অভিবাসন নীতির নতুন মোড়, বাংলাদেশের জন্য কী বার্তা?

ইউরোপের ‘রিটার্ন হাব’

অভিবাসন নীতির নতুন মোড়, বাংলাদেশের জন্য কী বার্তা?

ফন্ট সাইজ:

ইউরোপের অভিবাসন নীতিতে আরেকটি বড় পরিবর্তনের আভাস মিলছে। জার্মানি, অস্ট্রিয়া, ডেনমার্ক, নেদারল্যান্ডস ও গ্রিস যৌথভাবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বাইরে তথাকথিত ‘রিটার্ন হাব’ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছে। পরিকল্পনাটি এখনো নীতিগত ও আইন প্রণয়নের পর্যায়ে থাকলেও এটি কার্যকর হলে ইউরোপের আশ্রয় ও প্রত্যাবাসন ব্যবস্থায় একটি মৌলিক পরিবর্তন ঘটবে। এর প্রভাব শুধু ইউরোপেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বাংলাদেশসহ বহু অভিবাসী-উৎস দেশের ওপরও এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়তে পারে।

প্রথমেই একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি। অনেকের ধারণা, ইউরোপ ইতিমধ্যে রিটার্ন হাব চালু করে ফেলেছে। বাস্তবতা তা নয়। ইউরোপীয় কমিশন একটি নতুন রিটার্ন রেগুলেশনের প্রস্তাব দিয়েছে, যা এখনো ইউরোপীয় পার্লামেন্ট এবং সদস্যরাষ্ট্রগুলোর আলোচনার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সম্ভাব্য স্বাগতিক দেশগুলোর সঙ্গে প্রাথমিক যোগাযোগের কথা শোনা গেলেও এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক চুক্তি হয়নি। ফলে বিষয়টিকে নিশ্চিত বাস্তবতা নয়, বরং সম্ভাব্য নীতিগত পরিবর্তন হিসেবেই দেখা উচিত।

তবুও এই উদ্যোগের রাজনৈতিক তাৎপর্য অত্যন্ত গভীর। গত এক দশকে ইউরোপে অভিবাসন একটি নিরাপত্তা ইস্যুর পাশাপাশি নির্বাচনী রাজনীতির অন্যতম কেন্দ্রীয় প্রশ্নে পরিণত হয়েছে। জার্মানি, ফ্রান্স, নেদারল্যান্ডস, ইতালি কিংবা অস্ট্রিয়ার মতো দেশে অভিবাসনবিরোধী দলগুলোর জনপ্রিয়তা বৃদ্ধির পেছনে এই ইস্যুর বড় ভূমিকা রয়েছে। ফলে সরকারগুলো এখন এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চাইছে, যাতে প্রত্যাখ্যাত আশ্রয়প্রার্থীদের দ্রুত ইউরোপের বাইরে সরিয়ে নেয়া যায়।

ইউরোপীয় দেশগুলোর যুক্তিও পুরোপুরি উড়িয়ে দেয়া যায় না। বর্তমানে যাদের বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত হয়, তাদের একটি বড় অংশকে বাস্তবে নিজ দেশে ফেরত পাঠানো সম্ভব হয় না। পরিচয় যাচাই, ভ্রমণ নথি, কূটনৈতিক জটিলতা কিংবা সংশ্লিষ্ট দেশের অনীহার কারণে হাজার হাজার মানুষ বছরের পর বছর ইউরোপে থেকে যান। এতে আশ্রয়ব্যবস্থার ওপর চাপ বাড়ে এবং জনমনে অসন্তোষ সৃষ্টি হয়।

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে প্রশাসনিক দক্ষতা বৃদ্ধির নামে মানবাধিকারের সীমারেখা কোথায় টানা হবে? আন্তর্জাতিক শরণার্থী আইন, ইউরোপীয় মানবাধিকার সনদ এবং ‘নন-রিফাউলমেন্ট’ নীতির মূল উদ্দেশ্য হলো, কোনো ব্যক্তিকে এমন পরিস্থিতিতে পাঠানো যাবে না যেখানে তার নিরাপত্তা বা মৌলিক অধিকার ঝুঁকির মুখে পড়ে। রিটার্ন হাব যদি এমন দেশে স্থাপিত হয় যেখানে কার্যকর বিচারব্যবস্থা, আইনি সহায়তা বা আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ দুর্বল, তাহলে এই নীতির সঙ্গে সংঘাতের আশঙ্কা থেকেই যায়।

অস্ট্রেলিয়ার অফশোর প্রসেসিং মডেলের অভিজ্ঞতা ইতিমধ্যে দেখিয়েছে, দীর্ঘমেয়াদী অনিশ্চয়তা, মানসিক স্বাস্থ্য সংকট এবং আইনি জটিলতা এমন ব্যবস্থার বড় ঝুঁকি। বাংলাদেশের জন্য বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

ইউরোপীয় ইউনিয়ন এজেন্সি ফর অ্যাসাইলামের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশ এখনো ইইউতে আশ্রয়প্রার্থীদের অন্যতম বড় উৎস দেশ। ২০২৫ সালে প্রায় ৩৭ হাজার বাংলাদেশি আশ্রয়ের আবেদন করেছেন। অথচ প্রথম ধাপে অনুমোদনের হার ছিল মাত্র ৩ শতাংশ। অর্থাৎ অধিকাংশ আবেদনকারী শেষ পর্যন্ত প্রত্যাখ্যাত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছেন।

এই পরিসংখ্যান আমাদের সামনে একটি অস্বস্তিকর বাস্তবতা তুলে ধরে। অনেক বাংলাদেশি উন্নত জীবনের আশায় ইউরোপে গিয়ে রাজনৈতিক আশ্রয়কে স্থায়ীভাবে বসবাসের একটি বিকল্প পথ হিসেবে দেখছেন। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, অধিকাংশ আবেদনই আইনি মানদণ্ড পূরণ করতে পারে না। এতে আবেদনকারীরা দীর্ঘ অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েন, আবার বাংলাদেশের ভাবমূর্তিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

এখানে সরকারেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব রয়েছে। শুধু অনিয়মিত অভিবাসন নিরুৎসাহিত করলেই হবে না; বৈধ শ্রম অভিবাসনের নতুন বাজার সৃষ্টি, দক্ষ জনশক্তি তৈরি এবং বিদেশগামীদের বাস্তব তথ্য জানানোও সমান জরুরি। কারণ ভুল প্রত্যাশা অনেক মানুষকে এমন পথে ঠেলে দেয়, যার শেষ পরিণতি হয় প্রত্যাখ্যান, আটক কিংবা জোরপূর্বক প্রত্যাবাসন।

একই সঙ্গে ইউরোপেরও আত্মসমালোচনা প্রয়োজন। অভিবাসনের মূল কারণ কেবল সীমান্ত অতিক্রম করা নয়; এর পেছনে রয়েছে যুদ্ধ, রাজনৈতিক অস্থিরতা, অর্থনৈতিক বৈষম্য, জলবায়ু পরিবর্তন এবং উন্নয়নের অসমতা। এসব কারণ অমীমাংসিত রেখে শুধু প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া কঠোর করলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না।

রিটার্ন হাবের ধারণা ইউরোপের জন্য প্রশাসনিকভাবে সুবিধাজনক হতে পারে। কিন্তু এটি যদি মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক আইনের মৌলিক নীতিকে দুর্বল করে, তাহলে ইউরোপ যে মূল্যবোধের ওপর নিজের পরিচয় গড়ে তুলেছে, সেই নৈতিক অবস্থানই প্রশ্নবিদ্ধ হবে।

বাংলাদেশের জন্যও এটি একটি সতর্কবার্তা। বিশ্বের অভিবাসন নীতি দ্রুত বদলাচ্ছে। আশ্রয়প্রাপ্তির সুযোগ ক্রমেই সীমিত হচ্ছে, যাচাই প্রক্রিয়া আরও কঠোর হচ্ছে এবং প্রত্যাবাসনের গতি বাড়ানোর চেষ্টা চলছে। তাই ভবিষ্যতের কৌশল হওয়া উচিত বৈধ অভিবাসন, দক্ষতা উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান নিশ্চিত করাঅবাস্তব আশার ওপর নির্ভর করা নয়।

রিটার্ন হাব শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হবে কি না, তা সময়ই বলে দেবে। তবে একটি বিষয় নিশ্চিত ইউরোপের অভিবাসন নীতি এখন এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যেখানে নিরাপত্তা ও মানবাধিকার, রাষ্ট্রের সার্বভৌম স্বার্থ ও আন্তর্জাতিক নৈতিক দায়বদ্ধতার মধ্যে নতুন ভারসাম্য খুঁজে বের করাই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
লেখক: সুইজারল্যান্ডভিত্তিক বেসরকারি ব্যাংকিং আর্থিক অপরাধ বিশেষজ্ঞ কলামিস্ট ও কবি।

ই-মেইল: [email protected]

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন