জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে নিহত ও আহতদের ঘটনায় শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নয়, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাসহ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় পর্যায়ের নেতাদেরও দায় রয়েছে। এসব ঘটনার নিরপেক্ষ বিচার নিশ্চিত না হলে ভবিষ্যতে আবারো গণবিরোধী শাসনব্যবস্থা ফিরে আসতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করে সাক্ষ্যের জবানবন্দি দিয়েছেন সাংবাদিক আশরাফ কায়সার। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ যুবলীগ ও ছাত্রলীগের শীর্ষ সাত নেতার বিরুদ্ধে তিনি সাক্ষী দিয়েছেন। জবানবন্দিতে আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসনামলের চিত্র তুলে ধরার পাশাপাশি জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের বর্ণনা দেন তিনি।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এ জুলাই-আগস্ট গণ-অভ্যুত্থান সংশ্লিষ্ট মামলায় সাক্ষ্য দিতে গিয়ে আশরাফ কায়সার দাবি করেন, স্বাধীনতার পর থেকেই আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে ধীরে ধীরে ফ্যাসিবাদী প্রবণতার বিকাশ ঘটে; যা শেখ হাসিনার শাসনামলে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নেয় এবং শেষ পর্যন্ত ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পটভূমি তৈরি করে। তিনি বলেন, ১৯৭২ সালের পর বিরোধী মত দমন, একদলীয় বাকশাল ব্যবস্থা, সংবাদপত্র নিয়ন্ত্রণ ও রাজনৈতিক দমন-পীড়নের যে ধারা শুরু হয়েছিল, ২০০৯ সালের পর তা আরও বিস্তৃত হয়।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, গুম, খুন, ‘আয়নাঘর’, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সংকুচিত করা, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, বিতর্কিত নির্বাচন এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর দলীয়করণের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক কাঠামো দুর্বল করা হয়। জুলাই-আগস্ট ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থান প্রসঙ্গে তিনি দাবি করেন, আন্দোলন দমনে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের এবং দলটির বিভিন্ন সহযোগী সংগঠনের নেতারা কর্মীদের শক্তি প্রয়োগে উৎসাহিত করেছিলেন। তার অভিযোগ, পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগের নেতাকর্মীরাও আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা ও হত্যাকাণ্ডে অংশ নেয়। তিনি আরও বলেন, এসব ঘটনায় শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য নয়, তৎকালীন সরকারের রাজনৈতিক নেতৃত্বেরও দায় রয়েছে।
অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ গুম ও হত্যার ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা মেজর (অব.) খোন্দকার মোহাম্মদ সাজ্জাদুল ইসলাম। জবানবন্দিতে তিনি দাবি করেন, ২০১১ সালে র?্যাবে যোগদানের প্রথম রাতেই তিনজনকে হত্যার ঘটনা প্রত্যক্ষ করেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, গাজীপুর-জয়দেবপুর এলাকায় পরিচালিত একটি অভিযানে চোখবাঁধা এক ব্যক্তিকে লেফটেন্যান্ট কর্নেল জিয়াউল আহসান মাথায় গুলি করে সেতুর নিচে ফেলে দেন। পরে আরও দু’টি স্থানে একই ধরনের ঘটনা ঘটে বলে তিনি দাবি করেন।
তিনি আরও বলেন, একটি তথাকথিত সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানে অংশ নিতে অস্বীকৃতি জানালে জিয়াউল আহসান তাকে অপমান ও হুমকি দেন। পরদিনই তাকে র?্যাব থেকে প্রত্যাহার করে সেনাবাহিনীতে ফেরত পাঠানো হয়। তার দাবি- ওই ঘটনার পর তাকে ‘অবিশ্বস্ত’ ও ‘অবাধ্য’ কর্মকর্তা হিসেবে উপস্থাপন করা হয় এবং পদোন্নতি থেকেও বঞ্চিত হতে হয়। শেষ পর্যন্ত ২০১৩ সালে চাকরির প্রায় ১২ বছর বাকি থাকতেই তিনি স্বেচ্ছায় অবসর নেন।
