গ্রিন কার্ড পাইয়ে দিতে দুই নারীকে সাজানো বিয়ে দেন এপস্টেইন

গ্রিন কার্ড পাইয়ে দিতে দুই নারীকে সাজানো বিয়ে দেন এপস্টেইন

ফন্ট সাইজ:

গ্রিন কার্ড পাইয়ে দেয়ার জন্য দুই নারীর সাজানো বিয়ের আয়োজন করেন মার্কিন ধনকুবের ও দণ্ডিত যৌন অপরাধী জেফ্রি এপস্টেইন। তার মধ্যে অন্যতম ডা. কারিনা শুলিয়াক। তার সঙ্গে এপস্টেইন ৮ বছর চুটিয়ে প্রেম করেছেন।

শুলিয়াকের ২০১২ সালে কলাম্বিয়ায় আবেদন করার সময় শিক্ষার্থী ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে গিয়েছিল। ২০১৩ সালের শুরুতে এপস্টিন তাকে যুক্তরাষ্ট্রে রাখার একটি পরিকল্পনা করেন। তার সিদ্ধান্ত ছিল, দুই নারীর মধ্যে বিয়ে হলে বিষয়টি সবচেয়ে কম নজর কাড়বে। তিনি নিজের এক নারী সহকারীকে শুলিয়াকের সঙ্গে বিয়ের জন্য বেছে নেন। উল্লেখ্য, প্রথম নারী এপস্টেইনের নির্যাতনের শিকারও ছিলেন। ই-মেইল অনুযায়ী, ২০১৩ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর এপস্টেইন ওই নারীকে নিউইয়র্ক সিটির ম্যারেজ ব্যুরোতে যেতে নির্দেশ দেন। তিন সপ্তাহ পর দুই নারী আনুষ্ঠানিকভাবে বিয়ে করেন। আস্তে আস্তে এপস্টেইন যৌন কেলেঙ্কারির ভাণ্ডার থেকে এসব তথ্য প্রকাশ হচ্ছে।

মার্কিন ধনকুবের ও দণ্ডিত যৌন অপরাধী জেফ্রি এপস্টেইনের সম্পত্তির নথিপত্রের কোথাও একটি অমূল্য ৩৩ ক্যারেটের হীরার আংটির উল্লেখ রয়েছে। সেখানে হাতে লেখা একটি নোটে বলা হয়েছে, এটি দেয়া হয়েছিল ‘বিয়ের উদ্দেশ্যে’। সেই আংটির প্রাপক ডা. কারিনা শুলিয়াক, বেলারুশের ৩৭ বছর বয়সী একজন দন্তচিকিৎসক। দ্য নিউইয়র্ক টাইমস-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালে কারাগারে মৃত্যুর আগে এপস্টেইন শেষবার ফোনে যার সঙ্গে কথা বলেছিলেন, তিনি ছিলেন শুলিয়াক। এপস্টেইনের উইল অনুযায়ী, শুলিয়াক সর্বোচ্চ ১০ কোটি ডলার এবং ওই ৩৩ ক্যারেটের হীরার আংটির উত্তরাধিকারী হতে পারেন। অথচ বহু বছর তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে কুখ্যাত ব্যক্তিদের একজনের সঙ্গে নিজের সম্পর্ক জনসমক্ষে প্রায় পুরোপুরি গোপন রেখেছিলেন।

চলতি বছর জানুয়ারির শেষ দিকে সেই গোপনীয়তার অবসান ঘটে। যুক্তরাষ্ট্রের আইন মন্ত্রণালয় এপস্টেইন তদন্ত-সংক্রান্ত প্রায় ৩০ লাখ পৃষ্ঠার নথি ও ই-মেইল প্রকাশ করে। সেখানে শুলিয়াক ও এপস্টেইনের মধ্যে আদান-প্রদান হওয়া হাজারো ব্যক্তিগত বার্তা এবং তাদের সম্পর্কের বহু আলোকচিত্র প্রকাশ্যে আসে। এক দশকের বেশি সময় ধরে ব্যক্তিগত রাখা জীবনের একটি অধ্যায় হঠাৎ সবার সামনে উন্মুক্ত হয়ে যায়।

কে এই কারিনা শুলিয়াক?

দ্য নিউইয়র্ক টাইমস-এর পর্যালোচনা অনুযায়ী, এপস্টেইনের ঘনিষ্ঠদের মধ্যে শুলিয়াক ছিলেন এক ব্যতিক্রমী চরিত্র। তিনি কখনো নিজেকে এপস্টেইনের ভুক্তভোগী বলে দাবি করেননি। আবার ফেডারেল কর্তৃপক্ষও তাকে এপস্টেইনের যৌন পাচার চক্রের সহঅভিযুক্ত হিসেবে বিবেচনা করেনি। তবে প্রকাশিত ই-মেইলগুলো থেকে এমন একটি সম্পর্কের চিত্র উঠে আসে, যার ভিত্তি ছিল অর্থ, নির্ভরশীলতা ও নিয়ন্ত্রণ। এপস্টিন তাকে নিজের ‘প্রিয়তমা’ বলে ডাকতেন এবং প্রায়ই ভালোবাসার কথা জানাতেন। শুলিয়াক এপস্টেইনের ক্রেডিট কার্ড অবাধে ব্যবহার করতেন, তার খরচে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ভ্রমণ করেছেন এবং বছরের পর বছর ধরে এপস্টেইনের কাছ থেকে প্রায় ১০ লাখ ডলার পেয়েছেন। এ ছাড়া এপস্টেইন বেলারুশে থাকা শুলিয়াকের বাবা-মায়ের কাছেও কয়েক হাজার হাজার ডলার পাঠিয়েছেন। ই-মেইলগুলোতে যৌন সম্পর্ক নিয়ে মতবিরোধ, দম্পতিদের জন্য যৌন স্বাস্থ্যসামগ্রী কেনা, জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি, ব্রণের চিকিৎসা এবং কখনো কখনো অশ্লীল ভিডিওর লিংক বিনিময়ের বিষয়ও উঠে এসেছে। সময়ের সঙ্গে শুলিয়াক এপস্টেইনের বিভিন্ন বাড়ি ও কর্মচারী ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব নেন। এমনকি ২০১৯ সালে গ্রেপ্তারের কয়েক সপ্তাহ আগে মরক্কোয় একটি প্রাসাদ কেনার চেষ্টাতেও তিনি ভূমিকা রাখেন।

নিউইয়র্কে প্রথম পরিচয়

২০১১ সালের মার্চের শেষ দিকে নিউইয়র্কে তাদের পরিচয় হয়। তখন শুলিয়াক মাত্র নয় মাস আগে বেলারুশ থেকে অস্থায়ী শিক্ষার্থী ভিসায় যুক্তরাষ্ট্রে গিয়েছেন। তিনি ইংরেজি শিখছিলেন, ঘণ্টায় প্রায় ১৫ ডলার বেতনে ডেন্টাল অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে কাজ করতেন এবং ওয়েট্রেসের চাকরিও খুঁজছিলেন। একই সঙ্গে বেলারুশে শুরু করা দন্তচিকিৎসা শিক্ষাটি কীভাবে শেষ করবেন, সেই পথও খুঁজছিলেন। নথি অনুযায়ী, সাইবেরিয়া থেকে আসা এক তরুণী তাদের পরিচয় করিয়ে দেন। পরে ওই নারী দ্য নিউইয়র্ক টাইমস’কে বলেন, তাকে মাঝে মাঝে এপস্টেইনের কাছে অন্য তরুণীদের নিয়ে যেতে বলা হতো, যাতে তিনি তথাকথিত যৌন ম্যাসাজের ব্যবস্থা করতে পারেন। শুলিয়াকের ক্ষেত্রেও এপস্টেইনের উদ্দেশ্য সম্ভবত সেটিই ছিল। শুরুর দিকে এপস্টেইন তাকে প্রশংসা, উপহার এবং দন্তচিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন পূরণে সহায়তার প্রস্তাব দেন। কিন্তু কয়েক সপ্তাহ পর শুলিয়াক তাকে ই-মেইলে ‘‘অসাধারণ মানুষ’ বলে উল্লেখ করলেও তার সহায়তা গ্রহণে অস্বীকৃতি জানান। যদিও তিনি স্পষ্ট করে কারণ জানাননি, তবে তখন এপস্টেইন অপ্রাপ্তবয়স্ক এক মেয়ের কাছ থেকে যৌনসেবা কেনার অভিযোগে ইতিমধ্যে দোষ স্বীকার করেন এবং আরও বহু কিশোরীকে নির্যাতনের অভিযোগে অভিযুক্ত ছিলেন। এপস্টেইন এসব অভিযোগকে গুজব ও গল্প বলে উড়িয়ে দেন এবং শুলিয়াকের না-সূচক জবাব মেনে নেননি। কয়েক মাসের মধ্যেই শুলিয়াক তার নিউ মেক্সিকোর র‌্যাঞ্চ এবং মার্কিন ভার্জিন দ্বীপপুঞ্জের ব্যক্তিগত দ্বীপে যান।

কলাম্বিয়ায় ভর্তি করানোর চেষ্টা

শৈশব থেকেই শুলিয়াকের স্বপ্ন ছিল দন্তচিকিৎসক হওয়া। বেলারুশের মিনস্কে তিনি পাঁচ বছরের কোর্সের চার বছর শেষ করেন। ২০১২ সালে তিনি এপস্টেইনের সহায়তা নিতে রাজি হন। কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটির কলেজ অব ডেন্টাল মেডিসিন প্রথমে তাকে ভর্তি নিতে অস্বীকৃতি জানায়। এরপর এপস্টেইন নিজের দন্তচিকিৎসকের মাধ্যমে কলেজটির ডিনের সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং বিশ্ববিদ্যালয়কে ১ কোটি ডলার অনুদানের প্রস্তাব দেন। শেষ পর্যন্ত নথি অনুযায়ী তিনি প্রায় ২ লাখ ১০ হাজার ডলার অনুদান দেন। বিচার বিভাগের প্রকাশিত নথিতে এমন টেক্সট বার্তাও রয়েছে, যাতে দেখা যায় বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই কর্মকর্তা শুলিয়াককে ভর্তি পরীক্ষার কিছু প্রশ্নের বিষয় আগেভাগে জানিয়ে দিয়েছিলেন। ভর্তি হওয়ার পর এপস্টেইন শুলিয়াকের মাকে বেলারুশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে আসেন এবং পরবর্তী তিন বছরের টিউশন ফিও পরিশোধ করেন। এর জবাবে ২০১২ সালের জুনে শুলিয়াক লিখেছিলেন, আপনি সব মানুষের মধ্যে সবচেয়ে নির্মল মানুষ। আমার বাবা-মা, পড়াশোনা, অ্যাপার্টমেন্ট- সবকিছুর জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ।

তবে তাদের সম্পর্কে টানাপড়েনও ছিল। এপস্টেইনের অন্য তরুণীদের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার বিষয়ে আপত্তি জানিয়ে শুলিয়াক লিখেছিলেন, আমি জানি আপনার এটা প্রয়োজন। কিন্তু বিষয়টি আমার কাছে স্বাভাবিক মনে হয় না। তবু তিনি যোগ করেন, আমি আপনার সঙ্গেই থাকব, যতক্ষণ আপনি সুখে থাকেন।

গ্রিন কার্ডের জন্য সাজানো বিয়ে

২০১২ সালে কলাম্বিয়ায় আবেদন করার সময় শুলিয়াকের শিক্ষার্থী ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে গিয়েছিল। ২০১৩ সালের শুরুতে এপস্টেইন তাকে যুক্তরাষ্ট্রে রাখার একটি পরিকল্পনা করেন। তার সিদ্ধান্ত ছিল, দুই নারীর মধ্যে বিয়ে হলে বিষয়টি সবচেয়ে কম নজর কাড়বে। তিনি নিজের এক নারী সহকারীকে, যিনি তার নির্যাতনের শিকারও ছিলেন, শুলিয়াকের সঙ্গে বিয়ের জন্য বেছে নেন। ই-মেইল অনুযায়ী, ২০১৩ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর এপস্টেইন ওই নারীকে নিউইয়র্ক সিটির ম্যারেজ ব্যুরোতে যেতে নির্দেশ দেন। তিন সপ্তাহ পর দুই নারী আনুষ্ঠানিকভাবে বিয়ে করেন। এরপর এপস্টেইনের নিয়োগ করা একজন অভিবাসন আইনজীবী শুলিয়াককে ওই নারীর বৈধ স্ত্রী ও সুবিধাভোগী হিসেবে দেখিয়ে আবেদন করেন। আবেদনটি অনুমোদিত হয়, বহিষ্কারের মামলা বাতিল হয় এবং কয়েক মাস পর শুলিয়াক গ্রিন কার্ড পান। ২০১৮ সালে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব লাভ করেন। এক বছর পর তাদের বিবাহবিচ্ছেদ হয়। চলতি বছর হাউস কমিটি অন ওভারসাইট অ্যান্ড গভর্নমেন্ট রিফর্ম-এর ডেমোক্রেট সদস্যদের প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ওই নারী দাবি করেছেন তাকে জোর করে এই বিয়েতে বাধ্য করা হয়েছিল এবং শুলিয়াকের বহিষ্কার শুনানির মাত্র কয়েক দিন আগে যে বিয়েটি পরিকল্পিত হয়েছিল, সে বিষয়েও তিনি জানতেন না।

শেষ ফোনালাপ

২০১৯ সালের শুরুতে বাইরে থেকে তাদেরকে স্বাভাবিক দম্পতি বলেই মনে হতো। শুলিয়াক তখন এপস্টেইনের নিউইয়র্কের প্রাসাদেই বেশিরভাগ সময় থাকতেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিন দ্বীপপুঞ্জ, ফ্লোরিডা ও নিউ মেক্সিকোতে দন্তচিকিৎসার লাইসেন্স অর্জন করেন এবং ২০১৫ সালে পড়াশোনা শেষ করেন। তবে নিজের রোগী খুব বেশি ছিল না। বরং তিনি এপস্টেইনের বিভিন্ন বাড়ির সাজসজ্জা, আসবাবপত্র কেনা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও রক্ষণাবেক্ষণের কাজ তদারক করতেন। ২০১৯ সালের জুনে তারা একসঙ্গে প্যারিসে যান। ৬ জুলাই এপস্টেইন যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে আসেন, কিন্তু শুলিয়াক ইউরোপেই থেকে যান। নিউ জার্সির টিটারবরো বিমানবন্দরে নামার পরই ফেডারেল কর্মকর্তারা এপস্টেইনকে গ্রেপ্তার করে। এক মাস পর ম্যানহাটানের কারাগার থেকে প্রায় ২০ মিনিটের এক ফোনালাপে এপস্টেইন শুলিয়াককে বলেন, মামলাটি নিষ্পত্তি হতে তার ধারণার চেয়ে বেশি সময় লাগবে। তাই আপাতত অন্য কোথাও থাকার পরামর্শ দিয়ে তাকে শক্ত থাকতে বলেন। পরদিন, ২০১৯ সালের ১০ আগস্ট, কারাগারের কক্ষে এপস্টেইনকে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। কর্তৃপক্ষ জানায়, তিনি আত্মহত্যা করেন। মৃত্যুর অল্প কিছু আগে তিনি নিজের উইল সংশোধন করে প্রায় ৬০ কোটি ডলারের সম্পদের একটি বড় অংশ শুলিয়াকের নামে রেখে যান। এর মধ্যে ছিল ৩৩ ক্যারেটের হীরার আংটিও। তবে ভুক্তভোগীদের ক্ষতিপূরণ দেয়ার পর বর্তমানে এপস্টেইনের সম্পদের মূল্য ১২ থেকে ২০ কোটি ডলারের মধ্যে। ফলে শেষ পর্যন্ত শুলিয়াক ঠিক কত অর্থ পাবেন, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন