সুন্দরবনের কোল ঘেঁষে বয়ে চলা নদীগুলোর পাড়ে গেলেই দেখা যায় এক পরিচিত দৃশ্য। মহিলারা সুন্দরবনের নদীতে ভেসে আসা ফল, ডালপালা ও লতাগুল্ম সংগ্রহ করছেন। উপকূলীয় মানুষের কাছে এই ভেসে আসা ফল কাঠ কেবল জঞ্জাল নয়, বরং এটি তাদের সারা বছরের রান্নার প্রধান জ্বালানির অন্যতম অনুষঙ্গ। সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার সুন্দরবন সংলগ্ন দাঁতিনাখালী গ্রামের সোহেলী বেগম, সোনাভানু বেগম, সেলিনা খাতুন, সাজিদা আক্তার তালবাড়ীয়া গ্রামের, করুণা রাণী, শংকরী রাণী, সুনিতা রাণীসহ বেশ কয়েকজন নারী জানান, সুন্দরবন থেকে নানা ধরনের ডালপালা, ফল তাদের নদীর কিনারে ভেসে আসে, তারা ফলগুলো সংগ্রহ করে রোদে শুকিয়ে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করেন। মূলত ভেতরের অংশ ফেলে দিয়ে খোসাটা জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করেন।
তবে কাজটা যতটা সহজ মনে হয়, বাস্তবে তা নয়। ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাদায় লোনা পানিতে ভিজে এই কাঠ সংগ্রহ করতে হয়, যা স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায়। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে নদীতে লোনা পানির উচ্চতা বাড়ছে। একদিকে জোয়ারের সঙ্গে কাঠ ভেসে এলেও অন্যদিকে তীব্র জলোচ্ছ্বাস উপকূলীয় মানুষের ঘরবাড়ি তছনছ করে দিচ্ছে। বনবিভাগ বন রক্ষার জন্য কঠোর নিয়ম জারি রেখেছে, তবুও নদী থেকে ভেসে আসা এসব উপকরণ সংগ্রহে তারা সাধারণত মানবিক কারণেই বাধা দেয় না। সাতক্ষীরা রেঞ্জের এসিএফ মশিউর রহমান সুন্দরবনের ভাসমান ফল সম্পর্কে বলেন, প্রাকৃতিকভাবে সুন্দরবনের গাছ থেকে বিভিন্ন ফল নিচে পড়ে সুন্দরবনের মধ্যে কিছু চারা গজায় এবং অধিকাংশ ফল জোয়ারের পানিতে ভেসে গিয়ে নদীর কিনারে জমা হয়। এসব ফল গ্রামের নারীরা সংগ্রহ করে নিয়ে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করে। ফলে একদিকে উপকূলীয় নারীদের সাময়িক জ্বালানি সমস্যার সমাধান হলেও পরিবেশের জন্য এর ক্ষতির পরিমাণ বেশি, কেননা এসব ফল থেকে প্রাকৃতিকভাবে নদীর চরে বনায়ন গড়ে উঠতো। সম্প্রতি গ্রিন কোয়ালিশন ও শ্যামনগর উপজেলা স্বেচ্ছাসেবী এসোসিয়েশনের উদ্যোগে বনবিভাগ এবং শ্যামনগর উপজেলা নির্বাহী অফিসার বরাবর স্মারকলিপি প্রদান করা হয়। পরিবেশবাদী এই সংগঠনটির বক্তব্য, সুন্দরবনের নদী ও জোয়ারের মাধ্যমে ভেসে আসা বনজ বীজ নতুন নতুন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে এবং প্রাকৃতিকভাবে ম্যানগ্রোভ বনায়ন সৃষ্টি করে। এসব বীজ নির্বিচারে সংগ্রহ করা হলে সুন্দরবনের স্বাভাবিক পুনর্জন্ম বাধাগ্রস্ত হয় এবং দীর্ঘমেয়াদে বন প্রতিবেশ, জীববৈচিত্র্য ও উপকূলীয় নিরাপত্তার উপর বিরূপ প্রভাব পড়ে। অতএব, যেকোনো ভাবে এসব বনজ বীজ সংগ্রহ বন্ধ করতে হবে। বনজ এসব বীজ সংগ্রহ সুন্দরবনের নতুন বনায়ন সৃষ্টিতে বাধা সৃষ্টি করছে যেমন সত্য তেমনি জোয়ারে ভেসে আসা এই কাঠ-বীজ হাজারো দরিদ্র উপকূলবাসীর জীবন-জীবিকার সঙ্গে জড়িত। তাই এসব বিষয় মাথায় রেখে সরকারকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে এমনটা জানিয়েছেন উপকূলের খেটে খাওয়া মানুষ।
