সংস্কার ও দাবি নিষ্পত্তিতে গতি আনতে পারলেই আস্থা ফিরবে বীমায়

সংস্কার ও দাবি নিষ্পত্তিতে গতি আনতে পারলেই আস্থা ফিরবে বীমায়

ফন্ট সাইজ:

জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার সম্ভাবনা থাকলেও নানা কাঠামোগত দুর্বলতা, সুশাসনের ঘাটতি এবং প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার কারণে দেশের বীমা খাত এখনও প্রত্যাশিত অবস্থানে পৌঁছাতে পারেনি। দাবি নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রতা, গ্রাহকের আস্থার সংকট, সীমিত ডিজিটাল অবকাঠামো, দুর্বল ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং আন্তর্জাতিক মানের পণ্য ও সেবার অভাবের কারণে দেশের মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) বীমা খাতের অবদান এখনও খুবই সীমিত।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অর্থনীতির আকার যত বাড়ছে, শিল্পায়ন, অবকাঠামো উন্নয়ন, স্বাস্থ্যসেবা ও জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলায় বীমার প্রয়োজনীয়তাও তত বাড়ছে। কিন্তু সেই তুলনায় দেশের বীমা খাত আধুনিকায়নের গতি এখনও ধীর। ফলে ব্যক্তি, ব্যবসা ও বিনিয়োগ-সব ক্ষেত্রেই সম্ভাবনার বড় একটি অংশ অনাবিষ্কৃত থেকে যাচ্ছে।

এ প্রেক্ষাপটে অর্থনীতিবিদ, নিয়ন্ত্রক সংস্থা এবং বীমা খাতের শীর্ষ উদ্যোক্তারা মনে করছেন, সুনির্দিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্কার, পূর্ণাঙ্গ ডিজিটালাইজেশন, আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্ব এবং উদ্ভাবনী বীমা পণ্য চালুর মাধ্যমে খাতটিকে নতুন উচ্চতায় নেওয়া সম্ভব। তাদের মতে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দাবি নিষ্পত্তি নিশ্চিত করা, পলিসি ইস্যু থেকে শুরু করে আন্ডাররাইটিং, এনডোর্সমেন্ট ও ক্লেইম স্যাটেলমেন্ট পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো এখন সময়ের দাবি। পাশাপাশি বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় বীমা ও পুনর্বীমা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগ, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলার উদ্যোগও জরুরি।

বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) চেয়ারম্যান মীর নাদিয়া নিভিন বলেছেন, দেশের বীমা খাতকে আরও শক্তিশালী, স্বচ্ছ ও টেকসই করতে প্রচলিত পরিপালন-ভিত্তিক তদারকি ব্যবস্থা থেকে ঝুঁকি-ভিত্তিক তদারকি ব্যবস্থায় উত্তরণ এখন অত্যন্ত প্রয়োজন। তিনি বলেন, বীমা খাতের সার্বিক উন্নয়নে দাবি নিষ্পত্তির সক্ষমতা বৃদ্ধি, নীতিগত সুশাসন প্রতিষ্ঠা, আর্থিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা এবং কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ও তদারকি ব্যবস্থা গড়ে তোলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এসব কৌশলগত লক্ষ্য অর্জনে আইডিআরএ আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন আধুনিক নিয়ন্ত্রক কাঠামো গড়ে তুলতে নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করে যাবে। আইডিআরএ সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে ঝুঁকি-ভিত্তিক তদারকি চালুর প্রস্তুতির পাশাপাশি বীমা প্রতিষ্ঠানের মূলধন সক্ষমতা, করপোরেট গভর্ন্যান্স, ঝুঁকি মূল্যায়ন এবং তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি জোরদারের উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। এর মাধ্যমে দুর্বল প্রতিষ্ঠানগুলোকে আগেভাগেই শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া সহজ হবে।

দেশের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার কাঠামোগত পরিবর্তনে বীমাকে কেন্দ্রীয় ভূমিকা দেয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইকোনমিক রিসার্চ (সিএসইআর)-এর চেয়ারপারসন এবং ল্যাবএইড হাসপাতাল গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাকিফ শামীম। তিনি বলেন, বাংলাদেশের মতো দ্রুত বিকাশমান অর্থনীতিতে বীমা খাতকে শুধু একটি আর্থিক সেবা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; এটিকে জাতীয় ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার অন্যতম প্রধান ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিকভাবে বীমা খাতের সফলতা অনেকাংশেই নির্ভর করে দ্রুত ও স্বচ্ছ ক্লেইম নিষ্পত্তির ওপর। বাংলাদেশেও যদি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে গ্রাহকের দাবি পরিশোধ নিশ্চিত করা যায়, তাহলে খাতটির প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে।

সাকিফ শামীম বলেন, দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় দুর্বলতার একটি হলো চিকিৎসা ব্যয়ের বড় অংশ সরাসরি জনগণের পকেট থেকে পরিশোধ করতে হয়। একটি কার্যকর ইউনিভার্সাল হেলথ ইন্স্যুরেন্স চালু করা গেলে মানুষের চিকিৎসা ব্যয়ের বড় অংশ বীমার আওতায় আসবে, ফলে ব্যক্তিগত আর্থিক ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাবে। তার মতে, সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে বেসরকারি হাসপাতাল, বীমা কোম্পানি, ফিনটেক প্ল্যাটফর্ম এবং ইন্সুরটেক স্টার্টআপগুলোর মধ্যে কার্যকর অংশীদারিত্ব গড়ে তুলতে হবে। প্রযুক্তিনির্ভর স্বচ্ছ অবকাঠামো তৈরি করা গেলে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়বে এবং স্বাস্থ্য খাতে নতুন বিনিয়োগের সুযোগও সৃষ্টি হবে। তিনি বলেন, শুধু স্বাস্থ্যবীমা নয়, কৃষিবীমা, জলবায়ু ঝুঁকি বীমা, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ বীমা এবং দুর্যোগ-পরবর্তী ক্ষতি মোকাবিলায় আধুনিক বীমা পণ্য চালু করা সময়ের দাবি। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশ যেহেতু সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি, তাই এই খাতে বিশেষায়িত বীমা পণ্য অর্থনীতির স্থিতিশীলতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

বীমা খাতে প্রযুক্তিনির্ভর গ্রাহকসেবা ও উদ্ভাবনী পণ্য চালুর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন গ্রিন ডেল্টা ইন্স্যুরেন্স পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ফারজানা চৌধুরী। তিনি বলেন, ভবিষ্যতের বীমা বাজার পুরোপুরি নির্ভর করবে স্বয়ংক্রিয় গ্রাহকসেবা এবং পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল সমাধানের ওপর। তাই প্রচলিত পদ্ধতি থেকে বেরিয়ে এসে ডিজিটালাইজড আন্ডাররাইটিং, অটোমেটেড ক্লেইম প্রসেসিং এবং তথ্যভিত্তিক ঝুঁকি মূল্যায়ন নিশ্চিত করতে হবে। তিনি বলেন, গ্রাহকসেবাকে আরও সহজ, দ্রুত ও স্বচ্ছ করতে প্রযুক্তির কোনো বিকল্প নেই। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে পলিসি গ্রহণ, নবায়ন, প্রিমিয়াম পরিশোধ এবং দাবি নিষ্পত্তি করা গেলে গ্রাহকের সময় ও ব্যয় দুটিই কমবে। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন বীমা পণ্য, সাইবার ইন্স্যুরেন্স, সাপ্লাই চেইন প্রোটেকশন এবং নতুন ঝুঁকিভিত্তিক বীমা সেবা চালুর মাধ্যমে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগ পরিবেশকে আরও স্থিতিশীল করা সম্ভব। একই সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ডেটা অ্যানালিটিক্স এবং ডিজিটাল যাচাই ব্যবস্থা ব্যবহার করে প্রতারণা কমানো এবং সেবার মান উন্নয়ন করা যাবে।

খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, বাংলাদেশের বীমা শিল্প এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে দ্রুত সম্প্রসারণশীল অর্থনীতি, অন্যদিকে জলবায়ু পরিবর্তন, স্বাস্থ্যঝুঁকি, সাইবার নিরাপত্তা ও বৈশ্বিক বাণিজ্যের নতুন বাস্তবতা-সব মিলিয়ে আধুনিক বীমা ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি।

বীমা খাত নিয়ে সিএসইআর'র বিশ্লেষণ:
বীমা খাত নিয়ে সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইকোনমিক রিসার্চ (সিএসইআর)-এর চেয়ারপারসন এবং ল্যাবএইড হাসপাতাল গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাকিফ শামীম সম্প্রতি সংস্থাটির বিশ্লেষণ তুলে ধরেছেন। ওই বিশ্লেষণে বলা হয়- বাংলাদেশ বর্তমানে এলডিসি-পরবর্তী অর্থনৈতিক বাস্তবতার দিকে অগ্রসর হচ্ছে। উচ্চ-মধ্যম আয়ের অর্থনীতিতে পরিণত হওয়ার লক্ষ্য অর্জনে দেশকে উৎপাদন, অবকাঠামো, স্বাস্থ্যসেবা, প্রযুক্তি, জ্বালানি ও রপ্তানিমুখী শিল্পে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ দেশীয় ও বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে হবে। কিন্তু বিনিয়োগ আকর্ষণ শুধু কর-সুবিধা, অর্থনৈতিক অঞ্চল কিংবা উন্নত অবকাঠামোর ওপর নির্ভর করে না; এটি নির্ভর করে একটি দেশের সামগ্রিক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থার ওপরও। আর সেই জায়গায় একটি আধুনিক, স্বচ্ছ ও প্রযুক্তিনির্ভর ইন্স্যুরেন্স খাত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

বিশ্বের উন্নত অর্থনীতিতে বীমা খাতকে কেবল একটি আর্থিক সেবা খাত হিসেবে দেখা হয় না; বরং এটি অর্থনীতির ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার অন্যতম ভিত্তি। যেমন; সড়ক, বিদ্যুৎ, বন্দর কিংবা ডিজিটাল অবকাঠামো ব্যবসা পরিচালনার জন্য অপরিহার্য, তেমনি একটি কার্যকর বীমা ব্যবস্থা বিনিয়োগ, শিল্পায়ন এবং ব্যবসার ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করার অন্যতম পূর্বশর্ত। কারণ, বিনিয়োগকারীরা সম্ভাব্য মুনাফার হিসাব করেই থেমে থাকেন না; তারা এটিও বিবেচনা করেন যে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতিতে তাদের সম্পদ, প্রকল্প কিংবা দায় কত দ্রুত ও কতটা কার্যকরভাবে সুরক্ষিত হবে। যদি দাবি নিষ্পত্তি দীর্ঘসূত্রতায় ভোগে, নীতিমালায় স্বচ্ছতার ঘাটতি থাকে কিংবা নিয়ন্ত্রক কাঠামো দুর্বল হয়, তাহলে একটি দেশের ঝুঁকি মূল্যায়ন বেড়ে যায় এবং এর সরাসরি প্রভাব পড়ে বিনিয়োগ সিদ্ধান্তের ওপর।

বাংলাদেশে অবকাঠামো উন্নয়ন, অর্থনৈতিক অঞ্চল, মেগা প্রকল্প এবং শিল্পায়নে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হলেও ইন্স্যুরেন্স খাত এখনও সেই গতিতে আধুনিকায়িত হয়নি। অনেক ক্ষেত্রেই দাবি নিষ্পত্তিতে বিলম্ব, দুর্বল করপোরেট গভর্ন্যান্স, সীমিত ডিজিটাল সেবা এবং আন্তর্জাতিক মানের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার অভাব বিনিয়োগকারীদের আস্থাকে প্রভাবিত করে।

ফলে দেশীয় ও বিদেশি উভয় বিনিয়োগকারীকেই ব্যবসায়িক ঝুঁকি মোকাবিলায় অতিরিক্ত সতর্ক থাকতে হয়। এই বাস্তবতায় ইন্স্যুরেন্স খাতের সংস্কারকে আর কেবল একটি খাতভিত্তিক উদ্যোগ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; এটি এখন জাতীয় অর্থনৈতিক কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই বাস্তবতায় প্রাইভেট সেক্টরের অংশগ্রহণকে ইন্স্যুরেন্স খাতের উন্নয়নের কেন্দ্রীয় উপাদান হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। বিশ্বের উন্নত অর্থনীতিগুলোতে বীমা খাতের সম্প্রসারণে সরকার ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার পাশাপাশি শিল্পপ্রতিষ্ঠান, ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, প্রযুক্তি কোম্পানি এবং বৃহৎ করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কারণ, বীমার প্রকৃত বিস্তার তখনই ঘটে, যখন এটিকে কেবল একটি আর্থিক পণ্য হিসেবে বিবেচনা না করে ব্যবসা পরিচালনা ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা হয়।

প্রথমত, দাবি নিষ্পত্তি ব্যবস্থাকে আরও দ্রুত, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করতে হবে। আইনগতভাবে নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে ক্লেইম নিষ্পত্তি নিশ্চিত করা গেলে গ্রাহকের আস্থা যেমন বাড়বে, তেমনি আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের কাছেও ইতিবাচক বার্তা পৌঁছাবে। একই সঙ্গে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ-এর নেতৃত্বে আন্তর্জাতিক মানের নিয়ন্ত্রক কাঠামো ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন। করপোরেট গভর্ন্যান্স, স্বাধীন নিরীক্ষা, তথ্য প্রকাশ এবং গ্রাহক সুরক্ষার বিষয়গুলোও আরও শক্তিশালী করতে হবে, যাতে পুরো খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠিত হয়।

দ্বিতীয়ত, ইন্স্যুরেন্স খাতের ডিজিটাল রূপান্তরকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। পলিসি ইস্যু, নবায়ন, আন্ডাররাইটিং, ক্লেইম প্রসেসিং এবং গ্রাহকসেবার প্রতিটি ধাপে ইন্স্যুরটেক-এর ব্যবহার বাড়ানো প্রয়োজন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বিগ ডেটা, ব্লকচেইন, ডিজিটাল আন্ডাররাইটিং এবং স্বয়ংক্রিয় ক্লেইম ব্যবস্থাপনা শুধু সেবার গতি ও স্বচ্ছতাই বাড়াবে না; বরং প্রতারণা কমাবে এবং ঝুঁকি মূল্যায়নকে আরও নির্ভুল করবে। একটি আধুনিক ডিজিটাল ইন্স্যুরেন্স ইকোসিস্টেম আন্তর্জাতিক ব্যবসা ও বিনিয়োগের জন্য বাংলাদেশকে আরও আকর্ষণীয় গন্তব্যে পরিণত করতে পারে। পাশাপাশি দেশীয় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে বীমা খাতের উন্নয়নের কৌশলগত অংশীদার হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। উৎপাদন শিল্প, রপ্তানিমুখী প্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্যসেবা, তথ্যপ্রযুক্তি, নির্মাণ, লজিস্টিকস, কৃষি এবং এসএমই খাতের সঙ্গে সমন্বিত বীমা কাঠামো গড়ে তুললে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা আরও কার্যকর হবে।

তৃতীয়ত, বিদেশি ইন্স্যুরেন্স ও রি-ইন্স্যুরেন্স প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারিত্ব গড়ে তোলা প্রয়োজন। বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় বীমা প্রতিষ্ঠানগুলোর রয়েছে উন্নত ঝুঁকি বিশ্লেষণ প্রযুক্তি, শক্তিশালী মূলধন, বৈশ্বিক অভিজ্ঞতা এবং বিশেষায়িত বীমা পণ্য উন্নয়নের সক্ষমতা। যৌথ উদ্যোগ, প্রযুক্তি স্থানান্তর, দক্ষতা উন্নয়ন এবং উদ্ভাবনী বীমা পণ্যের মাধ্যমে এসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সহযোগিতা বাংলাদেশের পুরো ইন্স্যুরেন্স খাতকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারে। বিশেষ করে অবকাঠামো, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, স্বাস্থ্যসেবা, তথ্যপ্রযুক্তি, বিমান চলাচল, সামুদ্রিক বাণিজ্য এবং বৃহৎ শিল্প প্রকল্পের জন্য আন্তর্জাতিক মানের বীমা কাঠামো গড়ে তুলতে এই অংশীদারিত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

চতুর্থত, ইউনিভার্সাল হেলথ ইন্স্যুরেন্স বাস্তবায়নের মাধ্যমে মানুষের স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা প্রয়োজন। বর্তমানে বাংলাদেশে মোট স্বাস্থ্য ব্যয়ের একটি বড় অংশই মানুষকে নিজস্ব অর্থ থেকে বহন করতে হয়, যার ফলে প্রতিবছর অসংখ্য পরিবার চিকিৎসা ব্যয়ের কারণে আর্থিক সংকটে পড়ে বা দারিদ্র্যের ঝুঁকিতে চলে যায়। একটি কার্যকর ইউনিভার্সাল হেলথ ইন্স্যুরেন্স ব্যবস্থা চালু করা গেলে চিকিৎসা ব্যয়ের ঝুঁকি ব্যক্তি বা পরিবারের ওপর এককভাবে না পড়ে বৃহত্তর বীমা ব্যবস্থার মাধ্যমে ভাগাভাগি হবে। এর ফলে স্বাস্থ্যসেবা আরও সহজলভ্য হবে, সময়মতো চিকিৎসা গ্রহণের প্রবণতা বাড়বে এবং নাগরিকদের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে। একই সঙ্গে একটি শক্তিশালী স্বাস্থ্যবীমা ব্যবস্থা সরকারি হাসপাতাল, বেসরকারি হাসপাতাল, বীমা প্রতিষ্ঠান এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার মধ্যে সমন্বিত স্বাস্থ্য অর্থায়নের ভিত্তি গড়ে তুলবে, যা দীর্ঘমেয়াদে দেশের স্বাস্থ্যখাতের টেকসই উন্নয়ন এবং অর্থনীতির উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। একই সঙ্গে স্বাস্থ্যবীমা, কৃষিবীমা, জলবায়ু ঝুঁকি বীমা, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষায়িত বীমা এবং ডিজিটাল ব্যবসার জন্য সাইবার ঝুঁকি বীমার মতো নতুন পণ্যের প্রসার ঘটাতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি হিসেবে বাংলাদেশের জন্য এসব বীমা শুধু সামাজিক সুরক্ষার বিষয় নয়; বরং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও বিনিয়োগ সুরক্ষারও গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।

বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ ও উদ্ভাবন ইনসুরেন্স শিল্পের ডিজিটাল রূপান্তরকেও ত্বরান্বিত করতে পারে। ফিনটেক প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস এবং ব্যাংকগুলোর সঙ্গে সমন্বিত সেবা চালু করা গেলে বীমা গ্রহণ ও দাবি নিষ্পত্তি আরও সহজ, দ্রুত ও স্বচ্ছ হবে।
একটি শক্তিশালী ইন্স্যুরেন্স খাত দেশের আর্থিক বাজারের উন্নয়নেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বিশ্বের বহু দেশে বীমা কোম্পানিগুলো সরকারি বন্ড, করপোরেট বন্ড এবং দীর্ঘমেয়াদি অবকাঠামো প্রকল্পে অন্যতম বৃহৎ প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এই সক্ষমতা গড়ে তোলা গেলে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের নতুন উৎস তৈরি হবে, পুঁজিবাজারের গভীরতা বাড়বে এবং অর্থনীতির সামগ্রিক আর্থিক ভিত্তি আরও শক্তিশালী হবে।

সর্বোপরি, একটি আধুনিক ইনসুরেন্স ইকোসিস্টেম গড়ে তোলা কেবল সরকারের একক দায়িত্ব নয়; এটি সরকার, নিয়ন্ত্রক সংস্থা, বীমা কোম্পানি, বিদেশি অংশীদার এবং দেশীয় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত প্রচেষ্টার ফল। প্রাইভেট সেক্টর যত বেশি বীমাকে তাদের ব্যবসায়িক কৌশল, বিনিয়োগ পরিকল্পনা এবং করপোরেট গভর্ন্যান্সের অংশ হিসেবে গ্রহণ করবে, ততই দেশের বীমা বাজার গভীর হবে, বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়বে এবং বাংলাদেশের অর্থনীতি আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় আরও শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হবে।

বাংলাদেশ আগামী দশকে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম বিনিয়োগ ও শিল্পায়নের কেন্দ্র হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে চায়। সেই লক্ষ্য অর্জনে শুধু বিনিয়োগ আহ্বান করলেই হবে না; বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি নির্ভরযোগ্য ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কাঠামোও নিশ্চিত করতে হবে। একটি শক্তিশালী, স্বচ্ছ, প্রযুক্তিনির্ভর এবং আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন ইন্স্যুরেন্স খাত শুধু বীমা শিল্পের উন্নয়নই ঘটাবে না; বরং বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি, শিল্পায়নের গতি ত্বরান্বিত করা এবং টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে। কারণ, পুঁজি সবসময় সেই অর্থনীতির দিকেই প্রবাহিত হয়, যেখানে ঝুঁকি সুশাসিত, নীতিমালা স্থিতিশীল এবং ভবিষ্যৎ সম্পর্কে বিনিয়োগকারীদের আস্থা সুদৃঢ়।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন