মিস গ্রেট বৃটেন লন্ডনের ফাইনালিস্ট নির্বাচিত হয়েছেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত বৃটিশ তরুণী তানিশা জামান। একই সঙ্গে তিনি একজন মুসলিম ফাইনালিস্ট। তার কাছে মিস গ্রেট বৃটেন লন্ডন হওয়া শুধু একটি মুকুট জয়ের লড়াই নয়। ২০ বছর বয়সী এই তরুণ সমাজকর্মীর কাছে এটি সৌন্দর্য সম্পর্কে প্রচলিত ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করার, তরুণীদের নিজেদের স্বাতন্ত্র?্যকে গ্রহণ করতে উৎসাহিত করা এবং প্রমাণ করার একটি সুযোগ। এই সুযোগে সৃষ্ট প্রতিনিধিত্ব মানুষের নিজের সম্পর্কে ভাবনার ধরন বদলে দিতে পারে। এ খবর দিয়েছে অনলাইন ইস্টার্ন আই ডট বিজ। এই সাইটকে দেয়া সাক্ষাৎকারে তানিশা জানিয়েছেন, ছোটবেলায় নিজেকে প্রচলিত সৌন্দর্যের মানদণ্ডের সঙ্গে মানিয়ে নিতে না পারার অনুভূতি, কেন তিনি পরিবর্তনের প্ল্যাটফরম হিসেবে সৌন্দর্য প্রতিযোগিতাকে বেছে নিয়েছেন এবং এই প্রতিযোগিতার বাইরেও কী ধরনের উত্তরাধিকার রেখে যেতে চান।
তানিশা স্বীকার করেছেন, তিনি কখনো কল্পনাও করেননি যে, একদিন কোনো সৌন্দর্য প্রতিযোগিতার মঞ্চে দাঁড়াবেন। পূর্ব লন্ডনে বেড়ে ওঠা তানিশা বলেন, তিনি সবসময় যেন দুই ভিন্ন জগতের মাঝখানে আটকে ছিলেন। বৃটিশ-বাংলাদেশি সমাজ এবং বৃহত্তর বৃটিশ সমাজ-উভয় জায়গাতেই তাকে প্রায়ই ‘অতিরিক্ত শ্যামলা’, ‘অতিরিক্ত লম্বা’ এবং ‘অতিরিক্ত স্বাস্থ্যবান’ হিসেবে দেখা হতো, যা প্রচলিত সৌন্দর্যের ধারণার সঙ্গে মেলে না। তিনি বলেন, বাংলাদেশি সমাজে আমাকে কখনোই সুন্দরী মনে করা হয়নি, আবার বৃটিশ সমাজেও নয়। তাই মিস গ্রেট বৃটেন লন্ডন-এর ফাইনালে ওঠা তার কাছে খুবই ব্যক্তিগত একটি অর্জন।
তার ভাষায়, মূলত একটি সৌন্দর্য প্রতিযোগিতায় এত দূর আসতে পারা যেন আমার আট বছরের তানিশার হৃদয়ের ভেতরের একটি ক্ষত সারিয়ে দিচ্ছে। তানিশার সৌন্দর্য প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়ার সিদ্ধান্তের পেছনে রয়েছে তার প্রতিষ্ঠিত সংগঠন ‘তানিশাস ট্যালেন্ট’। এই সংগঠনের মাধ্যমে তিনি লন্ডনের শ্রমজীবী পরিবার এবং দক্ষিণ এশীয় বংশোদ্ভূত তরুণীদের আত্মবিশ্বাস, জনসমক্ষে কথা বলা এবং নেতৃত্বের দক্ষতা গড়ে তুলতে সহায়তা করেন। তিনি লক্ষ্য করেন, যেসব মেয়েকে তিনি পরামর্শ দেন, তাদের অনেকেই সেই একই নিরাপত্তাহীনতার বোধে ভুগছে, যার মধ্যদিয়ে তিনিও ছোটবেলায় গিয়েছেন।
একই সঙ্গে তিনি বুঝতে পারেন, তাদের মতো পটভূমির মেয়েদের সামনে অনুসরণ করার মতো দৃশ্যমান রোল মডেল খুবই কম। তিনি বলেন, তখন আমি ভাবলাম, আমার নিজেকেই সামনে আসতে হবে এবং তাদের জন্য সেই আদর্শ হতে হবে। কারণ আমি যদি এটা না করি, তাহলে আর কে করবে, তা আমি জানি না। তরুণীদের সঙ্গে আলাপচারিতায় তিনি আরও উপলব্ধি করেছেন, বৃটিশ-বাংলাদেশি নারীরা এক ধরনের দ্বৈত প্রত্যাশার মুখোমুখি হন। একদিকে তাদের ভালো ফল করতে উৎসাহ দেয়া হয়। অন্যদিকে বলা হয় যেন তারা ‘অতিরিক্ত উচ্চাকাঙক্ষী’ বা ‘অতিরিক্ত বুদ্ধিবৃত্তিক’ না হন। কারণ এতে নাকি বিয়ের সম্ভাবনা কমে যেতে পারে। তানিশা বলেন, তিনিও নিজের কাছের মানুষদের কাছ থেকে এমন কথা শুনেছেন এবং তার বিশ্বাস, এসব ধারণা এখনো অনেক নারীকে তাদের পূর্ণ সম্ভাবনা অর্জন থেকে নিরুৎসাহিত করে। তিনি বলেন, তুমি যা-ই করো না কেন, তুমি যথেষ্ট ভালো। আর জীবনে কখনোই সবাইকে খুশি করতে পারবে না। তিনি তরুণীদের অন্যের প্রত্যাশা দিয়ে নিজের মূল্য নির্ধারণ না করার আহ্বান জানান।
সৌন্দর্য প্রতিযোগিতা নিয়ে প্রায়ই সমালোচনা হয় যে, সেখানে বাহ্যিক সৌন্দর্যের ওপর অতিরিক্ত গুরুত্ব দেয়া হয়। তবে তানিশার বিশ্বাস, এই প্রতিযোগিতাগুলো মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি বদলানোর শক্তিশালী প্ল্যাটফরমও হতে পারে। প্রতিযোগিতার সাঁতারের পোশাক পর্বে তিনি একটি বুরকিনি পরার পরিকল্পনা করেছেন। উল্লেখ্য, বুরকিনি হলো নারীদের জন্য তৈরি এক ধরনের সাঁতারের পোশাক। এই পোশাক মুখ, হাত ও পা ছাড়া পুরো শরীর ঢেকে রাখে। তানিশার মতে, একজন মানুষের সৌন্দর্য কখনোই নির্ধারিত হওয়া উচিত নয়, তিনি কতোটা শরীর প্রদর্শন করছেন তার ওপর। বরং বিচারক ও দর্শকদের উচিত দয়া, আত্মবিশ্বাস ও ব্যক্তিত্বের মতো গুণাবলিকে মূল্যায়ন করা। তানিশা বলেন, সৌন্দর্যের অনেক রকম রূপ আছে। সুন্দর মুখ যেমন থাকতে পারে, তেমনি সুন্দর আত্মা এবং সুন্দর মনও থাকতে পারে। তানিশা মনে করেন, বৃটিশ-বাংলাদেশি মুসলিম নারীদের নিয়ে অনেক ভুল ধারণা রয়েছে। তার মতে, অসংখ্য মেধাবী ও উচ্চাকাঙক্ষী নারী আছেন। কিন্তু তারা প্রকাশ্যে কথা বলার সুযোগ বা উৎসাহ পান না।
তিনি বলেন, আমার মতো মানুষ অনেক আছেন। কিন্তু আমরা তাদের দেখি না। কারণ তারা আমার মতো প্রকাশ্যে কথা বলার সুযোগ পান না। তানিশার মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এখন তরুণদের আত্মপরিচয় গঠনে বড় ভূমিকা রাখছে। যদিও এটি ইতিবাচক অনুপ্রেরণা দিতে পারে, তবে অতিরিক্ত ফিল্টার ব্যবহার, প্রসাধননির্ভর সৌন্দর্যচর্চা এবং অবাস্তব জীবনযাপনের ছবি অনেক তরুণ-তরুণীর আত্মসম্মানবোধ কমিয়ে দিচ্ছে। তিনি বলেন, আমি মানুষকে আমার আসল রূপটাই দেখাতে চাই। এ কারণেই তিনি এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভারী মেকআপ ছাড়াই নিজের ছবি ও ভিডিও বেশি শেয়ার করেন। সাক্ষাৎকারের এক পর্যায়ে তিনি এক শব্দে সৌন্দর্যের সংজ্ঞা দিয়েছেন- ‘রিয়েলিটি’। মিস গ্রেট বৃটেন জেতাই তানিশার চূড়ান্ত লক্ষ্য নয়। তিনি রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ড আরও বিস্তৃত করতে চান। স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে তরুণদের জন্য বিভিন্ন কর্মসূচিতে কাজ করতে চান।
বৃটিশ-বাংলাদেশি সমাজে আরও সমতা প্রতিষ্ঠার জন্য প্রচারণা চালিয়ে যেতে চান। এ ছাড়া তিনি চান আরও বেশি নারী রাজনীতি, নেতৃত্ব ও জনজীবনে এগিয়ে আসুন এবং সাংস্কৃতিক প্রত্যাশার কারণে নিজেদের সীমাবদ্ধ না রাখুন। তিনি বলেন, আমি আরও বেশি বৃটিশ-বাংলাদেশি নারীকে প্রকাশ্যে কথা বলতে, ইনফ্লুয়েন্সার হতে, রাজনীতিবিদ হতে, বুদ্ধিবৃত্তিক মানুষ হিসেবে পরিচিত হতে দেখতে চাই। তারা যেন নিজেদের সীমাবদ্ধ না রাখেন। তিনি আরও বলেন, আমি এমন একজন আদর্শ হতে চাই, যাকে দেখে কেউ বলতে পারে- ‘তানিশা পেরেছে, তাহলে আমিও পারবো।’ তানিশার কাছে মিস গ্রেট বৃটেন শুধু একটি সৌন্দর্য প্রতিযোগিতার মঞ্চে প্রতিনিধিত্ব করার বিষয় নয়। এটি এমন একটি ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার প্রচেষ্টা, যেখানে আগামী প্রজন্মের বৃটিশ-বাংলাদেশি তরুণীরা বিশ্বাস করবে- স্বীকৃতি, সম্মান বা উদ্যাপিত হওয়ার জন্য তাদের নিজের পরিচয় বদলাতে হবে না।
