গ্যাস সংকটে উদ্ভূত সমস্যার উন্নতি হয়নি। বাসাবাড়ি থেকে শুরু করে ফিলিং স্টেশন; তীব্র সংকট। অনেক ফিলিং স্টেশনেই পুরোদমে বন্ধ আছে গ্যাস বিক্রি। কিছু কিছু পাম্পে দীর্ঘ লাইন দেখা গেছে। সেসব পাম্পে সামান্য পরিমাণে কিংবা একটা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য গ্যাস আসছে। গ্যাসের আশায় দিনের একটি বড় অংশই পাম্পের লাইনে কাটিয়ে দিচ্ছেন চালকরা। ফলে, যে সময়ে যাত্রী বহন করার কথা সে সময় পাম্পে কাটাতে হচ্ছে চালকদের। এতে আয়ও কমেছে তাদের।
সোমবার সরজমিন ঢাকার অন্তত ৫টি গ্যাস পাম্প সরজমিন ঘুরে দেখা গেছে, সিএনজিচালিত অটোরিকশা আর ব্যক্তিগত গাড়ি দীর্ঘ লাইন ধরে অপেক্ষা করছে গ্যাস নিতে। আগের মতোই একেকটি গাড়ির চালক অন্তত ৪ থেকে ৭ ঘণ্টা অপেক্ষা করছিলেন। গ্যাস স্টেশন থেকে গ্যাস না থাকার বিষয়টি স্পষ্টভাবে ঘোষণা করে জানিয়ে দিলেও চালকরা ভোর থেকেই লাইনে বসে ছিলেন। কেননা, গাড়ি চালানোর মতো গ্যাস নেই।
এমনকি তারা বলছেন, গ্যাস বিক্রি না করলেও, গ্যাসের চাপ আসা মাত্রই যাতে নিয়ে নিতে পারেন সেজন্য আগাম প্রস্তুতি হিসেবে লাইনে অপেক্ষা করছেন। নিউ ইস্কাটনের অনুদিপ সিএনজি স্টেশনে গিয়ে দেখা যায়, পাম্পটিতে আলাদা ব্যক্তিগত গাড়ির লাইন পৌঁছেছে ইস্কাটন গার্ডেন সড়ক হয়ে বাংলামোটর এলাকার প্রধান সড়কের কাছে। মগবাজার রেলগেটের যমুনা সিএনজি স্টেশনের লাইনে ৫০ থেকে ৬০টি সিএনজিচালিত অটোরিকশা থাকলেও একেকজন চালক অন্তত তিন ঘণ্টা ধরে অপেক্ষা করছিলেন। সাত রাস্তার আকিজ ফিলিং স্টেশন গত ৭ দিন ধরে বিক্রি বন্ধ রেখেছে। তেজগাঁও এলাকার অল ইন ওয়ান পাম্পের সামনে ব্যারিকেড দিয়ে রাখা হয়েছে যাতে কোনো যানবাহন পাম্পে ডুকতে না পারে। তবে, পাম্প এলাকার মধ্যে বেশ কয়েকটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও ব্যক্তিগত গাড়িকে পার্ক করে রাখা হয়েছে। একই এলাকার বিআরটিসি পরিচালিত সিটি ফিলিং স্টেশনেও গ্যাস বিক্রি বন্ধ রয়েছে। সিটি ফিলিং স্টেশনের ক্যাশিয়ার শফিকুল ইসলাম বলেন, আমরা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছি। যোগাযোগ করলেই তারা জানায়, গ্যাস নেই। আসলে জানতে পারবেন।
শফিকুল বলেন, গ্যাস আসলে আমাদের স্টেশনেই সংকেত দেয়। আপাতত যখন আসবে তখন আমরা দেখবো।
অন্যদিকে, গ্যাসে সংকট আর পাম্পে দীর্ঘ অপেক্ষার জেরে চালকদের আয় অর্ধেকেরও বেশি কমেছে। সিএনজিচালিত অটোরিকশা চালকরা বলছেন, ভাড়ায় চালিত অটোরিকশার জন্য সময়বেঁধে মালিককে রোজ ৭ শ’ থেকে ১৩শ’ টাকা জমা দিতে হয়। গ্যাসের সংকটের ফলে দীর্ঘ সময় যাত্রী বহন করতে না পারলেও জমার নির্দিষ্ট অংকের টাকা মালিককে বুঝিয়ে দিতে হয়। ফলে, আয় যাই হোক, জমার টাকা পরিশোধ করতেই হচ্ছে চালকদের। আবার, জমার টাকার পরিমাণ আয় করা গেলেও নিজেদের বেতন জোগাড় করতে হিমশিম খেতে হয় বলে জানান অটোরিকশা চালকরা। তারা জানিয়েছেন, আগে গড়ে ৮শ’ থেকে ১ হাজার টাকা আয় থাকলেও এখন সেটি নেমে ৩ থেকে ৫শ’ টাকায় এসেছে।
মগবাজার রেলগেট এলাকার যমুনা অটোতে গ্যাসের জন্য অপেক্ষা করছিলেন সিএনজিচালিত অটো চালক রবিউল। তিনি মানবজমিনকে বলেন, দুই ঘণ্টা যাবৎ বসে আছি গ্যাস নিতে। আজ গ্যাস নিলেও আর গাড়ি চালানোর সুযোগ নেই। কেননা, বিকাল চারটার মধ্যে আমাদের গাড়ি ভাড়া নেয়ার সময় শেষ। গ্যাসের জন্য এখন চালানোই যাচ্ছে না, আবার যাত্রীদের থেকে বেশি ভাড়াও চাওয়া যাচ্ছে না। তার উপর মহাজনরা এক পয়সাও কম রাখছে না জমার টাকা। সব মিলিয়ে আগে জমা দিয়ে ১ হাজার টাকা থাকতো। এখন তা কমে ৩শ’ থেকে ৫শ’ টাকা পর্যন্ত থাকছে। তার উপর আমরা যদি ভালোমতো খাবার খাই, এটাও আর থাকে না।
তেজগাঁওয়ের অল ইন ওয়ান পাম্পে গ্যাস নিতে অপেক্ষা করছিলেন মোহাম্মদ মোস্তফা। তিনি বলেন, এই সংকটের মাঝে কোনোদিন মালিককে জমা না দিতে পারলে সেটি বকেয়ার খাতায় তুলে রাখে। পরিস্থিতি এখন এমন জমা উঠবে কোথা থেকে? মালিককে জমা দিতে হয় ১ হাজার টাকা। দিন শেষে আয় থাকে ৪ থেকে ৫শ’ টাকা। কে বুঝবে এই সমস্যা? এই সামান্য টাকা দিয়ে শহরে চলা সম্ভব না কোনোভাবেই। ৫শ’ টাকার মধ্যে খাওয়া-দাওয়ার টাকাও আছে। এরপর পরিবার কী করে চলবে?
মোহাম্মদ ইব্রাহিম তেজগাঁওয়ের রাস্তায় সিটি ফিলিং স্টেশনের কাছে গাড়ি নিয়ে অপেক্ষা করছিলেন। কথা হলে তিনি বলেন, এখন আর আগের মতো আয় করা সম্ভব না। দিন শেষে আয় ৫শ’ টাকাও থাকে না। খাবারের কথা বাদ দিলাম। দুপুর ৩টার দিকে ব্যক্তিগত গাড়িচালক শহিদুল বলেন, সকাল ৮টায় পাম্পে এসেছি। বুঝতে পারছি গ্যাস নেই। কিন্তু, একটা সময় হয়তো গ্যাস আসবে। আমি না অপেক্ষা করলে কেউ না কেউ লাইনে দাঁড়াবেই।
ভাসমান টার্মিনালের ত্রুটি সারতে কতো সময় লাগবে; জানতে চাইলে বাংলাদেশ তেল ও খনিজ সম্পদ কর্পোরেশনের (পেট্রোবাংলা) চেয়ারম্যান মো. আব্দুল মান্নান মানবজমিনকে বলেন, আমরা আশা করছি ৩১শে জুলাইয়ের মধ্যে টার্মিনাল পার্শিয়ালি চালু করা যাবে। টার্মিনালের ত্রুটি ঠিক করতে দেশি-বিদেশি অন্তত ২০ জন টেকনিক্যাল এক্সপার্ট কাজ করছেন।
প্রসঙ্গত, দেশে আমদানি করা এলএনজি রূপান্তর করে সরবরাহের জন্য কক্সবাজারের মহেশখালীস্থ দু’টি ভাসমান টার্মিনাল রয়েছে। এর একটি টার্মিনাল পরিচালনা করে মার্কিন কোম্পানি এক্সিলারেট এনার্জি ও আরেকটি বেসরকারি কোম্পানি সামিট। এর মধ্যে গত ২১শে জুলাই আগুন লেগে এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনাল থেকে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। এরপর দেশে গ্যাসের সংকট বেড়ে যায়।
