বেশকিছু বছর যাবৎ ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুয়ের ওয়াশিংটন সফর একটি নির্দিষ্ট চিত্রনাট্য অনুসরণ করছিলো। নেতানিয়াহু আসবেন, লাল গালিচা অভ্যর্থনা গ্রহণ করবেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে হাত মেলাবেন এবং এরপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সম্পর্কের গভীরতার সাফাই গাইবেন। তবে এবারের সাক্ষাৎ আর পাঁচ মাস পূর্বে হওয়া সাক্ষাতের মধ্যে বিস্তর ফারাক রয়েছে। ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর তৎকালীন ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা এবং ট্রাম্পের অকৃপণ প্রশংসা এখন রূপ নিয়েছে ব্যক্তিগত ক্ষোভ ও গালিগালাজপূর্ণ ফোনালাপে। ট্রাম্প পুনরায় ক্ষমতায় আসার পর এটা নেতানিয়াহুর যুক্তরাষ্ট্রে সপ্তম সফর, যা বিশ্বের অন্য যেকোনো নেতাদের চেয়ে অনেক বেশিবার।
তবে এবার তিনি ওয়াশিংটনে এসেছেন সামনেই নিজ দেশের জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে এক টালমাটাল রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে। যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ক্রমাবনতি হওয়া সম্পর্ককে পুনরায় স্থিতিশীল করার কঠিন চ্যালেঞ্জ তার সামনে। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে নেতানিয়াহু হোয়াইট হাউসে বৈঠকের চেষ্টা চালালেও ট্রাম্প এতে বেশ অনিচ্ছুক ছিলেন। অবশেষে মার্কিন সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহামের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় যোগ দেওয়ার অছিলায় দুই নেতার এই মুখোমুখি বসার সুযোগ তৈরি হয়। গত ফেব্রুয়ারিতে যখন দুই নেতা শেষবার সাক্ষাৎ করেছিলেন, তখন তারা ইরানের বিরুদ্ধে একটি যৌথ সামরিক অভিযানের ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন। কিন্তু যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার সাথে সাথে দুই নেতার মূল লক্ষ্য আলাদা হয়ে পড়ে। নেতানিয়াহু চাপ বজায় রেখে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে চেয়েছিলেন।
অন্যদিকে ট্রাম্প চেয়েছিলেন দ্রুত যুদ্ধ শেষ করে বের হয়ে আসতে। ট্রাম্পকে আগে বোঝানো হয়েছিল যুদ্ধটি মাত্র কয়েক সপ্তাহ স্থায়ী হবে। কিন্তু টানা কয়েক মাস ধরে চলা এই প্রাণঘাতী অচলাবস্থায় ট্রাম্প ভেতরে ভেতরে চরম ক্ষুব্ধ। নেতানিয়াহু এবার ইরানের পারমাণবিক পুনর্গঠন নিয়ে নতুন গোয়েন্দা তথ্য দিতে চাইলেও, মার্কিন নির্বাচনের আগে ট্রাম্প নতুন করে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে জড়াতে আগ্রহী নন। ইরান ছাড়াও লেবানন সংকট নিয়ে দুই নেতার দূরত্ব আরও বেড়েছে। হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে ইসরাইলের টানা বোমাবর্ষণ ট্রাম্পকে অত্যন্ত ক্ষুব্ধ করেছিল।
জুন মাসে এক ফোনালাপে তিনি নেতানিয়াহুকে সরাসরি বলেন, এই যুদ্ধের কারণে পৃথিবীর সবাই এখন তাকে এবং ইসরাইলকে ঘৃণা করছে। পরবর্তীতে ত্রিপক্ষীয় চুক্তি হলেও দক্ষিণ লেবানন থেকে সেনা সরাতে ইসরাইলের টালবাহানা ট্রাম্প প্রশাসনকে আরও বিরক্ত করেছে। পাশাপাশি, তুরস্কের কাছে মার্কিন প্রযুক্তির এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান বিক্রির ট্রাম্পের পরিকল্পনা এবং সৌদির সাথে মার্কিন পারমাণবিক চুক্তি নিয়ে ইসরাইল তীব্র আপত্তি জানালেও ট্রাম্প স্পষ্ট জানিয়ে দেন, অস্ত্র বিক্রির বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার মালিক একমাত্র তিনিই। নেতানিয়াহু এই মতবিরোধগুলোকে কেবল ‘কৌশলগত বিভেদ’ বলে উড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছেন। কিন্তু আগামী অক্টোবরের নির্বাচনে নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে ওয়াশিংটনে প্রভাব বজায় রাখা এবং ট্রাম্পের সমর্থন লাভ করা নেতানিয়াহুর জন্য অত্যন্ত জরুরি। সব মিলিয়ে চরম রাজনৈতিক চাপ ও আস্থার সংকটের মুখে শুরু হওয়া এই বৈঠকে পুরোনো সুসম্পর্কের চিত্রনাট্য বদলে যেতে পারে।
