ভিক্টোরীয় যুগের অল্পপরিচিত যৌন সম্প্রদায়ের পরিণতি

ভিক্টোরীয় যুগের অল্পপরিচিত যৌন সম্প্রদায়ের পরিণতি

ফন্ট সাইজ:

ভিক্টোরীয় যুগের একটি অল্প পরিচিত ধর্মীয় সম্প্রদায়ের সদস্যদের সঙ্গে কী ঘটেছিল, তা আজও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে মানুষের আগ্রহের বিষয়।

আগাপেমনাইটস নামে পরিচিত এই সম্প্রদায়ের কেন্দ্র ছিল ইংল্যান্ডের ব্রিজওয়াটারের কাছে স্প্যাক্সটন গ্রামের একটি চ্যাপেল। এটি বর্তমানে এয়ারবিএনবি-এর মাধ্যমে ভাড়া দেয়া একটি অবকাশযাপন কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। যারা এই কাল্টে যোগ দিতেন, তাদের জানিয়ে দেয়া হতো- একবার প্রবেশ করলে আর কখনও বের হওয়া যাবে না। অনেক সদস্য শেষ পর্যন্ত আত্মহত্যা করেন। সম্প্রদায়ের নেতা হেনরি জেমস প্রিন্স দাবি করতেন, তিনিই পবিত্র আত্মার মানব রূপ। তিনি অনুসারীদের পারিবারিক সম্পদ তার হাতে তুলে দিতে বাধ্য করতেন। এছাড়া ধর্মীয় আচার হিসেবে এমন যৌন অনুষ্ঠানের আয়োজন করতেন, যা জনপ্রিয় টেলিভিশন সিরিজ ‘দ্য হ্যান্ডমেইডস টেল’-এর কিছু দৃশ্যের সঙ্গে তুলনা করা হয়। এসব অনুষ্ঠানে প্রিন্সের স্ত্রী উপস্থিত থাকতেন এবং অন্য নারীদের গর্ভবতী করার ঘটনা দেখতেন। এ খবর দিয়েছে অনলাইন বিবিসি।

বিবিসির সাবেক সাংবাদিক এবং ‘এ ভেরি বৃটিশ কাল্ট’ বইয়ের লেখক স্টুয়ার্ট ফ্লিন্ডার্স বলেছেন, ওই দেয়ালের আড়ালে যা ঘটত, তা শুধু স্থানীয় কৌতূহলের বিষয় ছিল না; আন্তর্জাতিকভাবেও মানুষের আগ্রহের কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল। প্রিন্সের প্রথম চাকরি ছিল কাছের চারলিঞ্চ গ্রামের একজন যাজক হিসেবে। ফ্লিন্ডার্স বলেছেন, তিনি খুব একটা জনপ্রিয় ছিলেন না। কারণ তিনি অর্ধেক ধর্মপ্রাণ মানুষকে বলে দিতেন যে তাদের আর উদ্ধার সম্ভব নয় এবং তারা নরকে যাবে। তার ভাষায়, একসময় তিনি বিশ্বাস করতে শুরু করেন যে তিনিই পবিত্র আত্মার বাস্তব অবয়ব। অর্থাৎ তিনিই ঈশ্বর। ফ্লিন্ডার্স আরও বলেন, তিনি নাকি পবিত্র আত্মার সঙ্গে এমনভাবে কথা বলতেন- ‘আজ কি বৃষ্টি হবে? আমার কি ছাতা নেয়া উচিত?’
পরবর্তীতে বিভিন্ন গির্জায় বদলি হওয়ার পর শেষ পর্যন্ত তাকে চার্চ অব ইংল্যান্ড থেকে বহিষ্কার করা হয়। এরপর তিনি স্প্যাক্সটনে জমি কিনে অনুসারীদের জন্য একটি বড় চ্যাপেল ও আবাসন নির্মাণ করেন। এই সম্প্রদায়ের নিয়ম ছিল অত্যন্ত কঠোর। একবার সদস্য হলে আর চলে যাওয়ার অনুমতি ছিল না। ফ্লিন্ডার্স বলেছেন, কয়েকজন সদস্য আত্মহত্যা করেছিলেন। সে সময়ের তদন্তে প্রিন্সের ভয়াবহ নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি উঠে আসে। তিনি বলেন, নটিজ পরিবারে তিন বোন ছিলেন। প্রত্যেকে উত্তরাধিকার সূত্রে ৬ হাজার পাউন্ড পেয়েছিলেন, যা বর্তমান মূল্যে প্রায় ৫ লাখ পাউন্ডের সমান। তার ভাষায়, প্রিন্স তাদের বলেছিলেন, ঈশ্বরের ইচ্ছা হলো তারা তার অনুসারীদের একজনকে বিয়ে করবেন। তারা সেটাই করেছিলেন। তিনি আরও বলেন, উনিশ শতকের নিয়ম অনুযায়ী বিয়ের পর নারীদের নিজেদের সম্পদ স্বামীর হাতে তুলে দিতে হতো। সেই স্বামীরা আবার পুরো অর্থ আগাপেমনাইটসের তহবিলে জমা দেন।

বিতর্কিত যৌন আচার

ফ্লিন্ডার্সের মতে, প্রিন্স তার অনুসারীদের বোঝাতেন যে তিনি যেহেতু পবিত্র আত্মার মানব রূপ, তাই যৌন অনুষ্ঠান আসলে একটি ধর্মীয় আচার, যার মাধ্যমে পবিত্র আত্মা মানবদেহ ধারণ করে। তিনি বলেন, নিশ্চিতভাবে যতটুকু জানা যায়, তা হলো একটি অনুষ্ঠান হতো যেখানে সবাই উপস্থিত থাকতেন, এমনকি তার স্ত্রীও। ১৮৯৯ সালে প্রিন্সের মৃত্যুর পর সমারসেটের জন হিউ স্মাইথ-পিগট সম্প্রদায়ের নতুন নেতা হন। ফ্লিন্ডার্স বলেন, ১৯০২ সালে লন্ডনের একটি গির্জার প্রার্থনা সভায় তিনি ঘোষণা করেন যে তিনিই পুনরায় পৃথিবীতে ফিরে আসা যিশু খ্রিস্ট। তিনি আরও বলেন, এই বক্তব্যকে ভয়াবহ ধর্মদ্রোহিতা হিসেবে দেখে গির্জার আশপাশের রাস্তায় দাঙ্গা বেঁধে যায়। শেষ পর্যন্ত তাকে সমারসেটে ফিরে যেতে হয়।

পতনের শুরু

১৯২৭ সালে পিগটের মৃত্যুর পর গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে, স্বর্গের আহ্বান পাওয়ার জন্য প্রস্তুত রাখতে তার অনুসারীরা তাকে দাঁড় করিয়ে কবর দিয়েছিলেন। তার মৃত্যুর পর ধীরে ধীরে এই কাল্টের প্রভাব কমে যায় এবং তাদের আবাসনটি একসময় বৃদ্ধাশ্রমের মতো প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। ১৯৬০-এর দশকে চ্যাপেলটি বিক্রি করে দেয়া হয়। পরে সেটি একটি টেলিভিশন স্টুডিও হিসেবে ব্যবহৃত হয়, যেখানে ‘ক্যাম্বারউইক গ্রিন’ এবং ‘ট্রাম্পটন’-এর মতো জনপ্রিয় অনুষ্ঠান ধারণ করা হয়। বর্তমানে ঐতিহাসিক সেই চ্যাপেলটি এয়ারবিএনবি-এর মাধ্যমে অবকাশযাপন কেন্দ্র হিসেবে ভাড়া দেয়া হয়।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন