জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে সাভারে এপিসি থেকে ফেলে আসহাবুল ইয়ামিনকে হত্যা এবং ২০১৮ সালে কক্সবাজারের টেকনাফের কাউন্সিলর একরামুল হককে ‘ক্রসফায়ারে’ হত্যার ঘটনায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এ পৃথক দুটি আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করেছে প্রসিকিউশন। অভিযোগ দুটি আমলে নিয়ে গ্রেপ্তার আসামিদের সংশ্লিষ্ট মামলায় সোপর্দ এবং পলাতকদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছেন ট্রাইব্যুনাল। আগামী ২৫শে আগস্ট পরবর্তী কার্যক্রমের জন্য দিন ধার্য করা হয়েছে।
গতকাল আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এ অভিযোগপত্র দাখিলের পরে চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, আবদুর রহমান বদির মেটিকুলাস ডিজাইনেই সাবেক পৌর কাউন্সিলর একরামুল হককে ক্রসফায়ারের ঘটনা ঘটেছিল। একরাম ছিল তার প্রতিপক্ষ। একরামকে হত্যার পর তার সম্পত্তি এই বদি বিভিন্ন কৌশলে আত্মসাৎ করেছিল। এই হত্যার নেপথ্য নায়ক ছিল বদি। তিনি আরও বলেন, প্রসিকিউশন কার্যালয়ে তদন্ত সংস্থার জমা দেয়া ১২টি তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে পর্যায়ক্রমে অভিযোগপত্র দাখিল করা হচ্ছে। এরই ধারাবাহিকতায় এদিন দু’টি মামলার ফরমাল চার্জ দাখিল করা হয়েছে।
গতকাল কক্সবাজার জেলার টেকনাফের সাবেক পৌর কাউন্সিলর একরামুল হক হত্যা মামলায় ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ১১ জনের বিরুদ্ধে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করে প্রসিকিউশন। শুনানি শেষে ট্রাইব্যুনাল অভিযুক্তদের ৮ জনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি এবং গ্রেপ্তার থাকা ৩ আসামিকে আদালতে হাজির করার নির্দেশ দিয়েছেন। এ মামলায় অন্য যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে তারা হলেন- আসাদুজ্জামান কামাল, ওবায়দুল কাদের, আবদুর রহমান বদি, র?্যাবের তৎকালীন মহাপরিচালক বেনজীর আহমেদ, কর্নেল অবসরপ্রাপ্ত আনোয়ার লতিফ খান তুষার, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মাহবুব আলম মিনু, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মিফতাহ উদ্দিন আহমেদ, মেজর অবসরপ্রাপ্ত রুহুল আমিন ওরফে রাজন, স্কোয়াড্রন লিডার নাজমুস মাহমুদ ওরফে রাজু এবং লেফটেন্যান্ট কমান্ডার আশিকুর রহমান ওরফে সৈকত। এদের মধ্যে আবদুর রহমান বদি, আনোয়ার লতিফ খান ও মাহাবুব আলম অন্য মামলায় বর্তমানে আটক রয়েছেন।
শুনানি শেষে ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, তদন্তে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী মেজর (অব.) রুহুল আমিন ওরফে রাজন এবং লেফটেন্যান্ট কমান্ডার আশিকুর রহমান ওরফে সৈকত সরাসরি গুলি করেন। অন্য কর্মকর্তারা পরিকল্পনা ও তত্ত্বাবধানে যুক্ত ছিলেন। তিনি আরও বলেন, দুই মামলার একটিতে একজন চাকরিরত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়েছে। তদন্তের স্বার্থে আপাতত তার পরিচয় প্রকাশ করা হচ্ছে না। চিফ প্রসিকিউটর জানান, মামলাটির শুনানিকালে ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান মন্তব্য করেছেন, রাষ্ট্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত বাহিনীর সদস্যরা যদি এ ধরনের হত্যাকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েন, তবে তা রাষ্ট্রব্যবস্থার জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক। তিনি আরও বলেন, তৎকালীন ফ্যাসিস্ট সরকার তাদের মতের বিরুদ্ধে গেলেই টার্গেট করে অপহরণ করতো। কাউকে আয়নাঘরে বা কাউকে ক্রসফায়ারে হত্যা করা হতো। এমনই একটি ঘটনা একরাম হত্যা। মোবাইল সুইচ অন থাকা অবস্থায় তার স্ত্রী ও মেয়েরা ফায়ারিং আওয়াজ ও কথোপকথন শুনতে পেরেছিল। এসব কিছু আমরা আলামত হিসেবে নিয়েছি। প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্যসহ বিভিন্ন প্রমাণের ভিত্তিতে সুপ্রিরিয়র রেসপনসিবিলিটি হিসেবে শেখ হাসিনা, আসাদুজ্জামান কামাল, ওবায়দুল কাদের ও বদিউর রহমান বদির নাম এসেছে বলে জানান তিনি। উল্লেখ্য, র?্যাবের মাদকবিরোধী অভিযানে ২০১৮ সালের ২৬শে মে একরামুল হক কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভে নোয়াখালিয়া পাড়ায় ক্রসফায়ারে হত্যা করা হয়েছিল। তিনি টেকনাফ পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ছিলেন এবং প্রায় এক যুগ তিনি ছিলেন টেকনাফ উপজেলা যুবলীগের সভাপতি।
এদিকে, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে সাভারে এপিসি থেকে আসহাবুল ইয়ামিনকে গুলি করে উপর থেকে ফেলে দেয়া এবং পরে টেনেহিঁচড়ে রাস্তার পাশে ফেলে রাখার ভিডিও বিশ্ব জুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। এ ঘটনায় সাবেক এমপি সাইফুল ইসলামসহ ১৯ জনকে অভিযুক্ত করে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেছে প্রসিকিউশন। নিহত আসহাবুল ইয়ামিন এমআইএসটির কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন। শুনানি শেষে ফরমাল চার্জ আমলে নিয়ে পলাতক ১৩ আসামির বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন ট্রাইব্যুনাল। এ ছাড়া অন্য মামলায় গ্রেপ্তার থাকা ৬ জন আসামিদের আগামী ২৫শে আগস্ট হাজিরের জন্য নির্দেশ দেয়া হয়।
মামলার আসামিরা হলো- ঢাকা জেলার সাবেক অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) মো. আব্দুল্লাহিল কাফী, ঢাকা-১৬ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য সাইফুল ইসলাম, ঢাকা রেঞ্জের সাবেক ডিআইজি সৈয়দ নুরুল ইসলাম, সাবেক পুলিশ সুপার আসাদুজ্জামান রিপন, সাবেক অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সাভার সার্কেল) মো. শাহিদুল ইসলাম, সাভার থানার সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শাহজামান, আশুলিয়া থানার সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এএফএম সায়েদ, এএসআই মোহাম্মদ আলী, নায়েক সুহেল মিয়া, কনস্টেবল মাহফুজ মিয়া, সাভার উপজেলা সাবেক চেয়ারম্যান মঞ্জুরুল আলম রাজিব, মো. আতিকুর রহমান, ফখরুল আলম সমর, মেহেদী হাসান তুষার, রাজু আহম্মেদ, মো. ফরিদ, জামান খান, মিজানুর রহমান জিএস মিজান ও শরীফ আশরাফুল আলম বাবুল।
