একটি গরু কেনার মধ্যদিয়ে শুরু হয়েছিল যাত্রা। তিন দশক পর সেই একটি গরুই বদলে দিয়েছে কৃষির চিত্র। এখন শতাধিক গরুর খামার, প্রতিদিন শত শত লিটার দুধ, গোবর থেকে বায়োগ্যাস, বিদ্যুৎ ও জৈব সার উৎপাদন সব মিলিয়ে একটি খামার হয়ে উঠেছে দেশের টেকসই কৃষির এক অনুকরণীয় মডেল। আর এই স্বপ্ন সাফল্যের কারিগর পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলার লক্ষীকুন্ডা ইউনিয়নের বুড়ামপুর গ্রামের আমিরুল ইসলাম (৫৮)।
মায়ের একটি ছোট্ট ইচ্ছা- ঘরে একটি গরু থাকবে, যাতে সংসার ও ক্ষেতের কোনো জৈব বর্জ্য নষ্ট না হয়। সেই সাধারণ ইচ্ছাকেই জীবনের লক্ষ্য বানিয়ে আজ একটি আধুনিক সমন্বিত ডেইরি খামারের সফল উদ্যোক্তা আমিরুল ইসলাম। তার খামারে এখন ১০০টিরও বেশি গরু রয়েছে। প্রতিদিন উৎপাদিত হচ্ছে ৪৫০-৫০০ লিটার দুধ। তবে শুধু দুধ উৎপাদনেই সীমাবদ্ধ নেই এই খামার। গোবর থেকে উৎপাদিত হচ্ছে বায়োগ্যাস ও বিদ্যুৎ, আর অবশিষ্টাংশ দিয়ে তৈরি হচ্ছে জৈব সার। এমনকি বর্জ্য পানি পর্যন্ত ব্যবহার হচ্ছে কৃষিজমির সেচে। ফলে তার খামারে কিছুই নষ্ট হয় না। তিন দশক আগে আমিরুল ইসলাম ছিলেন বিএসসি পড়ুয়া এক তরুণ। তখন তার জীবনের লক্ষ্য ছিল না খামারি হওয়া। কিন্তু বাবার মৃত্যুর পর পারিবারিক দায়িত্ব কাঁধে এসে পড়ে। ঠিক সেই সময় তার মা একটি গরু কেনার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। ১৪ হাজার ৬০০ টাকায় একটি সংকর জাতের গাভী কেনেন সে। সেই একটি গরুই আজ শতাধিক গবাদিপশুর বিশাল খামারের ভিত্তি। আমিরুল ইসলাম বলেন, মা বলেছিলেন, বাড়ি ও ক্ষেতের কোনো জৈব বর্জ্য যেন নষ্ট না হয়। গরু থাকলে সবই কাজে লাগবে। সেই ভাবনা থেকেই যাত্রা শুরু। প্রথম গাভীটি পরে তিনটি বাছুর দেয়। একটি বিক্রি করে দুটি রেখে দিই। পাঁচ-ছয় বছরের মধ্যে প্রায় এক ডজন দুধেল গরু হয়ে যায়। দুধ উৎপাদন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নতুন চিন্তা আসে গোবর ব্যবস্থাপনা নিয়ে।
প্রায় দুই দশক আগে ছোট একটি বায়োগ্যাস প্লান্ট স্থাপন করে রান্নার জ্বালানির চাহিদা মেটালেও বিপুল পরিমাণ গোবর তখনো অব্যবহৃত থাকতো। এই সমস্যার স্থায়ী সমাধানে গত বছর প্রায় দেড় কোটি টাকা ব্যয়ে ১০০ বর্গমিটার আয়তনের আধুনিক বায়োগ্যাস উৎপাদন কেন্দ্র গড়ে তোলেন তিনি। প্রকল্পের ৪০ শতাংশ অর্থ তিনি নিজেই বিনিয়োগ করেছেন। খামার ঘুরে দেখা যায়, যন্ত্রের মাধ্যমে গোবর প্রক্রিয়াজাতকরণ চেম্বারে পাঠানো হচ্ছে। পাইপলাইনের মাধ্যমে তৈরি হচ্ছে বায়োগ্যাস, যা পরিশোধনের পর সংরক্ষণ করা হয়। এরপর অবশিষ্ট কঠিন অংশ থেকে তৈরি হচ্ছে জৈব সার এবং তরল অংশ কৃষি জমিতে সেচের কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। আমিরুল বলেন, গোবর থেকে প্রথমে গ্যাস তৈরি হয়। এরপর যে কঠিন অংশ থাকে, তা দিয়ে জৈব সার বানানো হয়। আর বাকি তরল অংশ জমিতে সেচে ব্যবহার করা হয়। এখানে কোনো কিছুই ফেলে দেয়া হয় না। বর্তমানে এই প্লান্ট থেকে প্রায় ১৫টি পরিবারের রান্নার গ্যাসের চাহিদা পূরণ হচ্ছে। পাশাপাশি দু’টি জেনারেটরের মাধ্যমে ৩০ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হচ্ছে, যা খামারের অধিকাংশ যন্ত্রপাতি চালাতে ব্যবহৃত হচ্ছে। জৈব সার উৎপাদনের জন্য অবশিষ্ট কঠিন অংশ শুকিয়ে গুঁড়া করা হয়।
এরপর বিশেষ জৈব উপাদান মিশিয়ে তৈরি করা হয় উন্নতমানের জৈব সার। প্রতিদিন প্রায় ১০ থেকে ১২ মণ সার উৎপাদিত হচ্ছে। প্রতি কেজি সার বিক্রি হচ্ছে ৬০ টাকায়। নিজের জমিতে ব্যবহারের পাশাপাশি আশপাশের কৃষকরাও এই সার কিনে নিয়ে যাচ্ছেন। তবে পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন চালাতে প্রতিদিন অন্তত ৮৫ মণ গোবর প্রয়োজন। অথচ তার নিজস্ব খামারে উৎপাদিত হয় ৪০ থেকে ৫০ মণ। তাই আশপাশের খামার থেকে আরও গোবর সংগ্রহ করতে পারলে উৎপাদন প্রায় দ্বিগুণ করা সম্ভব বলে মনে করেন তিনি। আমিরুল ইসলামের এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগ ইতিমধ্যে আশপাশের খামারিদেরও অনুপ্রাণিত করেছে। বুড়ামপুর ও পাশের পাকুরিয়া গ্রামের অন্তত ২০ থেকে ২৫ জন খামারি তার দেখানো পথ অনুসরণ করে নিজেদের খামারে ছোট আকারের বায়োগ্যাস প্লান্ট স্থাপন করেছেন। ঈশ্বরদী উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা আখলিমা খাতুন বলেন, বড় ডেইরি খামারি অনেকেই আছেন। তবে আমিরুল ইসলামের মতো এত বড় বিনিয়োগ করে একটি প্রচলিত ডেইরি খামারকে সমন্বিত আধুনিক কৃষি উদ্যোগে রূপান্তর করার উদাহরণ খুবই বিরল। তার এই মডেল একইসঙ্গে দুধ, মাংস, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও জৈব সার উৎপাদন করছে। পরিবেশবান্ধব ও লাভজনক কৃষির জন্য এটি একটি অনুকরণীয় উদাহরণ।
