানো হয়। জামায়াত নেতৃবৃন্দ বলেন, আইনের শাসনের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে যেকোনো অভিযোগ যথাযথ তদন্তের মাধ্যমে নিষ্পত্তি হওয়া উচিত। কোনো অবস্থাতেই হামলা, ভাঙচুর ও জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টির মতো কর্মকাণ্ড গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন