ক্যামেরুনের দোয়ালা শহরের কুখ্যাত নিউ বেল কারাগার। এটা যেন একটি শহরের ভেতরে আরেকটি শহর। এই কারাগারের নিজস্ব ‘ট্যাক্সি’ আছে। এই ট্যাক্সি হলো আসলে বন্দি। তারা ভিড় ঠেলে দৌড়ে এক বন্দির বার্তা আরেক বন্দির কাছে পৌঁছে দেয়। আছে নিজস্ব আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও। তারা হলো বলিষ্ঠ কিছু বন্দি। তারা জনবল-সংকটে থাকা কারারক্ষীদের কারাগারের শৃঙ্খলা বজায় রাখতে সহায়তা করে। এমনকি রয়েছে নিজস্ব বাজার। সেখানে সারি সারি দোকানে বন্দিরাই ভাজা কাসাভা, বেনিয়ে পেস্ট্রিসহ নানা খাবার ও প্রয়োজনীয় জিনিস কেনাবেচা করেন। অর্থাৎ, নিউ বেলের বন্দিরা কারাগারের শিথিল নিয়মকানুনকে নিজেদের সুবিধামতো কাজে লাগিয়ে এক ধরনের আলাদা সমাজ গড়ে তুলেছেন। আর এই মানসিকতার সবচেয়ে স্পষ্ট উদাহরণ হলো ‘জেল টাইম রেকর্ডস’। যা হলো কারাগারের ভেতরে গড়ে ওঠা একটি সংগীত স্টুডিও ও রেকর্ড লেবেল। এটি প্রতিভাবান বন্দিদের ছোটখাটো তারকায় পরিণত করছে। এই কারাগার নিয়ে দীর্ঘ এক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে অনলাইন বিবিসি।
কারাগারের ভেতরে ও বাইরে ভয়ঙ্কর গ্যাং নেতা হিসেবে পরিচিত এমপেরর ওই কারাগারের ভেতরেই ধারণ করা একটি মিউজিক ভিডিও দিয়ে ইউটিউবে ২৪ হাজারের বেশি ভিউ পেয়েছেন। এই লেবেলের শিল্পীদের গান দক্ষিণ আফ্রিকা, যুক্তরাষ্ট্র, আর্জেন্টিনাসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শ্রোতা পেয়েছে। চলতি বছরের শুরুতে জেল টাইম রেকর্ডস নিউ বেলের উঠোনে বন্দিদের জন্য একটি বিশাল কনসার্টও আয়োজন করে। জেল টাইম রেকর্ডসের সহ-প্রতিষ্ঠাতা এবং সাবেক বন্দি স্টিভ হাপ্পি বিবিসি’র টকিং মুভিজ অনুষ্ঠানে বলেন, এটি আমাদের প্রতিরোধের একটি মাধ্যম। এখানে আমরা বন্ধুত্ব, ভালোবাসা ভাগাভাগি করতে পারি এবং আমাদের কণ্ঠ মানুষ শুনতে পায়। তিনি আরও বলেন, তখন আর চারপাশের দেয়ালের কথা মনে থাকে না। আমরা যেন স্বাধীনতার স্বাদ পাই।
ছোট্ট স্টুডিও, বিশাল স্বপ্ন
জেল টাইম রেকর্ডসের স্টুডিও খুবই সাধারণ। একটি ছোট, গরম রেকর্ডিং বুথ এবং তার সঙ্গে লাগোয়া একটি ঘর। সেখানে একটি মাত্র কম্পিউটার রয়েছে। কিন্তু এই ছোট্ট জায়গাটিই বন্দিদের জন্য হয়ে উঠেছে আত্মপ্রকাশ, সৃজনশীলতা ও মানসিক মুক্তির কেন্দ্র। সম্প্রতি এই স্টুডিওকে ঘিরে নির্মিত ‘জেল টাইম রেকর্ডস’ নামের একটি প্রামাণ্যচিত্র ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছে। স্টিভ হাপ্পি ও ইতালীয় শিল্পী ডিওনে রোচ ছয় বছর ধরে নিউ বেল কারাগারে এই চলচ্চিত্রটির শুটিং করেছেন। ডিওনে রোচ হলেন জেল টাইম রেকর্ডসের আরেক সহ-প্রতিষ্ঠাতা। গত মাসে নিউ ইয়র্কের ট্রাইবেকা ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে এটি সেরা প্রামাণ্যচিত্রসহ তিনটি পুরস্কার জিতেছে।
হার্ট অব স্টোন
প্রামাণ্যচিত্রে স্টোন নামে এক বন্দিকে স্টুডিওর মাইক্রোফোনে র্যাপ করতে দেখা যায়। তিনি গেয়েছেন- ‘পাথরের হৃদয়, এ যেন যুদ্ধ। আমার অনুভূতি ভাঙা কাঁচের মতো চূর্ণ হয়ে যায়। আমি সেলের দরজার মতো বন্ধ। শক্ত মাটি নেই, মাছের মতো পিছলে যাই।’
স্টোন আগে ক্যামেরুনের প্রেসিডেন্সিয়াল গার্ডে কর্মরত ছিলেন। ডাকাতি ও অবৈধ অস্ত্র রাখার অভিযোগে তাকে ১০ বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে। তবে দাবি করেন, তিনি নির্দোষ। চলচ্চিত্রে দেখা যায়, তিনি বারবার ফোনে তার ছোট মেয়ে মাইরার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করছেন, কিন্তু বেশির ভাগ সময়ই ব্যর্থ হচ্ছেন। পরিবারের এক সদস্যকে পাঠানো ভয়েস বার্তায় তিনি বলেন, অনেক দিন হয়ে গেছে। মাঝেমধ্যে ওর কণ্ঠ আমার শোনা দরকার, যাতে সে বাবাকে ভুলে না যায়। ‘হার্ট অব স্টোন’ গানের ভিডিওটিও জেল টাইম রেকর্ডসের স্বাভাবিক ধাঁচেই তৈরি। উন্নত নির্মাণশৈলী, আকর্ষণীয় গল্প এবং অভিনয় থেকে শুরু করে কারিগরি কাজে অংশ নিয়েছেন অসংখ্য বন্দি।
শিল্প মানুষের জীবন বদলে দিতে পারে
নিউজিল্যান্ডের অস্কারজয়ী পরিচালক তাইকা ওয়াইতিতি তার স্ত্রী গায়িকা রিটা ওরার সঙ্গে এই প্রামাণ্যচিত্রের নির্বাহী প্রযোজক ছিলেন। তিনি বলেন, ওখান থেকে যে সংগীত বেরিয়ে আসে, তা অসাধারণ। তিনি আরও বলেন, শিল্প মানুষকে নতুনভাবে বাঁচার সুযোগ দেয়। অনেকেই হয়তো আজীবন কারাগারে থাকবেন। তাদের জন্য এমন একটি প্রকাশের জায়গা থাকা অত্যন্ত মানবিক এবং শক্তিশালী বিষয়।
যেভাবে শুরু
২০১৮ সালে ডিওনে রোচ নিউ বেল কারাগারে একটি অলাভজনক সংস্থার স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করছিলেন। একদিন বন্দিদের নাচের ক্লাস চলাকালে কয়েকজন র্যাপার মাইক্রোফোন হাতে নিয়ে তাৎক্ষণিক র্যাপ শুরু করেন। তাদের প্রতিভা দেখে মুগ্ধ হয়ে তিনি কারা কর্তৃপক্ষের কাছে একটি সংগীত স্টুডিও স্থাপনের অনুমতি চান। কর্তৃপক্ষ এতে সম্মতি দিলে তিনি স্টিভ হাপ্পিকে সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ার ও প্রযোজক হিসেবে যুক্ত করেন। হাপ্পির দাবি, বাবার মৃত্যুর পর মরদেহ দাফন নিয়ে পারিবারিক বিরোধের জেরে তার এক ফুফু, যিনি উচ্চ আদালতের বিচারক ছিলেন, তিনি তাকে বাবাকে হত্যার অভিযোগে কারাগারে পাঠানোর ব্যবস্থা করেন। দুই বছর পর তিনি আদালতে নির্দোষ প্রমাণিত হন।
সংগীতের আয়ও বন্দিদের
২০২২ সালে জেল টাইম রেকর্ডস ‘জেল টাইম ভলিউম-১’ নামে একটি অ্যালবাম প্রকাশ করে। এই লেবেলের নিয়ম অনুযায়ী, অ্যালবামের আয়ের অর্ধেক শিল্পীদের দেয়া হয়। আর বাকি অর্থ আবার লেবেলের উন্নয়নে বিনিয়োগ করা হয়। বন্দিদের কাছে এই স্টুডিও টিকিয়ে রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ নিউ বেলের বাস্তবতা ভয়াবহ। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ২০২২ সালে জানিয়েছিল, ধারণক্ষমতার চার গুণ বেশি অর্থাৎ প্রায় ৪ হাজার ৭০০ বন্দি তখন ভেঙে পড়া এই কারাগারে আটক ছিলেন। অতিরিক্ত ভিড় ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের কারণে চার বছর আগে কলেরার প্রাদুর্ভাব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এতে অন্তত ছয়জন বন্দির মৃত্যু হয় বলে মানবাধিকার সংগঠনগুলো জানিয়েছে।
নিউ বেলের আরেকটি পরিচিতি হলো সহিংসতা। ২০০৮ সালে কারাগার ভেঙে পালানোর চেষ্টার সময় কারারক্ষীদের গুলিতে ১৬ জন বন্দি নিহত হন। বন্দিদের মধ্যেও প্রায়ই ভয়ভীতি ও হামলার ঘটনা ঘটে। প্রামাণ্যচিত্রে দেখা যায়, এক তরুণ বন্দির কাছ থেকে জোর করে গলার চেইন ও স্যান্ডেল নিয়ে নিচ্ছেন এমপেরর। তিনি একাধিক অপরাধে ১০ বছরের সাজা ভোগ করছেন।
অপরাধের মহিমা নয়, পুনর্বাসন
জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, জেল টাইম রেকর্ডস কি এমপেররের মতো সহিংস অপরাধীদের নায়ক বানিয়ে ফেলছে? ডিওনে রোচ বলেন, আমরা মূলত পুনর্বাসনের কাজ করছি। তিনি আরও বলেন, আমরা কোনো বিচার নিয়ে কারাগারে প্রবেশ করি না। এ ধরনের কাজ করার এটাই একমাত্র উপায়। সংগীত এবং সৃজনশীলতা মানুষকে নিজের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়, নিজের করা ভুলের মুখোমুখি দাঁড়াতে শেখায় এবং আশা করি আরও ভালো মানুষ হতে সাহায্য করে। কারা কর্তৃপক্ষও এই ধারণাকে সমর্থন করে।
স্টিভ হাপ্পি বলেন, তারা আমাদের প্রকল্পকে আন্তরিকভাবে স্বাগত জানিয়েছে। ক্যামেরুন খুবই সংগীতপ্রেমী দেশ। সবাই সংগীত ভালোবাসে। তিনি জানিয়েছেন, এ বছরের কনসার্টে কারাগারের প্রধানও উপস্থিত ছিলেন এবং শিল্পীদের সঙ্গে নাচেও অংশ নিয়েছিলেন।
নারীদের জন্যও সুযোগ
সরকারি সমর্থনের কারণে জেল টাইম রেকর্ডস এখন আরও বিস্তৃত হয়েছে। নিউ বেলের নারী ওয়ার্ডের বন্দিরাও এতে অংশ নিচ্ছেন। লেবেলের প্রথম নারী শিল্পী জেজে ২০২২ সালে ‘শো মি দ্য ওয়ে’ নামে একটি আফ্রোবিটস গান দিয়ে আত্মপ্রকাশ করেন। তিনি গেয়েছেন- ‘কেউ আমাকে পথ দেখায়নি, কেউ আমাকে পথ দেখায়নি, সবকিছু আমাকে একাই করতে হয়েছে।’ অভিযোগ রয়েছে, নির্যাতনকারী চাচার কাছ থেকে টাকা চুরি করে পালিয়ে যাওয়ার পর তাকে কারাগারে পাঠানো হয়েছিল।
সীমান্ত পেরিয়ে নতুন যাত্রা
নারী বন্দিদের সঙ্গে কাজের পাশাপাশি জেল টাইম রেকর্ডস এখন ক্যামেরুনের বাইরেও তাদের কার্যক্রম সম্প্রসারণ করেছে। ২০২৩ সালে ডিওনে রোচ ও স্টিভ হাপ্পি বুরকিনা ফাসোর রাজধানী উয়াগাদুগুর কেন্দ্রীয় কারাগারে, প্রায় ১ হাজার মাইল দূরে, আরেকটি স্টুডিও গড়ে তোলেন। তাদের আশা, নিউ বেলের মতোই সেখানে একটি পূর্ণাঙ্গ রেকর্ড লেবেল, মিউজিক ভিডিও ইউনিট এবং সফল সাংস্কৃতিক উদ্যোগ গড়ে তোলা সম্ভব হবে। প্রামাণ্যচিত্রটির শেষ অংশে প্রকল্প চলাকালে মারা যাওয়া ছয় বন্দির স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হয়েছে। নিউ বেল যতই অন্ধকার জায়গা মনে হোক না কেন, স্টিভ হাপ্পির বিশ্বাস, সংগীত বন্দিদের জন্য ‘একটি উজ্জ্বল ভবিষ্যতের প্রদীপ’। তার ভাষায়, আগে তাদের মানসিকতা ছিল- পৃথিবী একদিকে, তারা আরেকদিকে। এখন তারা নিজেদের গুরুত্বপূর্ণ মনে করে। তারা অনুভব করে, সমাজে তাদেরও একটি জায়গা আছে।
